ভারী বর্ষণ ও ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে শেরপুর জেলায় বন্যায় উজানের পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে নিম্নাঞ্চলেও পানি কমতে শুরু করেছে। পানির নিচ থেকে ভেসে উঠতে শুরু করেছে আমন ধান, সবজির ক্ষেত ও মাছের প্রজেক্ট। জেলা প্রশাসনের, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত আছে। এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ জনে। এদিকে কয়েক ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া ও ফুলপুর উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। এতে নতুন করে তিন উপজেলায় অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
শেরপুর জেলার পাহাড়ি চারটি নদীর পানি আরও কমেছে। এসব নদীর পানি এখন বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্র, দশানি ও মৃগী নদীর পানিও কমতে শুরু করেছে। এসব নদীর পানি বিপদসীমার অনেক নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। এখনো অনেক এলাকায় খাদ্যসংকট রয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত আছে। বিএনপি, জামায়াতসহ রাজনৈতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ চলমান আছে।
শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলার ভোগাই নদীর পানি বিপদসীমার ১৬৭ সেন্টিমিটার নিচে প্রবাহিত হচ্ছে, চেল্লাখালী নদীর পানি বিপদসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার নিচে প্রবাহিত হচ্ছে ও ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি বিপদসীমার ৫২৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া অন্য দুটি পাহাড়ি নদী মহারশি ও সোমেশ^রীর পানি বিপদসীমার অনেক নিচে রয়েছে। ঝিনাইগাতি, নালিতাবাড়ী এবং নকলা উপজেলায় এ পর্যন্ত ১১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক তরফদার মাহমুদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, অল্প পরিমাণে বৃষ্টি হলেও বন্যার অবস্থার উন্নতি হয়েছে। ত্রাণ কার্যক্রম চলমান আছে। যেসব দুর্গম এলাকায় আমরা যেতে পাচ্ছি না সেখানে সেনাবাহিনী সার্বিক সহযোগিতা করছে। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, ব্যবসায়ীসহ সবাই এগিয়ে এসেছে।
এদিকে ময়মনসিংহের তিন উপজেলায় অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. সানোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের জানান, গতকাল ভোর থেকে বৃষ্টি হওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হয়েছে। বৃষ্টি বাড়লে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। বন্যার পানিতে ভোগান্তি বেড়েছে মানুষের। জেলায় পানিবন্দি হয়ে আছে অন্তত আড়াই লক্ষাধিক মানুষ।
এদিকে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বোরাঘাট নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে প্লাবিত হয় হালুয়াঘাট উপজেলা। হালুয়াঘাটের ইউএনও এরশাদুল আহমেদ বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন তৎপর রয়েছে। পানিবন্দি মানুষকে শুকনো খাবার ও রান্না করা খাবার বিতরণ কার্যক্রম চলছে। গত শুক্রবার দুপুরের পর অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও নেতাই নদের বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় উপজেলার বিভিন্ন এলাকা। তিনি আরও জানান, সোমবার রাত থেকে পোড়াকান্দুলিয়া ইউনিয়নের পানি কমছে। কিন্তু গতকাল কিছু নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
এ ছাড়া ধোবাউড়া উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের ১৬৪ গ্রামে মানুষ বন্যায় দুর্ভোগে পড়েছে। উপজেলার দক্ষিণ মাইজপাড়া ও ঘোষগাঁও ইউনিয়নে পানি কমতে শুরু করেছে।
ধোবাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিশাত শারমিন বলেন, ‘নতুন কয়েকটি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। দুটি ইউনিয়নে পানি আরও বৃদ্ধি পেয়ে নতুন করে কিছু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে। আমরা বানভাসি মানুষকে শুকনো খাবারের পাশাপাশি ওষুধ সরবরাহ করছি। বৃষ্টি না হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।’
জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. সানোয়ার হোসেন জানান, ভোর থেকে বৃষ্টি হওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হয়েছে। এতে জেলার তিন উপজেলার অন্তত ২৫টি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। তিন উপজেলায় নগদ ৭ লাখ টাকা ও ৬৩ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। বৃষ্টি না হলে পানি কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বন্যার কারণে জেলায় মৎস্য খাতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন। তিনি বলেন, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ৭ হাজার ৮০ জন মৎস্যচাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে ২১৭ লাখ, ভেসে গেছে ৫ হাজার ৬২৪ লাখ টাকার মাছ ও ১৪৯ লাখ টাকার রেনু পোনা।
ময়মনসিংহ কৃষি অফিসের তথ্যমতে, জেলার উপজেলাগুলোর মধ্যে ধোবাউড়া উপজেলায় ১১ হাজার ৭০০ হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। হালুয়াঘাটে তলিয়ে গেছে ৭ হাজার ৬০০ হেক্টর জমির ধান এবং ৭৫ হেক্টর সবজি ক্ষেত। ফুলপুর উপজেলায় ৩ হাজার ৬৩০ হেক্টর ধান এবং ৬২ হেক্টর সবজি পানিতে তলিয়ে গেছে।
