ঝালকাঠিতে চুন শিল্পে এসেছে আধুনিকতা। এ শিল্পে এখন যুক্ত হয়েছে আধুনিক মেশিন। ফলে আগের চেয়ে সহজ হয়েছে উৎপাদন। কিন্তু কাঁচামালের সংকট, দাম বেড়ে যাওয়া এবং কাক্সিক্ষত মূল্য না পাওয়ায় এ শিল্প টিকিয়ে রাখা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। এমনটাই জানিয়েছেন বংশ পরম্পরায় এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত চুন শিল্পী দীপক সূত্রধর।
শামুক-ঝিনুক দিয়ে যারা চুন তৈরি করে তাদের চুনারু বলা হয়। এরা মূলত কৌড়া সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠী। দক্ষিণের জেলা ঝালকাঠির চুনের সুখ্যাতি ছিল দেশ জুড়ে। কিন্তু জলাশয় কমে যাওয়ায় ও ট্রাক্টরের সাহায্যে চাষাবাদ করায় শামুক-ঝিনুকের উৎপাদন কমে গেছে। তাই বিপাকে পড়েছেন এই শিল্পের কারিগররা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পূর্বে ঝালকাঠির পালবাড়ি ও বাউকাঠি এলাকায় ১০টিরও বেশি চুন কারখানা ছিল। সেখানে কাজ করতেন অন্তত পাঁচ শতাধিক চুন শিল্পী। কিন্তু নানা সংকটের কারণে এখন তা কমতে কমতে দুটিতে এসে ঠেকেছে। এই দুই কারখানায় বর্তমানে প্রায় ১০০ জন চুন শিল্পী কাজ করছেন।
চুন শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, পৌরশহরের পালবাড়ি ও বাউকাঠি এলাকার এই পরিবারগুলো শত বছর ধরে বংশ পরম্পরায় চুন তৈরি করে আসছে। প্রাচীন পদ্ধতিতে শামুক ও ঝিনুক আগুনে পুড়িয়ে ঘানিতে গুঁড়া করে পানি মিশিয়ে তৈরি করা হতো এই চুন। কয়েক দফায় প্রক্রিয়াজাত শেষে এক তাফাল (কড়াই) খাওয়ার উপযোগী চুন তৈরিতে সময় লাগত ১০ দিন। চুন তৈরির সনাতন এই পদ্ধতি বাদ দিয়েছে এই পরিবারগুলো। সদর উপজেলার নবগ্রাম ইউনিয়নের বাউকাঠিতে এখন বিদ্যুৎচালিত যন্ত্র দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে চুন। বর্তমানে এক তাফাল চুন তৈরিতে সময় লাগছে দুই থেকে তিন দিন।
চুন শিল্পী দীপক সূত্রধর জানান, এখন বিদ্যুৎচালিত যন্ত্রে সেই চুন উৎপাদনে ঝামেলা কমেছে। বর্তমানে মেশিনে চুন তৈরি করে মেশিনেই প্যাকিং করা হচ্ছে। কিন্তু নানা সংকটের কারণে লাভের পরিমাণ কমে গেছে। ফলে লোকসানের মুখে চুন উৎপাদনে যুক্ত অনেকেই এ পেশা ছেড়েছেন। এই পেশাকে টিকিয়ে রাখতে হলে সংশ্লিষ্টদের সহজ শর্তে ঋণ সুবিধাসহ সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগররা।
পালবাড়ি এলাকার সুভাস চন্দ্র ধর জানান, জলবায়ুর পরিবর্তন ও মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগের ফলে খাল, বিল, জলাশয়ে শামুক ও ঝিনুক কমে গেছে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীসহ কয়েক হাত ঘুরে চুন তৈরির কারিগরদের কাছে কাঁচামাল পৌঁছাচ্ছে। কারিগরদের পারিশ্রমিক এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য যে পরিমাণ খরচ হয়, সেভাবে বিক্রয়মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া পান-সুপারির ব্যবহার দিন দিন কমে যাওয়ায় লোকসানের মুখে অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছেন অনেকে।
সুভাস চন্দ্র ধর আরও বলেন, ‘আগে আমরা এখানেই শামুক পোড়াতাম। পৌর কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা থাকায় এখন আর আমরা এখানে শামুক পোড়াতে পারি না। তাই বাউকাঠি থেকে পোড়ানো শামুক মণ দরে কিনে এনে এখানে চুন তৈরি করি। আমি প্রতিদিন ৬০ কেজি পোড়ানো শামুক কিনে এনে তা থেকে ১২০ কেজি চুন তৈরি করে স্থানীয় দোকানে সরবরাহ করি। প্রতি কেজিতে আমার ৬ থেকে ৭ টাকা লাভ থাকে।’
বাউকাঠি এলাকার হৃদয় চন্দ্র ধর বলেন, ‘আগে সনাতন পদ্ধতিতে কাজ করলেও এখন আধুনিক মেশিনে চুন তৈরি করছি। কিন্তু জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পণ্য তৈরি ও সরবরাহের খরচ অনেক গুণ বেড়েছে। প্রক্রিয়াজাত করে চুন তৈরিতে যে সময় ও শ্রম ব্যয় হয়, তাতে লাভের পরিমাণ খুবই সামান্য। শুধু পূর্বপুরুষের পেশাটাকে ধরে রাখার জন্য এ পেশায় এখনো আছি। তা না হলে এতদিনে সব বন্ধ করে অন্য ব্যবসায় চলে যেতাম।’
ঝালকাঠি বিসিক শিল্পনগরী কর্মকর্তা আলী আজগর নাসির বলেন, ‘আমাদের আওতাধীন অন্যান্য উদ্যোক্তারা যেভাবে বিসিকের সুযোগ-সুবিধা পায়, চুন তৈরির কারিগরাও তা পাবেন। আমরা ছোট ছোট উদ্যোক্তাদের বিসিক থেকে প্লট, ক্ষুদ্র ঋণ দিয়ে সহযোগিতা করছি। আবেদন সাপেক্ষে চুন তৈরির কারিগরদেরও আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করব।’
