ভারত কি রান উৎসব করতেই হায়দরাবাদে এসেছিল? প্রশ্নটা করা হয়েছিল সঞ্জু স্যামসনকে। মাত্র ৪০ বলে টি-টোয়েন্টিতে তিনশ রান ছুঁই ছুঁই ইনিংসের জ্বালানি জুগিয়েছেন এই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান। উত্তরে সঞ্জু যেটা বলেছেন, সেটা ‘শিক্ষা সফর’ করতে আসা বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্য হতে পারে বড় শিক্ষা। অবশ্য এই শিক্ষা বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের অনেকেই দিয়েছেন, অনেক সংস্করণেই। শিক্ষাটা হচ্ছে, উইকেট ভালো হলে সুযোগ পেলে ইনিংসটা বড় করতে হয়।
ম্যাচের মাত্র দ্বিতীয় ওভার। তাসকিন আহমেদের বলে টানা চারটা বাউন্ডারি মারলেন সঞ্জু। ম্যাচশেষে বলেছেন, ওখানেই আসলে বুঝে গেছেন দিনটা তার হতে যাচ্ছে, ‘হ্যাঁ, বলা যায়। পাওয়ার প্লে’র ভেতর টানা চারটা চার মারা আমাকে অনেক আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল। এভাবে বলতে পারেন যে সেখান থেকেই রান উৎসবের শুরুটা।’ ম্যাচের পঞ্চম ওভারে লিটন দাসও টানা চারটা বাউন্ডারি মেরেছিলেন, নীতিশ রেড্ডির ওভারে। তখনো পাওয়ার প্লে’ই চলছিল, কিন্তু লিটন সেখান থেকে শেষ করলেন ২৫ বলে ৪২ রানে। এটাই পার্থক্য গড়ে দেয় মাঝারি আর ভালোর ভেতর। রিশাদ হোসেনের এক ওভারে ৫ ছক্কা হাঁকিয়েছেন সঞ্জু। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে তার পক্ষে এটা সম্ভব, ‘পাওয়ার প্লে’র পরেই আমি বুঝে যাই যে আমি সেট হয়ে গেছি আর ভালো ব্যাট করছি। এই উইকেটে নিরাপদ রান কত হতে পারে সেটা আমরা বুঝছিলাম না কারণ উইকেট খুব ভালো ছিল। আমরা সব ওভারেই সর্বোচ্চ রান করার চেষ্টা করছিলাম। এরপর স্পিনার যখন এলো, আমি জানতাম আমি স্পিনারের বিপক্ষে কী করতে পারি। আমি চাচ্ছিলাম সর্বোচ্চ রান নিতে। ৫টা ছক্কা হয়ে গিয়েছে আসলে। গত বছর দুই ধরেই ভাবছিলাম যে আমি ওভারে ৬ বলে ৬টা ছক্কা মারতে পারব। আমি রসিকতা করছি না। আমি এই নিয়ে আমার কোচ, মেন্টরদের সঙ্গে কাজ করেছি। ৪-৫টা ছক্কা তো হতেই পারে। আমি এটা অনুশীলন করছি, বারবার মনের ভেতর এই দৃশ্যটা দেখেছি, অবশেষে সেটা হলো।’
সঞ্জু স্যামসন একজন গড়পড়তা শরীরের ভারতীয় নাগরিক, কেরালায় জন্ম। পূর্বপূরুষদের ভেতর ক্যারিবীয় কেউ নেই, আকৃতিতেও বিশাল নন। তাকে তার কোচরা সাহস দিয়েছেন ওভারে ৬ ছক্কা মারার প্রচেষ্টার। যুবরাজ সিংও খুব বিশালদেহী ছিলেন না। অথচ বাংলাদেশ দলের সহকারী কোচ নিক পোথাস সেদিন বলেই গেছেন, বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ওজন কম তাই তাদের জন্য ছক্কা মারা কঠিন, ‘একজন যদি ৯৫-১০০ কেজি ওজনের হয় আর আরেকজন যদি হয় ৬৫ কেজি, তাহলে একজন তো বেশি দূরে বল পাঠাবেই। অবশ্যই এখানে টাইমিং আছে, টেকনিক আছে, সব আছে। আমরা প্রতিনিয়ত কাজও করে যাচ্ছি।’ অর্থাৎ একজন কোচ আগে থেকেই ক্রিকেটারদের মনে দ্বিধা ঢুকিয়ে দিচ্ছেন! পোথাসের কাছে গত ১২ মাসে বাংলাদেশের যা অর্জন, এই সবই নাকি অভাবনীয়, অথচ ভারতের কোচ গৌতম গম্ভীর ক্রমশ ক্রিকেটারদের অনুপ্রাণিত করছেন নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার, ‘গৌতি ভাই (গৌতম গম্ভীর), সূর্যকুমার ও অভিষেক নায়ার (ব্যাটিং কোচ) আমাকে ৩ সপ্তাহ আগে বলেছে যে আমাকে ইনিংসের সূচনায় দেখতে চায়। আমি সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছি। আমি রাজস্থান রয়্যালসের অ্যাকাডেমিতে চলে যাই, সেখানে নেটে অনেক রকম বোলারদের বল খেলি। নতুন বলে ব্যাটিং করাটা রপ্ত করি। এই প্রস্তুতিটা অনেক সাহায্য করেছে। লিডারশিপ গ্রুপ আমাকে জানিয়ে দিয়েছে তারা আমাকে কী ভূমিকায় দেখতে চাচ্ছে।’ বাংলাদেশের বেলায় হয় ঠিক উল্টোটা। ম্যাচের আগের রাতেও বোধহয় কেউ জানেন না কাল কে কোথায় খেলছে!
বাংলাদেশের বেশিরভাগ ক্রিকেটার ব্যর্থতার পেছনে খোঁজেন অজুহাত। দেশের উইকেট ভালো নয়, অবকাঠামো ভালো নয়। কিন্তু নিজে ৩ সপ্তাহ ধরে একটা অ্যাকাডেমিতে গিয়ে প্রস্তুতি নিয়েছেন কোনো সিরিজকে সামনে রেখে, এমন দৃশ্য দেখা যাবে না। তাই তো ক্রিকেটে ভারত-বাংলাদেশের পার্থক্যটা এখন টি-টোয়েন্টিতে ১৩৩ রানে হারের চেয়েও বড়।
