উদ্বোধনের আগেই ভবনে ফাটল

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৪, ০৭:০৪ এএম

জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের নতুন নির্মাণ করা ল্যাবরেটরি কাম ল্যাব স্টোর ভবনের দেয়ালের অর্ধশত স্থানে ছোট-বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। সিমেন্ট ও রঙের প্রলেপ দিয়ে যা ঢাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ভবনটি নির্মাণের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারের নিয়োগ করা নির্মাণশ্রমিকরা। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করায় এসব ফাটলের সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টরা।

ভবনটির নির্মাণকাজ করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সোহরাব হোসেন বাবুল। জামালপুর-৩ (মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মির্জা আজমের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ার সুবাদে সোহরাব হোসেন বাবুলের জেলা শহরে ব্যাপক প্রভাব ছিল। তার প্রভাবের কারণে সাধারণ মানুষ মুখ খুলতে ভয় পেতেন।

জামালপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধানে ২০২২ সালের ৩০ জুন ছয়তলা ফাউন্ডেশনে দ্বিতীয়তলা নতুন ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ভবনটি নির্মাণে ৪ কোটি ৯৭ লাখ ৭৭ হাজার টাকা ব্যয় হয়। ২০২৪ সালের ২৮ মার্চ ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ এখনো ভবনটি বুঝে নেয়নি। তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি পায়। তবে সাব-ঠিকাদার হিসেবে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি বাবুল কাজটি করেন।

গতকাল রবিবার সরেজমিন দেখা যায়, জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের মূল ভবনের পশ্চিম পাশে ল্যাবরেটরি কাম ল্যাব স্টোরের দ্বিতীয়তলা ভবন। ভবনের ভেতর শ্রমিকরা রঙের প্রলেপ দিয়ে দেয়ালের ফাটল ঢাকার কাজ করছেন। রঙের প্রলেপ দেওয়া হলেও দেয়ালে এখনো ফাটলের চিহ্ন লক্ষ্য করা যায়। এ ছাড়া প্রথমতলার হেল্প ডেস্কের ওপরের দেয়ালে রাজমিস্ত্রিদের ফাটলগুলো সিমেন্ট দিয়ে মেরামত করতে দেখা যায়। আরও কয়েকজন শ্রমিক ভবনের উত্তর পাশের দেয়ালের বাইরেও সিমেন্ট দিয়ে ফাটল মেরামত করছিলেন। পুরো ভবনটি ঘুরে প্রায় অর্ধশত ফাটল দেখা যায়।

রঙমিস্ত্রি মো. রফিক বলেন, ‘দোতলা ভবনের দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় অর্ধশত ফাটল ছিল। সেগুলো রাজমিস্ত্রিরা সিমেন্ট দিয়ে মেরামত করেছে। পরে ফাটা স্থানগুলোতে রঙের পুটিং দেওয়া হয়। এরপর রঙ করা হচ্ছে। এতে ফাটল আর দেখা যাবে না। গত কয়েক দিন ধরে এ কাজ চলছে।’

সেখানে কর্মরত রাজমিস্ত্রিরা বলেন, ভবনের বিভিন্ন স্থানে অনেক ফাটল রয়েছে। এসব ফাটল তারা মেরামত করছেন। এভাবে ভবনটি ফাটল ধরার কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তারা বলেন, ব্যবহার করা ইটগুলো হয়তো ভালো নয়। ফলে এত অল্প সময়ে ভবনটির দেয়ালে ফাটল ধরেছে।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা হয়। তারা বলেন, একদম নতুন একটা ভবন এভাবে ফেটে যাওয়ার কারণ একটাই নির্মাণকাজে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা। অন্যথায় এভাবে একটি নতুন ভবনে ফাটল ধরতে পারে না।

জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, ‘ওই ভবন নির্মাণের সাব-ঠিকাদার আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী একজন নেতা। গণপূর্ত বিভাগের অসাধু কিছু কর্মকর্তা, কর্মচারীর সঙ্গে যোগসাজশে ওই আওয়ামী লীগের নেতা ভবন নির্মাণে নিম্নামানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করেছেন। যার কারণে নতুন ভবনে ফাটল ধরেছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই ভবন নির্মাণে ভাটার ইটের পরিবর্তে সিমেন্টের ইট (ব্লক ইট) ব্যবহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে বালুতে সিমেন্টও কম দেওয়া হয়েছে। ফলে উদ্বোধনের আগেই বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। কাজের শুরু থেকেই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি করে এলেও কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায়নি। কারণ আওয়ামী লীগ নেতা সোহরাব হোসেন বাবুল খুবই প্রভাবশালী ছিলেন।

হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাসপাতালের বহির্বিভাগসহ বিভিন্ন ল্যাব কক্ষ অনেক আগেই পরিত্যক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। মাঝেমধ্যেই পুরাতন ভবনের ইট ও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে রোগী ও হাসপাতালের কর্মচারী আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। যে কারণে নতুন ভবনটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগেই সম্প্রতি সেখানে এক্স-রে, ইকোকার্ডিওগ্রাম, এন্ডোস্কপি, ইসিজি, ক্যানসারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মেশিন স্থানান্তর করা হয়। সেখানে অস্থায়ীভাবে ওইসব কার্যক্রম চলছে। ভবনের ভেতর ও বাইরের দেয়ালের বিভিন্ন জায়গায় ছোট-বড় ফাটল দেখা দেওয়ায় আবারও তারা আতঙ্কগ্রস্ত।

জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (এডি) মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে বুঝে নেওয়া হয়নি। অস্থায়ীভাবে সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এর মধ্যে ওই ভবনের দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা যায়। বিষয়টি গণপূর্ত বিভাগকে জানানো হয়। পরে মেরামত কাজ শুরু হয়।’ নতুন ভবনে ফাটল দেখা যাওয়ার বিষয়ে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু এ বিষয়ে তিনি কোনো কিছু বলতে রাজি হননি।

জামালপুর গণপূর্ত উপবিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এফ এম আশ্রাফুল আউয়াল রানা বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে ভবনটিতে কিছু কিছু জায়গায় হেয়ারক্র্যাক (সূক্ষ্ম ফাটল) দেখা দিয়েছে। বিষয়টি হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ আমাদের চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছেন। আমরা চিঠি পাওয়ার পর ঠিকাদারকে চিঠি দিয়েছি। হেয়ারক্র্যাকগুলো দ্রুত সমাধান করার জন্য বলা হয়েছে এবং ইতিমধ্যে ঠিকাদার কাজ শুরু করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, যখন আস্তর করা হয়েছে তখন কিউরিংটা সঠিকভাবে হয়নি। অথবা রঙ করার সময় যে নিয়মনীতি মেনে করার কথা ছিল হয়তো সঠিকভাবে হয়নি। যেহেতু ঠিকাদারের এখানে গাফিলতি রয়েছে, ঠিকাদারের জামানত আমাদের কাছে রক্ষিত রয়েছে। ঠিকাদার নিজস্ব খরচে অতিদ্রুত ত্রুটি মেরামত করে দেবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত