১৯ কোটি টাকার সেতু ব্যবহার হচ্ছে চটপটি ব্যবসা-ওয়াজের প্যান্ডেলে

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৪, ০১:১২ পিএম

গাজীপুরের শ্রীপুরে ওয়াই সেতু নামে পরিচিত বরমী মাওনা-কাওরাইদ গফরগাঁও যেতে বাইবাস সড়কে সেতুটি নির্মাণে বছর পার হলেও অব্যবহৃত আর অকেজো হয়ে পড়ে আছে। প্রায় ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুর অচলবস্থা দেখে স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভের শেষ নেই। তাদের অভিযোগ এতো টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতু মানুষ ব্যবহার করতে পারছে না দীর্ঘদিন ধরে। কেউ সমাধানও করছে না।

জানা যায়, সেতুর একপাড় ব্যবহার উপযোগী করা হলেও অন্যপাড় অসম্পূর্ণ পড়ে আছে। ফলে সেতুটি ব্যবহার অনুপোযুগী থাকছে। তাই নিরুপায় লোকজন বাঁশের মাচা ও বালুর বস্তা ফেলে সংযোগ পথ তৈরি করেছেন। সেই পথে ভর করে সেতু পার হচ্ছেন তারা। ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ের নির্মিত সেতু এখন যেন চটপটি ব্যবসা ও শীতের মৌসুমে ওয়াজের প্যান্ডেলের কাজে নিয়োজিত।

স্থানীয়দের অভিযোগ জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় সেতুর পাইটালবাড়ি এলাকার অংশের নির্মাণ কাজ আটকে আছে। সংযোগ সড়ক না করায় ৮০ ভাগ কাজ শেষ হলেও সেতু ব্যবহারের সুফল পাচ্ছেন না স্থানীয় বাসিন্দারা। এ দিকে অধিগ্রহণের টাকা পয়সা নিয়েও নয়ছয় হচ্ছে বলে অভিযোগ সেতু পাড়ের লোকজনের। তাদের দাবি দ্রুত জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ করে সেতু ব্যবহারের উপযোগী করা হোক।

সেতুটির বরমী ইউনিয়নের বরমী বাজারের উত্তরে মাটিকাটা নদীর ওপর নির্মাণ করা হয়েছে।

সেতুর উত্তর পাশে বাজারের কাঠমহল আর সেতুর দক্ষিণ পাশে পাইটালবাড়ি এলাকা। মাটিকাটা নদী পার হয়ে ইংরেজি অক্ষর ওয়াইয়ের মত হয়ে একটি রাস্তা কাওরাইদের দিকে অপর দিকে আরেকটি রাস্তা বানার নদীর ওপর দিয়ে সেতু পার হয়ে কাপাসিয়া এলাকায় যাওয়ার করা ছিল। তবে সেতুটি আপাতত মাটিকাটা নদীর ওপর নির্মাণ হয়েই থেমে আছে। এখন ওয়াই আকারের সেতু হবে কিনা তা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বরমী শত বছরের পুরাতন বাজার। এটি আশপাশের ৪টি উপজেলার অন্তত ৩০টি গ্রামের বিভিন্ন মানুষের বাজার ব্যবস্থার সাথে জড়িত। নদী আর নদ ঘিরেই এ বাজারটি গড়ে উঠেছে ৪শ’ বছর আগে। বুধবার বরমীর সাপ্তাহিক হাটবার থাকে। এ দিন চরম যানজট আর মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে এ হাটে। নানা দিক বিবেচনা করে বরমী বাজার অংশে বাইপাস যাত্রায় দূরত্ব কমাতে এ সেতু নির্মাণের চিন্তা করা হয়। সেই সাথে লাঘব হওয়ার কথা ছিল বরমী বাজারের নিত্যদিনের যানজটের।

তাদের অভিযোগ সেতু নির্মাণ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই পুরোনো যানজট, সড়কের দীর্ঘযাত্রা ও দুই পাড়ের মানুষের যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ রয়েই গেছে। মাঝে মাঝে পাশের সরু সেতুতে কোনো যানজট সৃষ্টি হলে সেটি সারতে কয়েক ঘণ্টা সময় লেগে যায়। মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়ে যায়। এখন কোটি কোটি টাকায় নির্মিত এ সেতু চটপটি বিক্রেতা আর আড্ডাবাজদের দখলে থাকে। সেতুর মাঝে বালুর স্তুপ আর ইটের ভাঙা খোয়ার স্তুপ জমা করে রাখা হয়েছে। 

চটপটি বিক্রেতা আর ঘুরতে আসা লোকজন বলেন, সেতুতে সোলার প্যানেলসহ সড়কবাতি স্থাপন করা আছে। রাত হলেই অটোমেটিক বাতিগুলো এক সঙ্গে জ্বলে উঠে। নদীর পানিতে সড়কবাতির আলোর ঝলমলানিতে এখানে দারুণ আড্ডা জমে। লোকজন ঘুরতে এসে চটপটি খায় ছবি তোলে। তারা অভিয়োগ করেন এমন সুন্দর একটি সেতু অকেজো পড়ে আছে কেবল দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সড়ক ও জনপথ বিভাগ ১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয়ে এ সেতুটি নির্মাণ করে। এর দৈর্ঘ্য ৯৭.৩৪ মিটার। গত ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে এটি তৈরির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তৎকালীন সংসদ সদস্য। ২ বছর ১০ মাসের মাথায় এর নির্মাণ শেষ হয়।

পাইটালবাড়ি এলাকার লোকজন বলেন, সেতু নির্মাণের এক বছর পার হয়েছে। কিন্তু সেতুর উত্তর-পূর্ব পাশে (পাইটালবাড়ি এলাকায়) সড়ক তৈরি করা হয়নি। জমি অধিগ্রহণের জটিলতা নিরসনে বারবার উদ্যোগ নিলেও নানা কারণে জটিলতা থেকেই যাচ্ছে। জমির মালিকদের টাকা না দিয়ে সড়ক নির্মাণ করতে পারছে না ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান।

অপরদিকে প্রস্তাবিত অধিগ্রহণ করা জমির মালিকরা টাকার জন্য সওজ অফিসে ধর্ণা দিলেও সুফল মিলছে না। তারা টাকা না পেলে নিজেদের ভূমি ছাড়বেন না। তাদের ক্ষোভ ব্রিজ (সেতু) নির্মাণের আগেই জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু কাগজে পত্রে এখনো কোনো পরিবার অধিগ্রহণের টাকা পায়নি। তাদের অভিযোগ করে বলেন আগে জমি অধিগ্রহণের জটিলতা নিরসন না করেই সেতু বানিয়ে কী লাভ হয়েছে?

বরমী বাজার বণিক সমিতির সদস্য তালুকদার আবুল হোসাইন বলেন, অতি জনগুরুত্বপূর্ণ এ সেতুটি অল্প কাজের জন্য এখনো মানুষ ব্যবহার করতে পারেছে না। এটি দু:খজনক। কোটি টাকার সেতু অকেজো হয়ে পড়ে আছে লম্বা সময় ধরে। এটি দ্রুত মানুষের জন্য উন্মক্ত করা হোক। 

জমির মালিক দেওয়ান লিটন মিয়া বলেন, আগে ভুল করে জমিটি অর্পিত হিসেবে ঘোষণা করে ভুমি অফিস। এটা ভূমি অফিসের ভুল। আমাদের জমির সব কাগজপত্র আমাদের কাছে আছে। সরকারি লোকজনের ভুলের কারণে আমরা খেসারত দিচ্ছি। অধিগ্রহণের টাকা না পেলে ভূমি মালিকরা ভূমি ছেড়ে যাবেন না।

বরমী ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওর্য়াড সদস্য হাদিউল ইসলাম বলেন, আমরা এ নিয়ে স্থানীয়দের সাথে কথা বলেছি। তাদের জমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতা আছে। দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে সব জটিলতা সেরে এ সেতুটি মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা দরকার। আশা করি দায়িত্বশীলরা এ কাজটি দ্রুত সমাধান করবেন।

গাজীপুর জেলা সড়ক ও জনপদের প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী এম শরিফুল আলম বলেন, ভূমি অধিগ্রহণে প্রয়োজনীয় সব টাকা আমরা ভূমি অধিগ্রহণ শাখাকে হস্তান্তর করেছি। কিন্তু অধিগ্রহণের নানা জটিলতা দেখা দিলে তা এখনো সমাধান হচ্ছে না। জমি অধিগ্রহণের ঝামেলা সেরে গেলে অল্প সময়ের মধ্যে সেতুর অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করা যাবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত