উচ্চমান ও টেকসই পণ্য উৎপাদনে আপসহীন হাতিল

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৪, ০১:১০ এএম

দেশ রূপান্তর : আপনাদের ফার্নিচার দেশের সেরা ব্র্যান্ডের একটি। আজকের এই অবস্থানে আসার শুরুটা কেমন ছিল?

সেলিম এইচ রহমান : হাতিলের যাত্রা শুরু হয় আমার বাবা, আলহাজ হাবিবুর রহমানের প্রতিষ্ঠিত এইচ এ টিম্বার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড থেকে, যা ১৯৬৩ সালে গড়ে ওঠে। আমি ১৯৮৮ সালে বাবার এই প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে দরজা উৎপাদনের ধারণা নিয়ে আসি। এরপর ১৯৮৯ সালে ‘হাতিল ডোর্স’ নামে একটি ছোট কারখানা দিয়ে হাতিলের যাত্রা শুরু করি পুরান ঢাকায়। ১৯৯৩ সালে কুড়িলে পাঁচ হাজার বর্গফুট জায়গায় আমরা কার্যক্রম প্রসারিত করি এবং আলমারি, বেডসহ অন্যান্য আসবাব তৈরিতে মনোনিবেশ করি। ২০০০ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সহযোগিতায় হাতিল যান্ত্রিক উৎপাদনে রূপান্তরিত হয়, যা আমাদের দক্ষতা ও উৎপাদন ক্ষমতা বহুগুণ বাড়ায়। চাহিদা বৃদ্ধির ফলে, আমরা শ্যামপুর থানা এবং ফরাশগঞ্জে কারখানা ভাড়া নিই। ২০০৪ সালে সাভারে নিজস্ব কারখানায় উৎপাদন শুরু হয়।

২০১৩ সালে হাতিল তাদের প্রথম বিদেশি শোরুম অস্ট্রেলিয়ায় চালু করে এবং কুয়েত, সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি শুরু করে। এরপর নেপাল, ভুটান ও ভারতে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে। ২০১৯ সালে হাতিল যন্ত্রপাতি উন্নত করতে ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন ক্ষমতা দ্বিগুণ করে। আমরা গুণগত মান, উদ্ভাবনী নকশা এবং টেকসই পণ্যের ওপর জোর দিয়েছি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করে ধীরে ধীরে দেশব্যাপী এবং আন্তর্জাতিক বাজারে হাতিল নিজেদের স্থান করে নিয়েছে।

দেশ রূপান্তর : গুণগতমান আর টেকসই বিবেচনায় আপনাদের ব্র্যান্ডের অবস্থান কোথায়?

সেলিম এইচ রহমান : গুণগতমান ও টেকসই পণ্যের ক্ষেত্রে হাতিল সর্বদা আপসহীন। আমরা (এফ এস সি প্রত্যয়িত) পরিকল্পিত বনায়ন থেকে কাঠ সংগ্রহ করি এবং উন্নতমানের কাঁচামাল ব্যবহার করে আসবাবপত্র তৈরি করে থাকি। আমাদের পণ্যের প্রতিটি উপাদান আন্তর্জাতিক মানের এবং সেগুলো পরিবেশবান্ধব উপকরণ দিয়ে তৈরি। জার্মানি থেকে কাঠ, ইতালি থেকে লেকার এবং ফ্যাব্রিকস ও হার্ডওয়্যার চীন থেকে সংগ্রহ করা হয়। কাঁচামাল সংগ্রহের সময় ফার্নিচারের স্থায়িত্বকে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে ফার্নিচার দীর্ঘ সময় কাস্টমারের ব্যবহার উপযোগী রাখার জন্য ডিজাইনের প্রতিও যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। হাতিলে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ফার্নিচারের সৌন্দর্য ও স্থায়িত্ব বাড়াতে সাহায্য করে, যে কারণে ক্রেতারা আমাদের ওপর নির্ভর করতে পারেন, যা আমাদের ব্র্যান্ডকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি ফার্নিচার রপ্তানি হয় যুক্তরাষ্ট্রে। তারপরও দেশটির মোট আমদানির এক শতাংশেরও কম হিস্যা বাংলাদেশের। রপ্তানি বাড়াতে করণীয় কী?

সেলিম এইচ রহমান : আমরা সব সময় আসবাবের সর্বোচ্চ গুণগতমান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করি। আমাদের আসবাব তৈরি করতে প্রচুর পরিমাণে কাঁচামাল আমদানি করতে হয়, যার ওপর আমদানি শুল্ক ও ভর্তুকি শুল্ক দিতে হয়। এই অতিরিক্ত খরচ যোগ করেই যখন আমরা আমাদের পণ্য বৈশ্বিক বাজারে রপ্তানি করতে যাই, তখন ক্রেতার জন্য সেটির দাম তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ে যায়। ফলে আমাদের প্রতিযোগিতা করতে বেশ কষ্ট হয়। এটা শুধু হাতিলের জন্য নয়, পুরো আসবাব খাতই এই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। বিশ্ব বাজারে চীন সবচেয়ে বেশি ফার্নিচার রপ্তানি করে। তাছাড়া ভিয়েতনাম ১৫ বিলিয়ন ডলারের ফার্নিচার রপ্তানি করে। চীন ও ভিয়েতনাম ফার্নিচারের চেয়ে হাতিলের ফার্নিচারের গুণগতমান উন্নত। কিন্তু দামের দিক দিয়ে আমরা ওই দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারছি না। এ ক্ষেত্রে সরকারকে আমদানি শুল্ক নীতি পরিবর্তন করে ফার্নিচার রপ্তানির পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : আপনাদের কোন ধরনের ফার্নিচারের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি? আপনাদের পণ্যের আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য আছে?

সেলিম এইচ রহমান : হাতিল সব সময় ক্রেতার মনস্তত্ত্ব ও চাহিদা নিয়ে কাজ করে। আমরা ক্রেতার পছন্দকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকি এবং একই সঙ্গে পণ্যের গুণগতমান বজায় রাখার বিষয়েও আপস করি না। আমরা আধুনিক ডিজাইন এবং স্পেস সেভিং আসবাব তৈরি করি। আমাদের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো ফার্নিচারের ফিনিশিং ও লেকারিংয়ের ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। এর ফলে আমাদের পণ্যগুলোতে সর্বোচ্চ মানের ফিনিশিং নিশ্চিত করা হয়, যা বাজারের অন্যদের থেকে আমাদের আলাদা করে। উন্নত প্রযুক্তি ও বিশ্বমানের ডিজাইন ব্যবহার করে আমরা এমন আসবাব তৈরি করি, যা দীর্ঘস্থায়ী এবং দৃষ্টিনন্দন, ফলে ক্রেতাদের পছন্দের শীর্ষে থাকে।

দেশ রূপান্তর : বর্তমানে আপনাদের পণ্যতালিকায় কত ধরনের আসবাব আছে?

সেলিম এইচ রহমান : বর্তমানে আমাদের পণ্যতালিকায় ১ হাজার ৮০০টিরও বেশি ধরনের আসবাবপত্র আছে, যা বাড়ি, অফিস এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য উপযোগী। প্রধান ক্যাটাগরির মধ্যে বেডরুম, ডাইনিং, লিভিং, অফিস, কিচেন অন্যতম প্রতিটি পণ্য আমাদের ক্রেতাদের নান্দনিকতা এবং কার্যকারিতার প্রয়োজন বিবেচনায় তৈরি করা হয়।

দেশ রূপান্তর : বিশ্ব জুড়ে ইন্টেরিয়র ডিজাইনে এক ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে। আপনারা সেই পরিবর্তনের ধারা কতটা গ্রহণ করেছে?

সেলিম এইচ রহমান : আমরা সব সময় বিশ্ব জুড়ে আসবাবপত্র এবং ইন্টেরিয়র ডিজাইনের নতুন ট্রেন্ডগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করি। বর্তমানে আধুনিক, মিনিমালিস্ট, এবং পরিবেশবান্ধব ডিজাইন বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়। সেই অনুযায়ী আমরা আমাদের পণ্যের নকশা এবং নির্মাণ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এনেছি। তবে ডিজাইনে আমাদের নিজস্বতা ও স্বকীয়তাও বজায় রেখেছি, যা হাতিলকে অনন্য করে তুলেছে।

দেশ রূপান্তর : বর্তমানে ডলার সংকটের কারণে আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফার্নিচার শিল্পে এর প্রভাব কেমন?

সেলিম এইচ রহমান : অন্যান্য শিল্পের মতো আসবাব খাতও ডলার সংকটের কারণে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। বাংলাদেশে বনায়ন খুবই সীমিত হওয়ায় আমাদের আসবাব প্রস্তুতির প্রধান কাঁচামাল, যেমন কাঠ, আমরা জার্মানি থেকে আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছি। পাশাপাশি আসবাব খাতের সংযোগ শিল্পগুলো পর্যাপ্তভাবে গড়ে না ওঠায় বিভিন্ন সরঞ্জাম এবং ফিনিশিংয়ের জন্য ব্যবহৃত লেকারসহ অনেক উপকরণও আমদানি করতে হয়। ডলারের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব কাঁচামাল আমদানিতে খরচ অনেক বেড়ে গেছে, যার ফলে উদ্যোক্তারা বাধ্য হয়ে আসবাবের দামও বাড়িয়েছেন। এ ছাড়া ডলার সংকটের কারণে ঋণপত্র (এলসি) খোলার প্রক্রিয়ায়ও বিলম্ব হচ্ছে, যা কাঁচামালের আমদানিতে জটিলতা তৈরি করছে। এটি আমাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করছে এবং বাজারে প্রতিযোগিতামূলক থাকতে আমাদের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত