গাজা যুদ্ধে নতুন বাঁক

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৪, ০১:৫১ এএম

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের প্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ারকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। গত বছর ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে নজিরবিহীন হামলা চালানোর মূল কারিগর বলে মনে করা হয় সিনওয়ারকে। এরপর থেকেই সিনওয়ারসহ হামাসের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে গাজায় অভিযান চালাতে থাকে তেল আবিব। গত এক বছর ধরে ছিলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে। তবে গত বুধবার ইসরায়েলি সেনারা সিনওয়ারকে রাফার একটি পরিত্যক্ত ভবনে খুঁজে পাওয়ার পর হত্যা করে। এর মধ্য দিয়ে গাজা যুদ্ধে নতুন বাঁকের সৃষ্টি হয়েছে। ইসরায়েলকে এটিকে বিজয় হিসেবে ঘোষণা করেছে। তবে হামাসের মিত্ররা এ হত্যাকাণ্ডের কড়া জবাব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

সিনওয়ারের সন্ধান : ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলেছেন, তাদের ধারণা ছিল সিনওয়ার গত দুই দশক গাজা ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে লুকিয়ে থেকে তৎপরতা চালিয়ে আসছিলেন। তাদের ধারণা ছিল, হামাসের তৈরি সুড়ঙ্গের মধ্যে দেহরক্ষী এবং ইসরায়েলি জিম্মিদের মানবঢাল বানিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন তিনি।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, গত বুধবার রাফার তাল আল-সুলতান এলাকায় নিয়মিত টহলের সময় অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই ইসরায়েলি সেনারা সিনওয়ারের সন্ধান পান। সেনাবাহিনীর ৮২৮তম ব্রিগেডের একটি পদাতিক ইউনিট সেখানকার একটি ভবনে অভিযান চালায়। তাদের কাছে তথ্য ছিল, ভবনটি হামাসের সিনিয়র নেতারা ব্যবহার করেন। পরে ডিএনএ পরীক্ষার পর সিনওয়ারের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।

গত জুলাই মাসে তেহরানে হামাসের রাজনৈতিক প্রধান ইসমাইল হানিয়া হত্যার শিকার হলে ৬১ বছর বয়সী সিনওয়ার হামাস প্রধানের দায়িত্ব পান।

হামাস ও মিত্রদের প্রতিক্রিয়া : ইয়াহিয়া সিনওয়ারের মৃত্যুর পর গতকাল আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয় হামাস। সংগঠনটির বিবৃতিতে বলা হয়, জীবনের শেষমুহূর্ত পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন সিনওয়ার। এটি হামাসের জন্য বড় ধাক্কা হলেও, অতীতের মতো আবারও ঘুরে দাঁড়িয়ে ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানায় সংগঠনটি। সেই সঙ্গে গাজা যুদ্ধের সমাপ্তি না হলে তাসের কাছে থাকা ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছে হামাস।

সিনওয়ারের মৃত্যুর পর ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নতুন অধ্যায় শুরুর ঘোষণা দিয়েছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে হিজবুল্লাহ জানায়, ইসরায়েলি শত্রুপক্ষের সঙ্গে চলমান সংঘাত একটি নতুন এবং ক্রমবর্ধমান অধ্যায়ে রূপান্তরিত হয়েছে। আগামী দিনগুলোতে বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে এ ঘোষণার প্রতিফলন দেখা যাবে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে হিজবুল্লাহ। তাদের দাবি, তারা ইসরায়েলি সেনাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার শুরু করেছে।

ইয়াহিয়া সিনওয়ারের হত্যাকাণ্ডে ওই অঞ্চলে প্রতিরোধ আরও জোরালো করার কথা জানিয়েছে ইরান। সিনওয়ার হত্যার পর জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধিদল জানিয়েছে, এ অঞ্চলে প্রতিরোধ আরও শক্তিশালী হবে। সিনওয়ার যুবক ও শিশুদের জন্য আদর্শ হয়ে থাকবেন। তার দেখানো পথ ধরে ফিলিস্তিনকে মুক্তির দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। যত দিন দখল ও আগ্রাসন চলবে, তত দিন প্রতিরোধও জারি থাকবে। শহীদের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে বেঁচে থাকবেন সিনওয়ার।

নেতানিয়াহু ও পশ্চিমাদের প্রতিক্রিয়া : ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের প্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ারের হত্যাকে গাজা যুদ্ধের ‘শেষের শুরু’ হিসেবে অভিহিত করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এটিকে নিজেদের বিজয় হিসেবে ঘোষণা করে নেতানিয়াহু বলেন, যদিও এটি গাজা যুদ্ধের শেষ নয়, তবে এটি শেষের শুরু। সিনওয়ারের মৃত্যু হামাসের অশুভ শাসনের পতনে একটি যুগান্তকারী ঘটনা বলে মন্তব্য করেন তিনি। হামাসপ্রধানকে হত্যার খবরে বিবৃতি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, সিনওয়ারের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করবে না তার দেশ। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এ ঘটনাকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর জন্য বড় সাফল্য বলে মন্তব্য করেন।

জিম্মিদের মুক্তি নিয়ে উদ্বেগ : ইয়াহিয়া সিনওয়ারের মৃত্যুতে উৎকণ্ঠা বেড়েছে হামাসের কাছে আটক জিম্মিদের স্বজনদের। ইসরায়েলি কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গাজায় এখনো ১০১ ইসরায়েলি বন্দি অবস্থায় রয়েছে। এসব জিম্মির স্বজনদের আশঙ্কা, হামাসপ্রধানের মৃত্যু হওয়ায় জিম্মিদের হত্যা করতে পারে সংগঠনটি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত