সাকিব আল হাসান, নামটা ছিল বাংলাদেশ দলের প্রায় সমার্থক। সাকিব ভালো করলে বাংলাদেশ জিতত, সাকিব খারাপ করলে বাংলাদেশ হারত। বিশ্বের এক নম্বর অলরাউন্ডার হয়ে সাকিব আল হাসান পরিণত হয়েছিলেন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ড, যে নামটার সঙ্গে জুড়তে চাইত করপোরেট প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো সরকারি সংস্থাও। নিয়তির ফেরে সেই সাকিব নামটাই এখন অস্বস্তির।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মিরপুরে টেস্ট খেলে দেশের মাটিতেই অবসর নিতে চাওয়া সাকিবের ইচ্ছেটা পূরণ হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হলেও দুবাই থেকে দেশে আসেননি সাকিব, সরকারের তরফ থেকেই তাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। শুক্রবার সাকিবের বদলি খেলোয়াড় হিসেবে টেস্ট দলে হাসান মুরাদের অন্তর্ভুক্তির কথাও আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে বিসিবি, কিন্তু কেন সাকিব খেলতে পারছেন না সেই কারণ জানানো হয়নি। জাতীয় লিগের পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান ঘোষণার অনুষ্ঠানে সাকিবকে নিয়ে করা প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন বিসিবি পরিচালক নাজমুল আবেদীন ফাহিম, যার সঙ্গে সাকিবের সম্পর্কটা গুরু-শিষ্যের। সব মিলিয়ে সাকিব এখন অস্বস্তির অন্য নাম।
বৃহস্পতিবার মিরপুর স্টেডিয়ামের সামনে দেখা গিয়েছিল সাকিব বিরোধীদের মিছিল, স্লোগান, বিক্ষোভ। শুক্রবার সেখানে সাকিব ভক্তদের আগমন। তাদের দাবি সাকিবকে মিরপুরে বিদায়ী ম্যাচ খেলার সুযোগ করে দেওয়ার। এই সব খ- খ- কার্যক্রমের পেছনে কারও উসকানি আছে নাকি স্বপ্রণোদিত, এসব প্রশ্নের উত্তর নেই; তবে সত্যিটা হচ্ছে পক্ষের বা বিপক্ষের কোনো তরফের কার্যক্রমই ভালো কোনো ফল বয়ে আনবে না। বাংলাদেশ সফরে আসা দক্ষিণ আফ্রিকা দল যখন স্টেডিয়ামে আসা-যাওয়ার পথে রোজ এমন জটলা এবং বিক্ষোভ দেখবে, সেটা দেশের ভাবমূর্তির জন্য যেমন ভালো নয় তেমনি এসব কর্মসূচি সুযোগসন্ধানীদের জন্যও উর্বর ক্ষেত্র। একটা উড়ে আসা ঢিল বা একটা অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাই বাংলাদেশকে ক্রিকেট বিশ্বে একঘরে করে ফেলবার জন্য যথেষ্ট।
শুক্রবার দুপুরে, বিসিবির তরফ থেকে জানানো হয় দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্ট ম্যাচের জন্য সাকিবের বদলে দলে নেওয়া হয়েছে বামহাতি স্পিনার হাসান মুরাদকে। সাধারণত কোনো ক্রিকেটার দলের বাইরে চলে গেলে তার কারণ উল্লেখ করা হয়। সাকিব কী কারণে খেলতে পারছেন না, সেই সংক্রান্ত কোনো ব্যাখ্যা বিসিবি দেয়নি। হাসান মুরাদকে নেওয়ার বার্তায় প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু শুধু বলেছেন, ‘আমাদের শুধু জানানো হয়েছে সাকিব অনুপস্থিত থাকবেন।’ জাতীয় ক্রিকেট লিগের টাইটেল স্পন্সর ঘোষণার অনুষ্ঠানে বিসিবি পরিচালক নাজমুল আবেদীন ফাহিমকেও সাকিব সংক্রান্ত প্রশ্ন করা হলে তিনি সংবাদ সম্মেলনটি শুধুই এনসিএল সংক্রান্ত বলে বিষয়টি এড়িয়ে যান।
দেশে আসতে গিয়ে মাঝপথে প্রত্যাখ্যাত হওয়া সাকিব কি এখন বাংলাদেশের হয়ে আগামীতে দেশের বাইরে যে ম্যাচগুলো আছে সেগুলোতে খেলবেন? আফগানিস্তানের বিপক্ষে আরব আমিরাতে ওয়ানডে সিরিজ আছে বাংলাদেশের, ওয়েস্ট ইন্ডিজেও আছে ৩ ওয়ানডে। এরপর পাকিস্তানে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি। এভাবে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর সাকিব কি আর গর্ব করে দেশের জার্সিটা পরবেন? এসব প্রশ্ন যেমন ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মনে, তেমনি চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটার হিসেবে বিসিবি কি ব্যবস্থা নিল তার ব্যাপারে সেটাও অজানা। টেস্ট এবং টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর নিয়ে নিলে সাকিব আর তিন সংস্করণেই চুক্তিতে থাকছেন না, তখন তার বেতন কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু সাকিব নিয়ে মুখে যেন কুলুপ এঁটে আছেন বিসিবির কর্তারা।
বছরের এই সময়টায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট খেলবেন মানে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলার জন্য কোথাও নাম নিবন্ধন করাননি সাকিব। এই সময়ে উল্লেখযোগ্য কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি আসরও নেই। ২১ নভেম্বর থেকে ২ ডিসেম্বর চলবে আবুধাবি টি-১০ লিগ, যেটা টেস্ট খেলার পর দিব্যি খেলতে পারতেন সাকিব। যেহেতু অন্য কোনো গন্তব্য বিকল্প হিসেবে পরিকল্পনায় রাখেননি সাকিব, তাতে করে ধারণা করা যায় যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারের কাছেই ফিরে গেছেন মাগুরার সাবেক সাংসদ।
সাকিবের ছোটবেলার কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘দেশকে সবাই কম-বেশি ভালোবাসে, এদের ভালোবাসাটা হয়তো দেখা যায়ও না, এদের কাছ থেকে দেখেছি, এরা মানুষের উপকার ছাড়া কারও ক্ষতি করেনি, এরা খুনি না’, এটা যেমন সত্যি তেমনি সত্যি যে সাকিব নির্বাচনের সময়ই জানতেন এটা হতে যাচ্ছে কারচুপির নির্বাচন। অবৈধ ভোটের মাধ্যমেই সাকিব স্বৈরশাসক হাসিনার সরকারের অংশ হয়েছেন, সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। জুলাই আন্দোলনের সময় দেশে যখন তরুণরা রাজপথে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, তখন সাকিব বউ-বাচ্চাসহ ভালো সময় কাটানোর ছবি দেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তাই তারুণ্যের একটা অংশ অবস্থান নিয়েছে সাকিবের বিরুদ্ধে। যে অংশটা নেতৃত্ব দিয়েছে স্বৈরাচার উৎখাতের আন্দোলনে, তাদের কাছে ক্রিকেটার পরিচয় ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে সাকিবের সাংসদ পরিচয়। এই ছাত্র-জনতার বিপ্লবেই নড়েছে নাজমুল হাসান পাপনের গদি, ক্রিকেট বোর্ডে এসেছেন বঞ্চিতরা। তাই তো সাকিবের পক্ষে কথা বলার উপায় তাদের নেই, ঠিক যেভাবে ছাত্রদের পক্ষে কথা বলার উপায় ছিল না আওয়ামী লিগের সাংসদ সাকিবের।
সব মিলিয়ে তাই সাকিব এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ক্রিকেটে এক অস্বস্তির নাম। মাঠের পারফরম্যান্সে দলে থাকলে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সাকিব কী করতে পারতেন, সেই প্রসঙ্গ ছাপিয়ে আলোচনায় সাকিবের ভক্তকুল এবং বিরোধী গোষ্ঠী। এদের যে কারও একটা ভুলের জন্য অনেক বড় মাশুল দিতে হতে পারে বাংলাদেশকে।
