নেপথ্যে বাজার দখলচেষ্টা

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৪, ০৭:৫১ এএম

বাজার কমিটির দখল নিতে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে মোহাম্মদপুর এলাকার মোহাম্মাদীয়া হাউজিং লিমিটেড কাঁচাবাজারের মালিক সমিতির সভাপতি আবুল হোসেন ও তার ছোট ভাই মাহবুবকে। গত বৃহস্পতিবার রাতের এ ঘটনার নেপথ্য কারিগর হিসেবে বিএনপির স্থানীয় কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন গুলিবিদ্ধ আবুল হোসেন। ঘটনার অল্প কিছুক্ষণ আগে বাজার কমিটির অফিসে আসেন স্থানীয় ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির নেতা হিসেবে পরিচিত আবদুস সাত্তার ও রহমান। তারা এসেই কার অনুমতি নিয়ে আবুল হোসেন বাজার কমিটির পদে বসেছেন এসব বলে শাসাতে থাকেন। এর অল্প কিছুক্ষণ পরেই তিনটি মোটরসাইকেলে করে ছয়জন অস্ত্রধারী সেখানে আসে এবং তার দিকে অস্ত্র তাক করে বাজার ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দেয়। গুলিবিদ্ধ আবুল হোসেন ও বাজারের একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

গুলিবিদ্ধ আবুল হোসেন রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, “আমি বাজারের অফিসে বসে ছিলাম। তখন সাত্তার ও রহমানসহ তিনজন এসে আমাকে বলে, আমি কার অনুমতি নিয়ে বাজার কমিটির পদে বসেছি। তারা স্থানীয় বিএনপির নেতা, তাদের জানানো হয়নি কেন? আমি তখন ঠান্ডা মাথায় তাদের সঙ্গে কথা বলছিলাম। এর মধ্যে রহমান বাইরে গিয়ে কার সঙ্গে যেন ফোনে কথা বলে আবার ভেতরে ঢোকে। তার কিছুক্ষণ পরেই তিনটি মোটরসাইকেলে করে ছয়জন ছেলেপেলে আসে। তাদের দুজন বাইরে থাকে। দুজন অফিসের সামনে দরজায় এবং দুজন ভেতরে। ভেতরে আসা দুজন আমাকে অস্ত্র ঠেকিয়ে বাজার থেকে বের হয়ে যেতে বলে। আমাকে অস্ত্র ঠেকানোর আগে একজন বলছিল, ‘নবী (নবী হোসেন) ভাই ফোন দিছে, তুই ধরস নাই কেন? তোর কত বড় সাহস! এখনই তুই বাজার ছাইড়া যাইবি’।”

বিএনপি নেতাদের অফিসে আসা ও অস্ত্রধারী দিয়ে গুলি করানোর পুরো পরিকল্পনা বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক সোলায়মানের এমন অভিযোগ তুলে আবুল হোসেন বলেন, ‘সোলায়মান বাজারের সভাপতি হতে চায়। সে আগে আমার কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিল। সে লোকজন দিয়ে এই খেলা খেলছে। তার ছেলে বিএনপির রাজনীতি করে। সে ছেলের পাওয়ার খাটিয়ে সভাপতি হতে চায়।’

যদিও যাদের দিকে অভিযোগের তীর তারা সবাই এসব বিষয় অস্বীকার করেছেন। হুমকি দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সহসভাপতি আবদুস সাত্তার বলেন, ‘আমি সাধারণত বাজারে যাই না। গতকাল (বৃহস্পতিবার রাতে) আমি ও রহমান গিয়েছিলাম। তার (আবুলের) অফিসে বসে চা খেয়ে চলে এসেছি। আমরা চলে আসার পর তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। তাকে কোনো ধরনের হুমকি দেওয়ার ঘটনা ঘটেনি। আপনাকে এ কথা কে বলল বুঝলাম না।’

এ বিষয়ে বিএনপি নেতা হিসেবে পরিচিত রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগ ওঠা আরেকজন সোলায়মান বলেন, ‘আমি কোনো দিনই বাজার কমিটির সভাপতি হতে চাইনি। আমি ওই এলাকায় তেমন একটা যাইও না। আবুল নিজেকে সভাপতি দাবি করে। বিভিন্ন কাজে আমাকে ডাকলে আমি যাই। এ ছাড়া তার সঙ্গে আমার কোনো শত্রুতা নেই। সে আমার ওপর কোনো দোষ চাপাচ্ছে এটা আমার জানা নেই। সে অভিযোগ করতেই পারে, কিন্তু এ বিষয় আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।’

আতঙ্কিত ব্যবসায়ীরা মুখ খুলছেন না : আবুল হোসেনের শরীরে তিনটি গুলি লেগেছে। একটি গুলি হাঁটুর ওপরের অংশ এফোঁড়-ওফোঁড় করে বেরিয়ে গেছে। আশঙ্কাজনক অবস্থা আবুলের ছোট ভাই মাহবুব মিয়ার। পিঠে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করায় হাড় ভেঙে গেছে। তিনি রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। গুলিবিদ্ধদের অবস্থা কিছুটা জটিল থাকায় গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি।

বৃহস্পতিবার রাতের ঘটনার বিষয়ে বাজারের অন্তত ১৩ জন প্রত্যক্ষদর্শী ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। তারা কেউই নাম-পরিচয় প্রকাশ করে গণমাধ্যমে কথা বলতে রাজি হননি। প্রত্যক্ষদর্শী ব্যবসায়ীদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তাদের লোকজনই বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। বাজারে প্রায় ৩০০ দোকান আছে। প্রত্যেক দোকান থেকে সমিতির নামে টাকা তোলা হয়। সেই টাকা ব্যবসায়ীদের কল্যাণে খরচ না করে দখলদাররাই পকেটে ভরে। আমরা ভোট দিয়ে আবুলকে নির্বাচিত করেছিলাম। কিন্তু ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রাজীব আমাদের নির্বাচিত কমিটিকে তাড়িয়ে দিয়ে তার লোক বসায়। পরে আসিফ কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে বসায় তার লোকজন। বাজারে ব্যবসা না করেও তারা বাজার কমিটির নেতা হয়। এতদিন লুটপাট করলেও কেউ কিছুই বলতে পারেনি। সরকার পালানোর পর তারাও পালিয়েছে। এরপর কয়েক দিন ধরে আবুল মালিক সমিতির অফিসে বসতে শুরু করে। এখন বিএনপির কয়েকজন নেতা বাজার দখলের পাঁয়তারা করছে। গতকাল (বৃহস্পতিবার) তো সবার সামনে আবুল ও তার ভাইকে গুলি করে ফেলে রেখে গেল।’

ছয় সন্ত্রাসীর মধ্যে গুলি করে দুজন : আবুলকে হুমকি দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার সময় তার চিৎকারে বাজারের অন্য ব্যবসায়ীরা সমিতির অফিসের দিকে এগিয়ে আসে বলে জানান আরেক প্রত্যক্ষদর্শী। তখন অস্ত্রধারীরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে একজনকে ধরে ফেলেন ব্যবসায়ীরা। এ সময় নবীর ভাই কালু আবুলের পায়ে দুটি গুলি করে। আর রাজু আবুলের ছোট ভাই মাহবুবের পিঠে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে পালিয়ে যায়। ব্যবসায়ীরা একটি মোটারসাইকেল আটকালে সেটি ফেলে যায় অস্ত্রধারীরা। ওই অস্ত্রধারীদের সবাই মোহাম্মদপুরের নবোদয় হাউজিং সোসাইটির বাসিন্দা। গতকাল পর্যন্ত এলাকায় তাদের প্রকাশ্যে ঘুরতে দেখেছেন এলাকাবাসী।

দুই ভাইকে গুলির ঘটনায় জড়িতদের ছাড় না দেওয়ার কথা জানিয়েছেন মোহাম্মদপুর থানার ওসি আলী ইফতেখার হাসান। তিনি গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি। তবে আমরা ছায়াতদন্ত শুরু করেছি। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তে আমরা কাজ করছি। জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ভুক্তভোগীরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ রয়েছে। দ্রুতই মামলা নিয়ে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হবে।’

কে এই নবী : পুরো নাম নবী হোসেন। আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থার (ইন্টারপোল) রেড নোটিসভুক্ত এ দাগি আসামির বয়স ৫২ বছর উল্লেখ করা হয়েছে সংস্থাটির ওয়েবসাইটে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে নবী হোসেনের নেতৃত্বে মোহাম্মদপুর এলাকার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। ২০০৭ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের মুখে তিনি বিদেশে পালিয়ে যান। তার বিরুদ্ধে হত্যাসহ ২০টির বেশি মামলা আছে। বর্তমানে থাইল্যান্ডে আত্মগোপনে আছেন। ছোট ভাই কালু নির্দেশনা পেলে তার হয়ে খুন, দখল, চাঁদাবাজির মতো কর্মকান্ড করেন। নবীর জন্ম ও বেড়ে ওঠা ভোলায়। বিদেশে বসেই তিনি নিয়ন্ত্রণ করেন অপরাধজগৎ। তার অধীনে প্রায় ৪০ জন অস্ত্রধারী কাজ করে।

আবুল হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ‘নবী ভাড়াটে মাস্তান মাত্র। নবীর এখানে কিছু নেই। আমাকে কমিটি থেকে সরিয়ে দিতে তাকে দিয়ে এসব পোলাপান ভাড়া করা হয়েছে।’

নবীর বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার ওসি ইফতেখার হাসান বলেন, ‘আমরা তার ব্যাপারেও খোঁজখবর নিচ্ছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত