সংসদ থেকে ফের বিচার বিভাগে

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৪, ০৭:১০ এএম

পুনর্বহাল হলো সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল। অর্থাৎ উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের পেশাগত অসদাচরণ বা অসমর্থতায় জাতীয় সংসদের পরিবর্তে আগের মতো এ কাউন্সিলের মাধ্যমে তাদের অপসারণ করা হবে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ন্যস্ত করা হয়েছিল।

গত সপ্তাহে শিক্ষার্থীদের হাইকোর্ট ঘেরাও কর্মসূচির মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগের ১২ বিচারপতিকে বিচারকাজ থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। ওই সময় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জানায়, বিচারপতিদের অপসারণ-সংক্রান্ত একটি মামলা (সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী) আপিল বিভাগে বিচারাধীন। এটি রবিবার (গতকাল) নিষ্পত্তি হবে।

এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল রবিবার বহুল আলোচিত এ মামলাটি আপিল বিভাগের কার্যতালিকার শীর্ষে আসে। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে করা রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনা) আবেদন নিষ্পত্তি করে সিদ্ধান্ত দেয়।

বেঞ্চের অন্য পাঁচ বিচারক হলেন বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি সৈয়দ মো. জিয়াউল করিম, বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও বিচারপতি এসএম এমদাদুল হক।

রিভিউর রায়ে ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ থেকে বাতিলকৃত ২ থেকে ৮ উপ-অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল (রিস্টোর) করেছে সর্বোচ্চ আদালত।

রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, এ পদ্ধতির মাধ্যমে এখন পর্যন্ত অসদাচরণের অভিযোগে হাইকোর্টের একজন বিচারপতিকে অপসারণ করা হয়েছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৩ সালের অক্টোবরে হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি সৈয়দ শাহিদুর রহমানের বিরুদ্ধে উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগ আনা হয়। পরের বছর ২০ এপ্রিল সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে তাকে অপসারণ করা হয়। এ ছাড়া ২০০৪ সালে এলএলবি পরীক্ষার নম্বরপত্র ঘষামাজার অভিযোগ ওঠার পর হাইকোর্টের বিচারপতি ফয়সাল মাহমুদ ফয়েজীর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে ২০০৭ সালে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠিত হয়। ওই বছরের জুলাইতে তিনি নিজেই পদত্যাগ করেন।

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল কী, কীভাবে কাজ করে : ১৯৭২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রণীত সংবিধানে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা ছিল জাতীয় সংসদের কাছে। ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এ ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা হয়। ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের সরকারের সময়ে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণ- সংক্রান্ত ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে ন্যস্ত করা হয়। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর আগে ৯৬ অনুচ্ছেদের ৩ নম্বর উপ-অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতি এবং আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ দুজন বিচারপতিকে নিয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন হবে। কাউন্সিলের কোনো সদস্য অনুপস্থিত, অসুস্থ কিংবা অসমর্থ হলে অথবা কাউন্সিলের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধেই যদি অসদাচরণের তদন্ত চলে, তাহলে আপিল বিভাগের পরবর্তী জ্যেষ্ঠ বিচারক কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে কাজ করবেন। কাউন্সিলের দায়িত্বের বিষয়ে ৪ উপ-অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিচারকদের জন্য পালনীয় একটি আচরণবিধি নির্ধারণ করবে কাউন্সিল এবং একজন বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে সে বিষয়ে তদন্ত করবে। ৫ উপ-অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কাউন্সিল অথবা অন্য কোনো সূত্র থেকে রাষ্ট্রপতি যদি অবগত হন যে, কোনো বিচারক শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যরে কারণে দায়িত্ব পালনের অযোগ্য হয়ে পড়েছেন বা তার বিরুদ্ধে গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ রয়েছে, তাহলে রাষ্ট্রপতি কাউন্সিলকে বিষয়টি তদন্ত করে ফলাফল জানানোর নির্দেশ দেবেন। ৬ উপ-অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, তদন্তের পর কাউন্সিল যদি সংশ্লিষ্ট বিচারকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ বা তার অসামর্থ্যরে প্রমাণ পায় এবং বিষয়টি রাষ্ট্রপতিকে জানায়, তাহলে রাষ্ট্রপতি ওই বিচারককে অপসারণের নির্দেশ দেবেন। তদন্তের ক্ষেত্রে কাউন্সিল নিজের কর্মপদ্ধতি ঠিক করবে এবং সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা ধারণ করবে বলে ৭ উপ-অনুচ্ছেদে বলা হয়।

গতকাল রিভিউ নিষ্পত্তির রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল এ বিষয়ে সাংবাদিকদের জানান, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে কোনো অভিযোগ করলে বা তারা অভিযোগ পেলে প্রাথমিক একটি অনুসন্ধান করবে। যাচাই-বাছাই করে দেখবে, অসদাচরণ, দুর্নীতি বা বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি পাওয়া গেছে কি না। তদন্ত প্রতিবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবে। রাষ্ট্রপতি বিচার-বিবেচনা করে আবার সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে পাঠাবেন। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল তখন পরিপূর্ণ তদন্ত করবেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, ‘এখানে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত মেকানিক্যাল। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের দায়িত্ব হলো অসদাচরণ প্রমাণিত হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করে সুপারিশ পাঠানো। আর ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে কাউকে সাজা দিতে গেলে অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হতে হয়। কিন্তু সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ক্ষেত্রে সন্দেহাতীতভাবে অভিযোগ প্রমাণের দরকার নেই।’

ফিরে দেখা বহুল আলোচিত ষোড়শ সংশোধনী মামলা : ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তখনকার আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারকদের অপসারণ ক্ষমতা ফের জাতীয় সংসদে ন্যস্ত করে। এ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ওই বছরের ৫ নভেম্বর উচ্চ আদালতের ৯ জন আইনজীবী হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ৯ নভেম্বর ষোড়শ সংশোধনীর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এটি কেন বাতিল ও সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল দেয় হাইকোর্ট। রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০১৬ সালের ৫ মে হাইকোর্টের একটি বৃহৎ বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ও বাতিল বলে রায় দেয়। হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, ‘ষোড়শ সংশোধনী একটি কলারেবল লেজিসলেশন (সংবিধানে কোনো সিদ্ধান্তের সুযোগ না থাকলে আইনসভা কর্তৃক ছদ্মাবরণে ভিন্ন প্রয়োজনের যুক্তি দেখিয়ে আইন তৈরির প্রবণতা), যা রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ, আইন সভা থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ নীতির লঙ্ঘন। এটা সংবিধানের দুটি মূল কাঠামো ৯৪(৪) ও ১৪৭(২) অনুচ্ছেদেরও লঙ্ঘন। রায়ে আরও বলা হয়, ‘বিশে^র বিভিন্ন দেশে আইনসভার কাছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা রয়েছে। দেশের সংবিধানেও শুরুতে এই বিধান ছিল। তবে সেটি ইতিহাসের দুর্ঘটনা মাত্র।’ রায়ে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদের ফলে দলের বিরুদ্ধে সংসদ সদস্যরা ভোট দিতে পারেন না। তারা দলের হাইকমান্ডের কাছে জিম্মি এবং কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। ৭০ অনুচ্ছেদের সংসদ সদস্যদের দলের অনুগত থাকতে হয়। বিচারপতি অপসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও তারা দলের বাইরে যেতে পারেন না।’

হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের ৪ জানুয়ারি আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সাংবিধানিক ও আইনি ব্যাখ্যা এবং মতামত নিতে ১০ জন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি (আদালতকে আইনি সহায়তাকারী) হিসেবে নিয়োগ দেয় আপিল বিভাগ। তারা হলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী টি এইচ খান, ড. কামাল হোসেন, এম আমীর-উল ইসলাম, আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, ফিদা এম কামাল, রোকনউদ্দিন মাহমুদ, এএফ হাসান আরিফ, এ জে মোহাম্মদ আলী, এম আই ফারুকী ও আজমালুল হোসেন কিউসি। তাদের মধ্যে শুধু আজমালুল হোসেন ষোড়শ সংশোধনীর পক্ষে মত দেন। অন্য ৯ জন এই সংশোধনীর বিপক্ষে তাদের মতামত ও ব্যাখ্যা দেন। শুনানি শেষে একই বছরের ৩ জুলাই হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে সিদ্ধান্ত দেয় তখনকার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে সিনহা) সিনহার নেতৃত্বে গঠিত সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চ। এরপর ওই বছরের ১ আগস্ট প্রায় ৮০০ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়।

আপিল বিভাগের এ রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে ২০১৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর রিভিউ আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। তবে সাড়ে ছয় বছরের বেশি সময়ে রিভিউ আবেদনের ওপর শুনানি হয়নি। একই সঙ্গে আপিল বিভাগের রায়ের পর সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বহাল আছে কি নেই এ নিয়েও বিতর্ক চলে বহুদিন। যদিও রিটকারী পক্ষের আইনজীবীদের দাবি ছিল, যেহেতু আপিল বিভাগ রায়টি স্থগিত করেনি, তাই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বহাল রয়েছে। তবে আওয়ামীপন্থি আইনজীবী, সেই সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হকসহ সরকারের মন্ত্রীরা দাবি করে আসছিলেন, যেহেতু মামলাটির চূড়ান্ত মীমাংসা হয়নি, তাই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বহাল আছে, এটি বলা যাবে না। গতকাল সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলেন, বিচারপতি অপসারণ প্রক্রিয়া নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছিল, দীর্ঘদিন পর হলেও তার অবসান হলো। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। ষোড়শ সংশোধনী মামলার রিটকারীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। আদালতের অনুমতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মতামত দেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল।

এস কে সিনহার দেশত্যাগ ও পদত্যাগ : আপিল বিভাগের প্রকাশিত রায়ে এস কে সিনহা বাংলাদেশের গণতন্ত্র, রাজনীতি, নির্বাচন কমিশন, সুশাসনের দুর্বলতাসহ সামরিক শাসন, দুর্নীতি ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে পর্যবেক্ষণ দেন। এ পর্যবেক্ষণের ফলে তিনি তখনকার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের রোষানলে পড়েন এবং সরকারের সঙ্গে তার টানাপড়েন শুরু হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী, দলটির নেতা ও আইনজীবীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে তার পদত্যাগের দাবি তোলেন। অন্যদিকে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন এস কে সিনহার প্রতি বিরূপ আচরণের প্রতিবাদে নানা কর্মসূচি পালন করে।

একপর্যায়ে অসুস্থতার কথা বলে এস কে সিনহাকে পাঠানো হয় ছুটিতে। যদিও বিদেশ যাওয়ার আগে ২০১৭ সালের ১৩ অক্টোবর তিনি গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, তিনি অসুস্থ নন এবং নিজ ইচ্ছায় ছুটিতে যাচ্ছেন না। পরে বিদেশে থাকাবস্থাতেই তিনি প্রধান বিচারপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তার বিরুদ্ধে তখন বেশ কিছু অনৈতিক কর্মকা-ের অভিযোগের কথা তখনকার সরকারের তরফে বলা হলেও শুধু দুর্নীতির একটি মামলা করা হয়েছিল। ২০২১ সালের ৯ নভেম্বর দুর্নীতির এ মামলায় এস কে সিনহাকে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও দুর্নীতি দমন আইনের পৃথক দুই ধারায় ১১ বছরের কারাদন্ডাদেশ ও অর্থদন্ড দেয় ঢাকার একটি বিশেষ আদালত। এস কে সিনহা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। ষোড়শ সংশোধনীর মামলার রায়কে কেন্দ্র করে তাকে হেনস্তা, বিদেশে পাঠানো ও পদত্যাগে বাধ্য করা নিয়ে তিনি বই লিখেছেন। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যম ও ইউটিউব চ্যানেলেও তখন তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার বর্ণনা দেন তিনি।

বিচার বিভাগের জবাবদিহির রায় : আসিফ নজরুল

আপিল বিভাগের রায়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনর্বহাল হওয়ায় ছাত্র-জনতা তাদের অভিযোগ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পেশ করতে একটি ফোরাম পেয়েছে বলে মনে করেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল। একই সঙ্গে এতে বিচার বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আসিফ নজরুল বলেন, ‘বর্তমান সময়ে এসে এটার (এই রায়) বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। হাইকোর্টে কিছু বিচারকের বিরুদ্ধে সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে প্রচুর অভিযোগ রয়েছে। তারা গত জুলাই-আগস্টের গণবিপ্লবে পতিত ফ্যাসিস্ট শক্তির নিপীড়কযন্ত্রে পরিণত হয়েছিলেন। তাদের নিয়ে ছাত্র-জনতার অনেক ক্ষোভ রয়েছে।’

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে বিচারপতিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিষ্পত্তির একটা অ্যাভিনিউ খুলে গেছে এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘উচ্চ আদালত সম্পূর্ণ স্বাধীন, তারা তাদের মতো করে ব্যবস্থা নেবেন। তবে আমরা মনে করি, ছাত্র-জনতা তাদের অভিযোগ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পেশ করতে একটা ফোরাম পেল।’

উপদেষ্টা বলেন, ‘জবাবদিহি নিশ্চিত করার ইচ্ছাও তৎকালীন উচ্চ আদালতের প্রশাসনের ছিল না। তখন ফরমায়েশি রায় হয়েছিল। বহু মানুষ তাদের মানবাধিকার রক্ষা করার সুযোগ পাননি। বর্তমানে যারা কর্তৃপক্ষ আছেন, আদালতের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সদিচ্ছা তাদের আছে। এবার সেটা বাস্তবায়ন করার ফোরামও পুনরুজ্জীবিত হয়েছে।’

বিচার বিভাগ দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এলো : অ্যাটর্নি জেনারেল

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, ‘হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ থেকে যে মুহূর্তে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বহাল হয়ে গেছে। ওই রায়ে বলা হয়েছে ১৬তম সংশোধনী বাতিল। তার মানে ১৫তম সংশোধনীতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের যে বিধান ছিল, সেটা পুনর্বহাল হলো।’

বিচারকাজ থেকে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে হাইকোর্টের তিন বিচারপতিকে বিরত রাখা সংক্রান্ত এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তিনজন বিচারপতির বিষয়টি কেন ঝুলিয়ে রেখেছিলেন, এটার উত্তর দিতে পারবেন যারা ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। আমরা জায়গা থেকে আমি বলতে পারি তারা (যারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন) সঠিক কাজ করেননি। তারা একটা অসাংবিধানিক কাজ করেছিলেন।’

এ রায়ের ফলে বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতার দৃষ্টান্ত তৈরি হলো কি না এমন প্রশ্নে আসাদুজ্জামান বলেন, ‘নিশ্চিতভাবে। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনর্বহাল হওয়া মানে একদিকে বিচার বিভাগ দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতির খপ্পর থেকে বেরিয়ে এলো। বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের একটা জায়গায় গেল। এ ছাড়া সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ওপর ঐতিহাসিকভাবে দায়িত্ব অর্পিত হলো।’

হাইকোর্টের ১২ জন বিচারককে বিচারকাজ থেকে বিরত রাখার পর তাদের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হবে জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল প্রাথমিক তদন্ত করে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতিবেদন পাঠাবে। রাষ্ট্রপতি বিচার বিবেচনা করে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে পাঠাবেন। কাউন্সিল তখন পরিপূর্ণভাবে অবহিত করবে। তদন্ত করে তাদের মতামত দেবে।’

রিটকারীপক্ষের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা একটা কঠিন আইনি লড়াই ছিল। এ মামলার রায় দেওয়ার কারণে একজন প্রধান বিচারপতিকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। এতেই বোঝা যায়, এ মামলার আইনজীবীরা কী প্রতিকূলতার মধ্যে কাজ করেছেন।’

বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ‘এটি একটি ঐতিহাসিক রায়। ফ্যাসিজমের মূলোৎপাটনের অন্যতম সিদ্ধান্ত হলো এটি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত