সবজির মূল্য ও ত্রুটিপূর্ণ বাজার ব্যবস্থা

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৪, ০২:০৭ এএম

সম্প্রতি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার পলাশতলী গ্রামের একজন অটোরিকশা চালকের সঙ্গে কথা হলো। তাকে মাছ, মাংস, ডিম, তরিতরকারির দাম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে জানালেন মূল্যবৃদ্ধির কারণে মাসে একদিন ব্রয়লার মুরগির মাংসও জোটে না তাদের ভাগ্যে। মাছ, ডিম ও দুধ খাওয়া অনেক দিন আগেই ভুলে গেছেন। কম দামি শাকসবজিই ছিল তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা। সেই সবজির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি তার মতো স্বল্প আয়ের মানুষজনকে মহাবিপদে ফেলেছে। বর্তমানে বাজারে ৮০ থেকে ১০০ টাকার নিচে কোনো সবজিই পাওয়া যায় না। ‘গরিবের সবজি’ বলে খ্যাত মুলার দামও ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজি। সম্প্রতি ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন হাটবাজার পরিদর্শনের সময় দেখা যায়, একেক বাজারে ভিন্ন ভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে শাকসবজি। মেছুয়া বাজারে যে করলার দাম ৮০ টাকা, নতুন বাজারে সেই একই করলা ১০০ টাকা কেজি। শানকিপাড়া বাজারে যে চিচিঙ্গা ৮০ টাকা কেজি, মেছুয়া বাজারে সেই চিচিঙ্গা ৬০ টাকা কেজি। এ ছাড়া প্রতিটি ছোট চাল কুমড়া ৬০ টাকা, মাঝারি আকৃতির লাউ ১০০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে শজনে। ফুল কপি বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা, বাঁধাকপি বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১০০ টাকা আর ঝিঙা পটোল ঢেঁড়স বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা কেজি দরে। মিষ্টি কুমড়ার কেজিও ৮০ টাকা। এসব সবজি আজ থেকে ১৫ দিন আগেও অর্ধেক বা চার ভাগের তিন ভাগ দামে বিক্রি হয়েছে ময়মনসিংহের বিভিন্ন বাজারে। অন্য সবজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়লেও দাম বাড়েনি কাঁচা পেঁপে, শোলা কচু, কচুশাক, পাটশাক, ঢেঁকিশাক, গিমাকলমির শাকের। তবে বেড়েছে লাউশাকেরও দাম। আগে যে লাউ শাকের আঁটি ছিল ২০ টাকা, বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়। ময়মনসিংহ মহানগরের বিভিন্ন বাজারে টমেটো বিক্রি হচ্ছে ২৪০, গাজর ১৮০, গোল বেগুন ১২০ থেকে ১৪০, লম্বা বেগুন ৮০ থেকে ১০০ এবং ২০০ টাকা কেজি দরে নতুন শিম বিক্রি হচ্ছে। আলু বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজি দামে। এ পণ্যটির দাম গত ১৫ দিনে বাড়েনি বরং একটু কমেছে। সবজির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মসলার দাম। ভারতীয় পেঁয়াজ ১০০ টাকা ও দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকা, রসুন বিক্রি হচ্ছে ২৪০ ও আদা ৩২০ টাকা কেজি দরে।

দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে না পারলে মানুষ এই সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসতে পারে বলে মন্তব্য করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ। হঠাৎ জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়াকে ফ্যাসিবাদের চক্রান্ত বলে উল্লেখ করেন তিনি। একই ধরনের কথা বলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের কৃষক-শ্রমিক-দিনমজুর ও স্বল্প আয়ের মানুষ দুর্বিষহ পরিস্থিতির মুখোমুখি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যে দিশেহারা। জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও মানুষের আয় সেভাবে বাড়েনি। সরকারকে উদ্দেশ্য করে তিনি আরও বলেন, জিনিসপত্রের দাম কমাতে পদক্ষেপ নিন। সিন্ডিকেট ভেঙে দিন। প্রয়োজনে উপদেষ্টা পরিষদের পরিধি বৃদ্ধি করুন।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অসময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও পরপর তিনবার বন্যার কারণে আগাম রোপণকৃত শীতকালীর সবজি নষ্ট হয়ে যায় এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। ফুলবাড়িয়া উপজেলার আন্ধারিয়া পাড়ার ক্ষুদ্র কৃষক মো. আব্দুল হাই এবার ২ শতক জমিতে লালশাক, মুলা ও ডাঁটা লাগিয়েছিলেন। সবজির গাছগুলো ৫ থেকে ৬ ইঞ্চি বড় হওয়া মাত্রই ভারী বৃষ্টির পানিতে পচে নষ্ট হয়ে গেছে। এতে ক্ষতি হয়েছে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা। ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ত্রিশাল ইউনিয়নের ছলিমপুর গ্রাম সবজি চাষের জন্য বিখ্যাত। এই গ্রামে বেগুন, ডাঁটা, করলা, লাউ প্রভৃতি সবজি ১২ মাসই উৎপাদিত হয়। এ বছর ১৫ হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজির চাষ হয়েছিল। অসময়ে অতি বর্ষণের জন্য ওই গ্রামের প্রায় ২ হেক্টর জমির সবজি সম্পূর্ণ এবং ৫ থেকে ৬ হেক্টর জমির সবজি আংশিক ক্ষতির শিকার হয়। সম্প্রতি শেরপুর, নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহ জেলায় অতিবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট বন্যায় কৃষির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বন্যার কারণে শুধু রোপা আমন ধানই নষ্ট হয়নি, শাকসবজি ও মসলা ফসলও নষ্ট হয়েছে। জানা যায়, শেরপুর জেলায় ১ হাজার ৫৯ হেক্টর জমির শাকসবজি নষ্ট হয়েছে বন্যায়। আদা নষ্ট হয়েছে ১২ দশমিক ৭ হেক্টর জমির। অন্যদিকে নেত্রকোনা জেলায় সবজি নষ্ট হয়েছে ১৬০ হেক্টর জমির। এতে ৫ হাজার ৩২০ জন কৃষকের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৩ কোটি টাকা।

বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে হলে কৃষকদের সময়মতো দ্রুত বর্ধনশীল শাকসবজি যেমন- লাল শাক, ডাঁটা শাক, মুলা শাক, পালং শাক, বেগুন ও গাজরের মতো সবজি রোপণ করতে হবে। বন্যায় আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত সবজি জমিতে পরিচর্যার কাজ শুরু করতে হবে সময়মতো। পোকামাকড় ও রোগবালাই দমনে তৎপর হতে হবে কৃষক ভাইদেরই।

উৎপাদন বৃদ্ধি ও বাজার ব্যবস্থার উন্নতি করা ছাড়া সবজির দাম কমানোর কোনো বিকল্প নেই। ফলে সবজির মূল্য সহনশীল পর্যায়ে রাখতে হলে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে

১. বন্যায় ফসল নষ্ট হওয়ার কারণে কৃষকের হাতে এখন নগদ অর্থ নেই। আবার নেই বিক্রয়যোগ্য কোনো ফসল। ফলে বন্যার পানি সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষক যাতে দ্রুত বর্ধনশীল সবজি চাষ করতে পারেন, সেজন্য বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সবজি চাষিদের মধ্যে অনতিবিলম্বে বিনামূল্যে উচ্চ ফলনশীল জাতের সবজি বীজ, প্রয়োজনীয় সার ও বালাইনাশক বিনামূল্যে বিতরণ করতে হবে।

২. সবজি চাষিদের স্বল্প সুদে প্রয়োজনীয় কৃষিঋণ দিতে হবে।

৩. সবজি পরিবহনের সময় সব ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে।

৪. আপাতত ২ মাস সবজিবোঝাই ট্রাক-ট্রলি চলাচলের ওপর বঙ্গবন্ধু ব্রিজ ও পদ্মা ব্রিজের টোল আদায় স্থগিত রাখতে হবে।

৫. নিয়মিত বাজার মনিটরিং করতে হবে। প্রত্যেক সবজি ব্যবসায়ীকে মূল্য তালিকা প্রদর্শন করতে হবে।

৬. সবজি উৎপাদন এলাকা থেকে ট্রেনের বগিতে করে কম ভাড়ায় সবজি রাজধানীসহ বিভিন্ন নগরে পরিবহন করতে হবে।

৭. শুধু আলুর জন্য নয়, সবজি সংরক্ষণের জন্য সবজি উৎপাদন এলাকাগুলোতে পর্যায়ক্রমে সারা বছর সবজি সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক হিমাগার স্থাপন করতে হবে।

৮. এ ছাড়া কৃষক যাতে উৎপাদিত সবজির ন্যায্যমূল্য পান এবং কোনো ফড়িয়া দালালের খপ্পরে না পড়েন এজন্য দেশের প্রতিটি মহানগর, জেলা শহর ও উপজেলা শহরে কৃষিবাজার গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শুধু কৃষক তার উৎপাদিত পণ্য সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রির সুযোগ পান।

৯. সঠিক সংরক্ষণের অভাবে উৎপাদিত সবজির প্রায় ৩০ থেকে ৪০ ভাগ নষ্ট হয়ে যায়। কীভাবে দেশীয় পদ্ধতিতে সবজি সংরক্ষণ করতে হয়, তাও অনেক কৃষক জানেন না। তাই সবজি চাষিদের সবজি সংরক্ষণের ওপর পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

কৃষক কষ্ট করে যে পণ্য উৎপাদন করেন, সে তার ন্যায্যমূল্য পান না। কারণ কৃষিপণ্য বিপণনে বাংলাদেশের যত সংখ্যক মধ্যস্বত্বভোগী আছে আর কোনো দেশে এত মধ্যস্বত্বভোগী নেই। কৃষকের কাছ থেকে প্রথমে সবজি যায় আড়তদারে গুদামে। সেখান থেকে পাইকারি বিক্রেতা এবং তার কাছ থেকে খুচরা ব্যবসায়ী সবজি ক্রয় করে। খুচরা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ভোক্তা কৃষকের বিক্রীত মূল্যের কয়েকগুণ বেশি দামে শাকসবজি ক্রয় করেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় দেশে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচের গড় উৎপাদন খরচ ৪৯ টাকা ৬০ পয়সা। গত আগস্টে খুচরা বাজারে সেই কাঁচা মরিচ বিক্রি হয়েছে ২৩৬ টাকা কেজি দরে। অর্থাৎ উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে ৫ গুণ বেশি দামে কাঁচা মরিচ কিনেছেন ভোক্তা। এ ছাড়া প্রতি কেজি হলুদের উৎপাদন খরচ ৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা আর সেই হলুদ খুচরা বাজারে বিক্রি হয় ৩২৩ টাকা কেজি দরে। অর্থাৎ উৎপাদন খরচের চেয়ে ৯ দশমিক ৩০ গুণ বেশি দামে হলুদ কিনতে হচ্ছে ভোক্তাকে ঢাকা চেম্বার অ্যান্ড কমার্স ইন্ডাস্ট্রির গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।

নিত্যপণ্যের দাম ৯ গুণ বৃদ্ধির পেছনে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, কম সরবরাহ, অদক্ষ বাজার ব্যবস্থাপনা, উচ্চ পরিবহন খরচ, বাজারের আধিপত্য এবং সীমিত দর কষাকষির ক্ষমতার বিষয়টি উঠে এসেছে। ঢাকা চেম্বারের সভাপতি আশরাফ আহমেদের মতে, উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাতে কয়েক গুণ দাম বাড়লেও উৎপাদকরা পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান না। কখনো কখনো মূল্যবৃদ্ধির জন্য পরোক্ষ করও দায়ী। যদি মজুদ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াকরণ পর্যায়ে উৎপাদন ব্যয় কমানো যায় তা হলে দাম তুলনামূলকভাবে কমে আসবে।

আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস বড় কোনো প্রাকতিক দুর্যোগ না হলে, আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে শীতের আগাম সবজিতে বাজার ভরে উঠবে এবং সেই সঙ্গে কমতে শুরু করবে সবজির দাম। যার লক্ষণ ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। যেমন আজ থেকে ৭ দিন আগে যে মুলার কেজি ছিল ১০০ টাকা সেই মুলা এখন ময়মনসিংহ মহানগরের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি দরে। ফুলকপির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। তবে সবজি মূল্যের বর্তমান ঊর্ধ্বগামী দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। সাধারণ মানুষকে স্বস্তিতে রাখার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত