সেন্টমার্টিনে রাত যাপন নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত আগেরই

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৪, ০৭:২২ এএম

সেন্টমার্টিন দ্বীপে রাতে অবস্থান বন্ধের সিদ্ধান্তটি নতুন কিছু নয়। সাত বছর আগে ২০১৮ সালে দেশের একমাত্র এই প্রবাল দ্বীপে পর্যটকদের রাত্রিকালীন অবস্থান নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত হয়, যা শুধু নিষিদ্ধেই সীমিত ছিল না। দ্বীপটির অধিবাসীদের ধাপে ধাপে মূল ভূখন্ডে সরিয়ে আনার সিদ্ধান্তও ছিল। একই সঙ্গে হোটেল-মোটেলসহ সব স্থাপনা ভেঙে ফেলার জন্য বিভিন্ন মেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিল সরকার।

গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাওয়া ও অবস্থান-সংক্রান্ত কিছু সিদ্ধান্ত হয়। এই সিদ্ধান্তের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক নেতিবাচক প্রচারণা শুরু হয়েছে। যেখানে বলা হচ্ছে, রাজনৈতিক কারণে সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাওয়া এবং অবস্থান বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু লেখায় সেন্টমার্টিনের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে ভূ-রাজনীতিকে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। কিছু লেখায় এমনও বলা হচ্ছে, সেন্টমার্টিনকে বিদেশি শক্তির হাতে তুলে দেওয়ার জন্য এসব করছে সরকার। যদিও সরকারি তরফে বলা হচ্ছে, পরিবেশগত কারণেই সেন্টমার্টিনকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে সেন্টমার্টিনে চার মাস পর্যটকদের যাতায়াত ও অবস্থান সীমিত করার। এর মধ্যে নভেম্বরে পর্যটকরা যেতে পারলেও রাত্রিযাপন করতে পারবেন না। আর ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে যেতে পারবেন, থাকতেও পারবেন। তবে এ সময় প্রতিদিন দুই হাজারের বেশি পর্যটক যেতে পারবেন না। আর ফেব্রুয়ারি মাসে কোনো পর্যটক যেতে পারবেন না।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের উপপ্রেস সচিব অপূর্ব জাহাঙ্গীর সাংবাদিকদের জানান, সেন্টমার্টিন দ্বীপ এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং এই দ্বীপের প্রবালগুলো রক্ষণাবেক্ষণ না করা হলে পর্যটকদের অতিরিক্ত চাপে এটি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। পরিবেশগত উদ্বেগের কারণে সরকার এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেন্টমার্টিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে সেন্টমার্টিন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে ওঠে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, সেন্টমার্টিনে যুক্তরাষ্ট্র ঘাঁটি করতে চায়। তার এই বক্তব্যের সমর্থনে ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেননসহ অনেকেই সুর মিলিয়ে ছিলেন। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও বলেছেন সেন্টমার্টিন যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করতে দিলে তাদের ক্ষমতায় থাকতে সমস্যা হতো না। যদিও যুক্তরাষ্ট্র সরকার বারবার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

গতকাল বুধবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তার কাছে দেশ রূপান্তরের সাংবাদিক জানতে চান সেন্টমার্টিনে রাত্রিকালীন অবস্থানের সিদ্ধান্তটি নতুন কি না? জবাবে ওই শাখা কর্মকর্তা জানান, এটা অনেক পুরনো সিদ্ধান্ত। এ নিয়ে বিগত সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নানা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছিল। শাখা কর্মকর্তার এই বক্তব্যের সমর্থনে কোনো প্রমাণ আছে কি না জানতে চাইলে তিনি মেলে ধরেন বিগত সরকারের নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত।

২০১৮ সালে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী ছিলেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। ওই বছরের ৯ সেপ্টেম্বর সেন্টমার্টিন নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়ে সভা করেছিলেন তিনি। আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ২৩ সেপ্টেম্বর এ-সংক্রান্ত কার্যবিবরণী স্বাক্ষর করেছিলেন। যেখানে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি করণীয় নির্ধারণ করা হয়েছিল। দীর্ঘমেয়াদি করণীয়র মধ্যে ৫ থেকে ১০ বছরে যেসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে, সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে যেসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে, সেগুলো মধ্য এবং এক থেকে তিন বছরের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য সিদ্ধান্তগুলো স্বল্প মেয়াদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্তের মধ্যে ছিল প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুটি জাহাজে ৫০০ জন পর্যটক সেন্টমার্টিনে যাওয়া-আসা করতে পারবেন। পর্যটকরা সেন্টমার্টিনে যাওয়ার আগেই অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। দ্বীপে কোনো ধরনের জেনারেটর ব্যবহার করা যাবে না। শুধু সৌরশক্তি ব্যবহার করতে হবে। সেন্টমার্টিনে ভ্রমণের ক্ষেত্রে ট্যুরিস্ট ফি আরোপ করা হবে। দ্বীপে জমি কেনাবেচা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকবে। মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে ছিল ‘সেন্টমার্টিন ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের জন্য সমন্বিত বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন শুরু করা। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে ছিল অবৈধ হোটেল-মোটেল স্থাপনা উচ্ছেদ করে সেন্টমার্টিনের পুরো ভূমি অধিগ্রহণ করে সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া। মালিকানা সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্বীপে বসবাসকারীদের অন্যত্র পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। এই তিন ধরনের সিদ্ধান্তের বাইরেও আরও কিছু সিদ্ধান্ত ছিল, যা তখনই বাস্তবায়ন করা যায়। অর্থাৎ ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে, এমন সিদ্ধান্তের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেন্টমার্টিন দ্বীপে শুধু দিনের বেলায় পর্যটক যাবেন। রাতে দ্বীপটিতে অবস্থান করতে পারবেন না। ২০১৯ সালের ১ মার্চ থেকে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার কথা ছিল। ছেঁড়াদিয়ায় পর্যটকসহ সবার যাতায়াত সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকবে। শুধু জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণার প্রয়োজনে সরকারের বিশেষ অনুমতি নিয়ে সংশ্লিষ্টরা প্রবেশ করতে পারবেন। দ্বীপের গলাচিপা অংশ থেকে দক্ষিণ পাশেও পর্যটকদের চলাচল বন্ধ থাকবে।

আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কেন নিতে গেলেন! যিনি জাতীয় পার্টির অংশ হয়ে সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন, তার এসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ কী? জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সরকারের এই সিদ্ধান্তটি একদিনে নেওয়া হয়নি। বছরের পর বছর গবেষণা করে সেসবের ওপর ভিত্তি করেই মন্ত্রী আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এসব বিষয় নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করার আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মুখ্য সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবের নেতৃত্বে একাধিক বৈঠক হয়।

২০১৯ সালেই যেখানে রাত্রিকালীন পর্যটকশূন্য করার কথা ছিল, সেই সিদ্ধান্ত কেন ২০২৪ সালেও বাস্তবায়ন করা হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, এরপরও একাধিক বৈঠক হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান ও আহমদ কায়কাউস ধারাবাহিক বৈঠক করেছেন। কবে থেকে রাত্রিকালীন অবস্থান নিষিদ্ধ হবে, তা চূড়ান্ত না করলেও যেকোনো সময় এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার প্রস্তুতি ছিল।

সেন্টমার্টিন দেশের সবচেয়ে দক্ষিণের জলসীমায় মূল ভূখ- টেকনাফ থেকে ৯.৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। স্থানীয়ভাবে দ্বীপটি নারিকেল জিঞ্জিরা নামে পরিচিত। জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে দ্বীপটির আয়তন প্রায় আট বর্গকিলোমিটার। সৈকতের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪ কিলোমিটার। যার দুই কিলোমিটারের মধ্যে সামুদ্রিক কাছিম ডিম পাড়ে। দ্বীপের দক্ষিণে কতগুলো ছোট দ্বীপ রয়েছে, যা ছেঁড়াদ্বীপ নামে পরিচিত। জোয়ারের সময় এই দ্বীপগুলো মূল ভূখ- থেকে আলাদা হয়ে যায়। মেঘনা ও নাফ নদীর সুস্বাদু পানি দ্বীপের সামুদ্রিক আবাসস্থলের লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। দেশের দক্ষিণের এই স্থানটি সর্বোচ্চসংখ্যক সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও প্রবালের আধার। সেখানে ৬৩ প্রজাতির প্রবাল পাওয়া যায়, যার মধ্যে কিছু বিপন্ন। এ ছাড়া রয়েছে ৪৩ প্রজাতির শৈবাল। উল্লেখযোগ্য বড় প্রাণীর মধ্যে রয়েছে গোলাপি ডলফিন, ব্রাইটস তিমি, হাঙর, কাছিম, টুনা, দৈত্যাকৃতির সিবাস। প্রায় সাত হাজার মানুষের বসবাস, যার অধিকাংশই মৎস্যজীবী। কক্সবাজারের অন্তত ১০০ মোটরচালিত নৌকা সেন্টমার্টিন দ্বীপে হাঙরের পাখনা সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত। প্রতিবছর নিকটবর্তী জলাসীমা থেকে ১ হাজার ৬৫০ টন মাছ ধরা হয়। অনিয়ন্ত্রিত জাহাজ ও ইঞ্জিনচালিত নৌকা, মাত্রাতিরিক্ত মাছ আহরণ, ক্রমাগত জলবায়ু পরিবর্তন অবৈধ মাছ ধরা জালের ব্যবহারের কারণে ডলফিন, কাছিমসহ বহু প্রাণী মারাত্মক হুমকির মুখে। সেখানে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত পর্যটক অবস্থান করেন। প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে হোটেল স্থাপন করা হচ্ছে, মাত্রাতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে, বর্জ্য নিক্ষেপ করা হচ্ছে সবকিছু মিলিয়ে নিয়ন্ত্রণহীন সেন্টমার্টিন আজ ধ্বংসের পথে।

ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন, হোটেল-মোটেল মালিক সমিতি স্থানীয় অধিবাসীরা সরকারের সব সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসছেন। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাঁচটি জাহাজে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২৫০ জন যাত্রীর টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনে যাওয়া-আসা করার অনুমতি রয়েছে। কিন্তু এসব জাহাজে পাঁচ থেকে ছয় হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত