রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে মাদক কারবারিদের দুপক্ষের মধ্যে ফের গোলাগুলি হয়েছে। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে শিশুসহ তিনজন আহত হয়েছে। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় এ ঘটনা ঘটে।
এদিকে সন্ত্রাসমুক্ত মোহাম্মদপুরের দাবিতে থানার সামনে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে ৭২ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছেন এলাকার বাসিন্দারা।
জেনেভা ক্যাম্পে গোলাগুলিতে আহতরা হলো আলাউদ্দিন আমিন (২৭), শফিক (৩২) ও সাজ্জান (৮)। তাদের উদ্ধার করে প্রথমে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে অবস্থার অবনতি হলে শফিক এবং সাজ্জানকে পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আহত অবস্থায় আলাউদ্দিন আমিন জানান, তিনি জেনেভা ক্যাম্পের এ ব্লকের বাসিন্দা। পেশায় সেলুনকর্মী। শিশুসন্তানকে নিয়ে চিপস কিনতে দোকানে গেলে পেছন দিক থেকে আসা একটি গুলি লাগে তার পায়ে। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। গোলাগুলির এই ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানান আলাউদ্দিন আমিন।
এলাকাবাসী জানায়, সন্ধ্যায় হঠাৎ করে জেনেভা ক্যাম্পের ভেতরে গোলাগুলি শুরু হয়। গুলির শব্দে পাশের তাজমহল রোড, বাবর রোড ও হুমায়ুন রোডের বাসিন্দারা ভয়ে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি শুরু করেন। সন্ধ্যার পর থেকে টানা গুলির শব্দে এসব এলাকার দোকানপাট ও যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। থেমে থেমে রাতেও গুলির শব্দ শোনা যায়।
জানা গেছে, জেনেভা ক্যাম্পের শীর্ষ মাদক কারবারি সোহেল ওরফে ভূঁইয়া সোহেল গ্রুপ ও পারমনু গ্রুপের মধ্যে গতকাল সন্ধ্যায় সংঘর্ষ বাঁধে। এ সময় দুপক্ষের লোকজন পাল্টাপাল্টি গুলি ছোড়ে।
ওই এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে বেশ কিছুদিন ধরে প্রায়ই প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে। তবে এসব রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শক্ত কোনো পদক্ষেপ না থাকায় দিন দিন পরিস্থিতির আরও অবনতি হচ্ছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গতকাল রাতে মোহাম্মদপুর থানার ওসি ইফতেখার হাসান বলেন, ‘জেনেভা ক্যাম্পে গোলাগুলির ঘটনায় তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্পে পুলিশ অবস্থান করছে। এ ঘটনায় আমরা আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছি।’
এর আগে গত ১৬ অক্টোবর জেনেভা ক্যাম্পে গোলাগুলির মধ্যে পড়ে রেস্তোরাঁকর্মী মো. শানেমাজ (৩৮) নিহত হন। তার কয়েক দিন আগে জেনেভা ক্যাম্পের পাশে প্রতিপক্ষের গুলিতে মো. সনু (৩০) নামে একজন নিহত হন।
পুলিশকে ৭২ ঘণ্টা সময় সন্ত্রাসে অতিষ্ঠ মোহাম্মদপুরবাসীর : সন্ত্রাসমুক্ত মোহাম্মদপুরের দাবিতে থানার সামনে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন এলাকাটির একদল বাসিন্দা। টানা চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি এবং হতাহতের ঘটনায় অতিষ্ঠ হয়ে গতকাল শনিবার বিকেলে মোহাম্মদপুর থানায় গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে ৭২ ঘণ্টা সময়ও বেঁধে দিয়েছেন তারা। এর মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে থানায় অবস্থানের ঘোষণাও দেওয়া হয়। গতকাল বিকেল ৫টার দিকে মোহাম্মদপুর এলাকার প্রায় ১০০ বাসিন্দা থানায় গিয়ে এই ঘোষণা দেন।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। যানবাহন ও জনবল সংকটে পুলিশের টহল কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয়নি। আর এই সুযোগে অপরাধী চক্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। বিশেষ করে জেনেভা ক্যাম্পকেন্দ্রিক অনেকে অপরাধ তৎপরতায় যুক্ত হয়েছে; আর মোহাম্মদপুরের কিছু এলাকায় গড়ে উঠেছে নতুন সন্ত্রাসী গ্রুপ। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চাকরিচ্যুত সদস্যদের কেউ কেউ ডাকাতি ও ছিনতাইয়ে যুক্ত হয়েছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) হিসাব অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম ২৫ দিনে মোহাম্মদপুর থানায় চারটি হত্যা, একটি ছিনতাই ও দুটি ডাকাতির মামলা হয়েছে। এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে এই থানায় ১৭ খ্নু ও একটি ছিনতাইয়ের মামলা হয়।
এলাকাবাসী বলছেন, মোহাম্মদপুরে প্রায় প্রতিদিনই ছিনতাই-ডাকাতির ঘটনা ঘটছে, যদিও যার বেশিরভাগ ঘটনার খবরই গণমাধ্যমে আসে না। আঘাতে আহত হয়ে হাসপাতালে গেলে কিংবা থানায় মামলা হলে তা কেবল গণমাধ্যমে আসে। অনেকেই হয়রানির ভয়ে থানা-পুলিশ করতে চান না। থানায় চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের যে পরিসংখ্যান নথিভুক্ত হয় তা প্রকৃত ঘটনার চেয়ে অনেক কম।
গতকাল বিকেলে মোহাম্মদপুর থানার সামনে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে ভুক্তভোগীরা বলেন, সন্ত্রাসীরা অস্ত্র দেখিয়ে চাঁদাবাজি করছে। বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক গ্যাংয়ের সদস্যরা গণডাকাতিও করছে।
এলাকাবাসীর পক্ষে জাতীয় নাগরিক কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য মুতাসিম বিল্লাহ ডাকাতি ও ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য পুলিশকে ৭২ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেন। তিনি বলেন, ‘এই সময়ের মধ্যে মোহাম্মদপুর এলাকায় পুলিশের টহল বাড়াতে হবে ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি ও সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা না গেলে ছাত্র-জনতা মোহাম্মদপুর থানায় অবস্থান করবে।’
প্রতিবাদ কর্মসূচি শেষে এলাকাবাসী মোহাম্মদপুর থানার ওসি আলী ইফতেখার হাসানের কক্ষে বৈঠক করেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন পুলিশের তেজগাঁও অঞ্চলের অতিরিক্ত উপকমিশনার জিয়াউল হক। এলাকাবাসীর বক্তব্য শুনে জিয়াউল হক বলেন, ৫ আগস্টের পর পুলিশের জনবল ও রসদসামগ্রীর ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তা ছাড়া মোহাম্মদপুরে যেসব পুলিশ সদস্য আছেন, তাদের অধিকাংশই নতুন। এমন পরিস্থিতিতে তারা স্থানীয় জনতার সহায়তা চান। এজন্য আজ রবিবার এলাকাবাসীর সঙ্গে বসে পরবর্তী করণীয় ঠিক করবেন।
সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মোহাম্মদপুর এলাকার বেশকিছু ভিডিও ক্লিপ তুমুল আলোচনা তৈরি করেছে, সেইসঙ্গে ছড়িয়েছে আতঙ্ক। এর মধ্যে সর্বশেষ গত শুক্রবার রাতে বসিলায় একটি মিনি সুপারশপে ঢুকে অস্ত্রধারীদের ডাকাতির ঘটনা রয়েছে।
