কল্পনা করতে পারেন, যদি আপনাকে বলা হয় যে, আপনি ও আপনার পরিবারকে হত্যা করা হবে, যদি আপনারা এখনই বাড়ি না ছাড়েন! কয়েক মিনিটের মধ্যে পালাতে হবে, কিছু না নিয়েই, না হলে মৃত্যুবরণ করতে হবে!
আমি পারি। পাঁচবার।
হ্যাঁ, পাঁচবার। পাঁচবার আমার পরিবারকে ‘নিরাপদ’ ঘোষিত আশ্রয়কেন্দ্র থেকে পালাতে হয়েছে। কখনো ‘সতর্ক করা’ হয়, কখনো হয় না। কখনো ইসরায়েলি বাহিনী আদেশ দেয় যে, আমাদের ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সরে যেতে হবে। আবার কখনো, গুলি যখন শেল্টার সেন্টারের দেয়ালে আঘাত করে তখন নিজেরাই বুঝে নিই যে, আমাদের পালাতে হবে। সেই সময় যে, অবস্থায় এবং আমাদের হাতে যা কিছু আছে, শুধু তা নিয়েই দৌড়াতে হয়।
প্রত্যেকবার মনে হয়, এ-ই শেষ। এই যাত্রায় আমাদের ঘরবাড়ি হয় সব ধ্বংস হয়ে যাবে, না-হয় লুটপাট করে নিয়ে যাবে। আমি এখন যে ঘরে আশ্রয় নিয়েছি, তা আমার এক বন্ধুর ঘর; বন্ধুর পরিবার এখানে থাকে না। তারা উত্তর গাজা ছেড়ে দক্ষিণে পালিয়েছে। এখানে চারটি পরিবারের লোকজন একসঙ্গে থাকছি আমরা। আমাদের আশপাশের ভবনগুলো মাটিতে মিশে গেছে, পড়ে আছে শুধু ধ্বংসাবশেষ। প্রতি রাতে এই ভয় নিয়ে ঘুমাতে যাই যে, পরবর্তী টার্গেট হয়তো আমরাই।
পুরো এলাকা পাড়ার পর পাড়া, মহল্লার পর মহল্লা যেন মানচিত্র থেকে মুছে গেছে। যেখানে বেড়ে উঠেছি, সেই স্থান এখন আর চিনতে পারি না। কেবল ধ্বংসাবশেষ চেয়ে চেয়ে দেখি। সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, আমাদের সবকিছু, আক্ষরিক অর্থেই সব কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এই ক্রমাগত গোলাগুলির মধ্য দিয়ে এক দমবন্ধকর ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। মনে হয় কোনো জায়গাই আর নিরাপদ নয়। আমি আমার চাচা, পরিবারের অন্যান্য সদস্য, সহকর্মী ও বন্ধুদের হারিয়েছি। এই অনুভূতি এতটা ভয়ংকর যে, তাদের জন্য কান্নার ফুরসতও পাচ্ছি না। এমন কোনো ঘর নেই, যা কাউকে হারায়নি; এমন কোনো পরিবার নেই, যে তার সদস্যকে মরতে দেখেনি। অনেক বংশের শেষ সন্তানও চলে গেছেন। পুরো জাতির জন্য এ এক নিঃসীম বেদনা।
গত এক বছর ধরে উত্তর গাজা হলো এই অঞ্চলেও সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা। কিন্তু এবার, গত দুই সপ্তাহ ধরে আমরা আছি একেবারে শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায়। এমন বোমাবর্ষণ চলছে, যা আমাদের অভিজ্ঞতার বাইরের। সেপ্টেম্বর মাস জুড়ে যত বোমা পড়েছিল, তার কয়েকগুণ বেশি মাত্র গত দুদিনে পড়েছে। যে সামান্য ত্রাণ আসছিল এতদিন, তাও বন্ধ হয়ে গেছে। থেকে যাওয়া অবশিষ্ট ৪ লাখ মানুষকে সরে যেতে বলা হয়েছে। আমার অনেক প্রতিবেশী এখনো সরেনি। কোথায় যাবে? কোথায় নিরাপদ? এই পরিস্থিতিতে এখানে থেকে কষ্ট সহ্য করা আর অন্যত্র গিয়ে কষ্ট সহ্য করার মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই, তাহলে তারা কেন সরবে?
শৈশবে যেসব স্কুলে পড়েছি, সেগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। যে কয়েকটি স্কুল বাকি আছে, সেগুলো আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, হাজারো মানুষ তাতে আশ্রয় নিচ্ছে। কয়েক মাস আগে আমার পরিবারও কিছুদিন আশ্রয়কেন্দ্রে ছিল, কিন্তু পরিবেশ এতটাই করুণ ছিল যে, চলে আসতে হয়েছে। হাজারো মানুষ মিলে একটিমাত্র টয়লেট ব্যবহার করছে সেখানে। করিডোরে চলারও জায়গা নেই। অনেকেই মেঝেতে ঘুমাচ্ছে। মানুষজন পচা খাবারের জন্যও লড়াই করছে।
গত ছয় মাস ধরে শুধু ক্যানের খাবারের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছি। সামান্য যে ত্রাণ আসে, তা প্রয়োজনের তুলনায় কিছুই না। আমাদের স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে, শরীর ভেঙে যাচ্ছে। প্রতিদিন পানির জন্য সংগ্রাম করতে হয়, অথচ বিদ্যুৎ ছাড়া পানি পাওয়া খুবই কঠিন। প্রতিটি দিন যেন বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ করতে হয়। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে দৌড়াতে দৌড়াতে আমরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষয়ে ক্ষয়ে নিঃশেষ হচ্ছি।
স্বাস্থ্য সম্মত পরিবেশ প্রায় নেই বললেই চলে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। সবাই অসুস্থ, অনেকেই আহত এবং অনেকের শারীরিক অবস্থাও শোচনীয়। সামান্য যে ত্রাণ আসছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অতি ক্ষুদ্র, বিন্দুই বলা চলে। অনেক এলাকায় ত্রাণের ছিঁটেফোটাও পৌঁছেনি, ত্রাণ তাদের অপ্রাপ্য রয়ে গেছে। তা-ও যা আসছে, তা পুরো জনগোষ্ঠীর জন্য মোটেও যথেষ্ট নয়।
আমাদের কষ্টের শেষ ঘটাতে পারে কেবল এই অবরোধের অবসানে।
মনে হচ্ছে, বিশ্ব শুধু দেখছে কিন্তু যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করছে না। সামান্য কিছু আন্তর্জাতিক সমর্থন থাকলেও তা এই বিপর্যয়ের মোকাবিলায় অপ্রতুল। এই রক্তক্ষয়ের মাঝে তা যেন এক ফোঁটা পানির সমান। আমাদের রাস্তাগুলোতে এত লাশ পড়ে আছে যে, তাতে হাজারো গোরস্তান ভরে যাবে। আমাদের বাঁচাতে এবং ত্রাণ পৌঁছানোর জন্য আরও দ্রুত, আরও শক্তিশালী পদক্ষেপ দরকার।
আমার সবচেয়ে বড় ভয়, এই ধ্বংসযজ্ঞ থামবে না এবং আমরা আরও প্রাণ ও বাড়িঘর হারাব। বিশ্ব যদি এটিকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করে, তবে তা হবে আমাদের জন্য এক চরম বাস্তবতা। এটা কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা মানবীয় নয়। উত্তর গাজা এখন এমন, যা এই পৃথিবীর কল্পনার বাইরের। এমন অবস্থা যে, নরক বললে আপনি যা যা কল্পনা করেন, তার চেয়েও ভয়ংকর।
লেখক : অবরুদ্ধ উত্তর গাজাকেন্দ্রিক অ্যাকশন ফর হিউম্যানিটি কর্মী আলজাজিরা অনলাইন থেকে ভাষান্তর মনযূরুল হক
