আটকে পড়া পাকিস্তানি নামে পরিচিত হলেও তাদের আসল পরিচয় মূলত বিহারি। দেশভাগ, কর্মের খোঁজে এবং নতুন দেশে কাজের জন্য নিয়ে আসা একপাল দুর্ভাগা মানুষ। ব্রিটিশরা একসময় সস্তা শ্রমের জন্য এই বিহারিদের পূর্ববঙ্গে এনেছিল। এরপর ১৯৪৬ সালে দাঙ্গা এবং ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর বহু বিহারি এ দেশে আসেন। এসব অভিবাসীর বিরাট অংশ ছিল উর্দুভাষী। তখন রাজনৈতিক কারণে এদের ‘উদ্বাস্তু’ না বলে ‘মুহাজির’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবস্থান পাল্টে যায়। নিজেদের ভাষা উর্দু ও পাকিস্তানের প্রতি সমর্থনের কারণে আগে থেকেই ক্যাম্পে মানবেতর জীবন কাটানোরা ন্যূনতম মানবিক অধিকারটুকুও হারিয়ে ফেলেন। পাকিস্তান সরকার বড় অংশের বিহারিকে সে দেশে নিতে অস্বীকার করে। তাদের জীবন সীমিত হয়ে পড়ে বেশ কিছু ক্যাম্পে। এদের একটি ঢাকার মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প।
আন্তর্জাতিক রেডক্রস, যারা এসব মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করছিল, সেটির অফিস জেনেভায় হওয়ায় ১৯৭২ সালে এই ক্যাম্পের নামকরণ করা হয় জেনেভা ক্যাম্প। লিয়াকত হাউজিং সোসাইটির সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে এ স্থানটিতে অস্থায়ী ভিত্তিতে ক্যাম্প তৈরি করা হয়, যাতে বর্তমানে মাত্র ১২ বিঘা জায়গায় ৫৫ হাজারের বেশি মানুষ বাস করে। হাইকোর্টের ২০০৩ সালে প্রকাশিত এক রায়ে ১৯৭১ সালের পরে জন্ম বাংলাদেশের বিহারিরা বাংলাদেশি হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও তারাসহ প্রবীণ ক্যাম্পবাসীরা বেশিরভাগ নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। শিক্ষার হার কম। কর্মসংস্থান নেই বললেই চলে। ফলে জেনেভা ক্যাম্প পরিণত হয়েছে অপরাধের অভয়ারণ্যে। তরুণদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে অবাধে চলে মাদক ব্যবসা। প্রতিদিন এখানে কোটি কোটি টাকার মাদক বেচাকেনা হয়। সেই ব্যবসার দখল নিতে ও আধিপত্য বিস্তারে নিয়মিত খুনোখুনি হয়। সম্প্রতি জেনেভা ক্যাম্পে খুনোখুনি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ভীতিকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ক্যাম্পের আগুনের ধোঁয়া আশপাশের বহু এলাকার মানুষকে বিচলিত করে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ক্যাম্পের পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কম করে হলেও দশবার বড় ধরনের প্রাণঘাতী সংঘর্ষ হয়েছে। এসব সংঘর্ষে ব্যবহার করা হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র ও বোমা। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ক্যাম্পের জি ব্লকের সাত নম্বর সেক্টরে শীর্ষ মাদক কারবারি বুনিয়া সোহেল ও চুয়া সেলিম গ্রুপের মধ্যে শুরু হয় তুমুল সংঘর্ষ। এতে ব্যবহৃত হয় আগ্নেয়াস্ত্র ও হাতবোমা। বোমার আঘাতে নিহত হন রাজ ওরফে ‘একগাল’। এর আগে বৃহস্পতিবার সিলেটের কোতোয়ালি থানা এলাকা থেকে যৌথ অভিযানে বুনিয়া সোহেলকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-২ ও র্যাব-৯। বুনিয়া সোহেলের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় ৩টি হত্যা মামলাসহ, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও মাদকের ১৮টি মামলা রয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতের সংঘর্ষের বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার ওসি আলী ইফতেখার হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বুনিয়া সোহেল গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার প্রতিপক্ষ চুয়া সেলিম পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করলে বুনিয়া সোহেলের লোকজন তাতে বাধা দেয়। এতেই মধ্যরাতে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের সময় দুপক্ষই গুলি ও বোমা ছোড়ে।’
শুধু রাজ নয়, ৫ আগস্টের পর থেকে জেনেভা ক্যাম্পে মাদক কারবারিদের সংঘর্ষে ছয়জনের প্রাণ গেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আতঙ্কে আছে ক্যাম্পের সাধারণ বাসিন্দারা। সোহেল ও সেলিমের গ্রুপ দুটিই সবচেয়ে প্রভাবশালী হলেও অন্তত আরও দশটি গ্রুপ মাদক কারবারে সক্রিয়। স্থানীয়রা জানান, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় বুনিয়া সোহেল আওয়ামী লীগের নেতাদের হয়ে আন্দোলন দমাতে সক্রিয় ছিল। পুলিশের সঙ্গে পুলিশের অস্ত্র দিয়েই আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায় শীর্ষ এই মাদক কারবারি। ৫ আগস্টের আগেই বুনিয়া সোহেল পুলিশের বেশ কিছু অস্ত্র এনে রেখেছিল ক্যাম্পে। পরে সরকার পতন হলে সেগুলো আর জমা দেয়নি। অন্যদিকে ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ক্যাম্পের লোকজন আদাবর, মোহাম্মদপুর ও শেরেবাংলা নগর থানায় হামলা, লুটপাট করে। এখন সেগুলো ব্যবহার করছে তারা। সব মিলিয়ে জেনেভা ক্যাম্পের অবস্থা আতঙ্কজনক। অস্ত্র ও মাদক একে করে তুলেছে মৃত্যু উপত্যকা। এই সমস্যার সমাধান গোড়া থেকে করা না হলে কঠিন। হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, ক্যাম্পে বসবাসরত নাগরিকদের পূর্ণ অধিকার এবং বাকিদের মানবাধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে ক্যাম্পের অসহনীয় জীবন থেকে মুক্তি দিতে হবে। অপরাধের অভয়ারণ্য থেকে ক্যাম্পকে মুক্ত করতে হবে।
