রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের ভারসাম্যের সুপারিশ করবে সংবিধান সংস্কার কমিশন

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৪, ০৯:০১ পিএম

সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর অভাবনীয় এককেন্দ্রীক ক্ষমতা হ্রাস, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এবং ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদী শাসনের উত্থান রোধ করার মতো সুপারিশের ইঙ্গিত দিয়েছে সংবিধান সংস্কার কমিশন।

আজ রবিবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংবিধান সংস্কার কমিশনের লক্ষ্য ও রূপরেখা তুলে ধরেন কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজ।

এ সময় কমিশনের সদস্য ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম, সদস্য অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিক, অধ্যাপক মোহাম্মদ ইকরামুল হক, ড. শরীফ ভূঁইয়া, ব্যারিস্টার এম মঈন আলম ফিরোজী, ফিরোজ আহমেদ ও মো. মুসতাইন বিল্লাহসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

লিখিত বক্তব্যে অধ্যাপক আলী রীয়াজ সংস্কারের পরিধি নিয়ে বলেন, ‘সংস্কার’র অন্তর্ভুক্ত হবে বর্তমান সংবিধান পর্যালোচনাসহ জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনের লক্ষ্যে সংবিধানের সামগ্রিক সংশোধন, সংযোজন, বিয়োজন, পরিমার্জন, পুনর্বিন্যাস এবং পুনর্লিখন। সাংবিধানিক সংস্কারের উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রতিশ্রুত উদ্দেশ্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার এবং ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আলোকে বৈষম্যহীন জনতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো হবে সুপারিশে। পাশাপাশি রাজনীতি এবং রাষ্ট্রপরিচালনায় সর্বস্তরে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণের ব্যবস্থা, ভবিষ্যতে যে কোনো ধরনের ফ্যাসিবাদী শাসনের উত্থান রোধ, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের পৃথকীকরণ ও ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, রাষ্ট্র ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকেন্দ্রীকররণ ও পর্যাপ্ত ক্ষমতায়নের সুপারিশ থাকবে কমিশনের। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক এবং আইন দ্বারা সৃষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যতর স্বাধীনতা ও স্বায়ত্বশাসন নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ থাকবে বলে জানায় কমিশন।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, কমিশন সংস্কারের সুপারিশ তৈরিতে বিভিন্ন অংশীজনদের মতামত ও প্রস্তাব গ্রহণ করবে। পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের মতামত ও প্রস্তার ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে। সংস্কারের অংশ হিসেবে কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের লিখিত মতামত এবং সুনির্দ্দিষ্ট প্রস্তাব পাঠানোর অনুরোধ করবে। সুপারিশ পাওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসবে কমিশন। এ ছাড়া সংবিধান বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, সিভিল সোসাইটির সংগঠনগুলোর প্রতিনিধি, সিভিল সোসাইটির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, পেশাজীবী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধি, তরুণ চিন্তাবিদ, সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করবে। এ ছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনায় বসবে কমিশন। তবে, যেসব ব্যক্তি, সংগঠন, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান, বা দল জুলাই-আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যূত্থানের সময় সক্রিয়ভাবে হত্যাকাণ্ডে যুক্ত ছিল, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হত্যাকাণ্ড ও নীপিড়নকে সমর্থন করেছে, ফ্যাসিবাদী কার্যক্রমকে বৈধতা প্রদানে সহযোগিতা করেছে কমিশন তাদের সংস্কার প্রস্তাবের সুপারিশ তৈরিতে যুক্ত না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আলী রীয়াজ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত বিরাজমান যে সংবিধান সেটি পর্যালোচনা করছি। আমরা যা বিবেচনায় নিচ্ছি সেটা হলো, গত ৫২ বছরে রাজনৈতিক, আইনি ও সাংবিধানিকভাবে যে সব আলোচনা আছে সেগুলো আমরা পর্যালোচনা করে দেখছি। পাশাপাশি অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করব এবং আমরা চিহ্নিত করতে পারব যে, কোন কোন জায়গায় সুনির্দ্দিষ্টভাবে পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন, বিয়োজন পুনর্লিখনের প্রয়োজন আছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা পূর্ব ধারণা থেকে কিছুই শুরু করছি না। ফলে আমরা অপেক্ষা করছি। কমিশন দৃঢ়ভাবে মনে করে যে, সংবিধানের সংস্কার প্রক্রিয়ায় সবচে বড় স্টেক হোল্ডার বাংলাদেশের জনগণ। তারপরে রাজনৈতিক দল, সিভিল সোসাইটি ও সংবিধানের বিশেষজ্ঞ। আমাদের দায়িত্ব হলো সুপারিশ করা। তার ভিত্তি হবে আমরা অংশীজনদের সঙ্গে কথা বলব। তাদের বক্তব্য পর্যালোচনা করব। আমরা আসলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কেউ নই। এটি করবে সরকার। কমিশন এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। অংশীজনদের মাধ্যমে নেবে।’

জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যূত্থানের বিষয়টি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে কি না- এমন  প্রশ্নে আলী রিয়াজ বলেন, ‘জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে এটি সংবিধানে নিঃসন্দেহে উল্লেখ থাকতেই হবে। হাজার হাজার মানুষের আত্মদানের ফসল, ফ্যাসিবাদী ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়াই, এটা তো লিপিবদ্ধ করতে হবে। সংবিধানে (মূল সংবিধান) থাকুক বা না থাকুক, ২০২৪ এর গণঅভ্যূত্থান, এর পেছনে প্রায় ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন আছে। এটা তো নিঃসন্দেহে ডকুমেন্টারি হবে। এই ইতিহাসকে পাশ কাটিয়ে আমরা তো জাতি হিসেবে অগ্রসর হতে পারব না। এটা জরুরি এবং অনিবার্য।’

প্রচলিত সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে ক্ষমতার অভাবনীয় এককেন্দ্রীকরণ ঘটেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে ১৯৯১ সালে যখন রাষ্ট্রপতি শাসিত থেকে প্রধানমন্ত্রীর হাতে যায় তখন থেকে। ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার সময় রাষ্ট্রপতির হাতে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, সেই ক্ষমতা জিয়াউর রহমান, এরশাদ সকলেই ভোগ করেছেন। সেই ক্ষমতাকে কার্যত বাক্সবন্দি করে প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। যার পরিণতি ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ ঘটেছে। ক্ষমতার এককেন্দ্রীকতা ছাড়া ফ্যাসিবাদ তো আর এমনি তৈরি হয় না। আমরা ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ দেখতে চাই না।’

কমিশনের সুপারিশের পর বর্তমান সরকার সংবিধান বাস্তবায়ন করবে কি না, এমন প্রশ্নে মাহফুজ আলম বলেন, ‘ছাত্র প্রতিনিধি, শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি কিংবা কমিশনের একজন হিসেবে বলব, অবশ্যই অবশ্যই এই সরকার এটি করে যাবে। কেন করবে না? এই সরকার ছাড়া কেউ এটি করবে না। এটা যেদিন আমাদের একদফা ঘোষণা করা হয়, ওই দিনের দাবি ছিল সংবিধানের খসরাটা। ওখানে বলা হয়েছিল যে, নতুন একটা রাজনৈতিক বন্দোবস্তুতে পুরাতন পলিটিক্যাল সেটেলম্যান্ট আমরা খারিজ করছি। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের নামই নতুন সংবিধান। সেটা একদফার ঘোষণাতেই স্পষ্ট হয়ে গেছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত