বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গুমের ঘটনা তদন্তে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত কমিশনে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৬০০টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৩৮৩টি অভিযোগ খতিয়ে দেখেছে কমিশন, যার মধ্যে ১৭২টি অভিযোগই র্যাবের বিরুদ্ধে। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একটি সংস্থার কথিত ‘আয়নাঘর’ নামের বন্দিশালা থেকে কয়েকজনের মুক্ত হওয়ার খবর আসে। এটিসহ ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অন্তত আটটি গোপন বন্দিশালার সন্ধান পেয়েছে কমিশন, যেখানে বছরের পর বছর গুম হওয়া ব্যক্তিদের রেখে নির্যাতন করা হতো। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশান অ্যাভিনিউতে গুমসংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। তবে বন্দিশালাগুলো কাদের দ্বারা পরিচালিত হতো, তদন্তের স্বার্থে সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের চেয়ারম্যান হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, র্যাবের বিরুদ্ধে ১৭২টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া মহানগর গোয়েন্দা শাখা ডিবির বিরুদ্ধে ৫৫টি, সিটিটিসির (কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট) বিরুদ্ধে ৩৭টি, ডিজিএফআইর (ডিরেক্টর জেনারেল ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স) বিরুদ্ধে ২৬টি, পুলিশের বিরুদ্ধে ২৫টি এবং অন্যান্যভাবে ৬৮টি গুমের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট ১৪০ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ২০০-এর বেশি গুম হওয়া ব্যক্তিকে এখনো শনাক্ত করা যায়নি। গুমসংক্রান্ত কমিশনে অভিযোগ জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল গত ৩১ অক্টোবর। এ সময়ের মধ্যে এসব অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গুমের ঘটনার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হবে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ইতিমধ্যে অভিযুক্তদের উদ্দেশ্যে সমন দেওয়া হয়েছে। প্রথম দিন সাতজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। পর্যায়ক্রমে অভিযুক্ত অন্যদেরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হবে।
বিচারপতি মইনুল ইসলাম বলেন, ‘পুলিশ আসামিদের কীভাবে গ্রেপ্তার করবে, ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্টের গাইডলাইন আছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেটা অনুসরণ করা হয়নি। আটকের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করার বিধান থাকলেও মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর আইনের তোয়াক্কা না করে আটকে রাখা হতো। ধারণা করা যায়, রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেই নির্দেশনাগুলোর লঙ্ঘন করে এসেছে।’
ভুক্তভোগীরা কেন গুমের শিকার হয়েছিলেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘কিছু লোক আছে যাদের রাজনৈতিক পরিচয় ছিল না। কিছু আছে যারা বিভিন্ন মাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করেছে। আবার সেনাবাহিনীর যাদের গুম করা হয়েছে, তাদের কেন করা হয়েছে তা বোঝা গেল না। যেমন কর্নেল হাসিনকে দুবার গুম করা হয়। একবার চাকরিরত অবস্থায়, আরেকবার অবসরের পর।’
কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, ‘ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণে গুম করা হয়েছে এমন অভিযোগ এখনো পাইনি। এই মুহূর্তে কতজন গুম আছে তা বলা মুশকিল। এমনও ঘটনা আছে কে নিয়ে গেল, সেটা নির্দিষ্ট করা যায়নি।’
গুম হওয়া ব্যক্তিদের যেসব গোপন বন্দিশালায় রেখে নির্যাতন করা হতো, সেগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে জানিয়ে মইনুল ইসলাম বলেন, ‘আলামত নষ্ট করা হয়েছে। তবে যারা আলামত নষ্ট করছেন, তাদের গুমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সহযোগী হিসেবে বিবেচিত করা হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে। এ ছাড়া আটক ও গ্রেপ্তার নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নির্দেশনাগুলো যেন যথাযথভাবে প্রতিপালিত হয়, সে বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শককে বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার আহ্বান জানানো হবে।’
কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা র্যাব পরিচালিত একটি সেল পেয়েছি, যেটি ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৫ বাই ৪ ফুট। সেখানে আলো ঢোকার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। একটি ড্রেন ছাড়া সেখানে কোনো স্যানিটেশন ব্যবস্থাও ছিল না। এমন পরিবেশে বন্দিদের বছরের পর বছর রাখা হতো।’ তিনি আরও বলেন, ‘দুটি সেলের ভেতরে দেয়ালে দাগ দেখা গেছে, যেগুলো দিয়ে বন্দিরা কতদিন ধরে বন্দি আছেন, তা চিহ্নিত করে রাখতেন।’
আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় ১৬ বছরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গুমের ঘটনা তদন্তে হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গত ২৭ আগস্ট এ কমিশন গঠন করে সরকার। কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেন হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাবিলা ইদ্রিস ও মানবাধিকারকর্মী সাজ্জাদ হোসেন। কমিশনের কাছে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে গুমের ঘটনার অভিযোগ জানানোর সুযোগ ছিল।
