যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠা শিক্ষকের ঝুলন্ত লাশ

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২৪, ০৭:২২ এএম

টাঙ্গাইলের সখীপুরে শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার হয়েছে। তার নাম নূরুল ইসলাম (৫৫)। পরিবারের সদস্যরা ও এলাকাবাসী বলছে, যৌন হয়রানির অপবাদ সইতে না পেরে গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেছেন এই শিক্ষক। গতকাল মঙ্গলবার সকালে উপজেলার বড়চওনা ইউনিয়নের দাড়িপাকা গ্রামে নিজ বাড়ির রান্নাঘরে তার ঝুলন্ত লাশ দেখে বাড়ির লোকজন পুলিশে খবর দেয়। পরে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে টাঙ্গাইল মর্গে পাঠায়।

স্থানীয় ইউপি সদস্য আলমগীর হোসেন জানান, দাড়িপাকা গ্রামের মৃত আমজাদ হোসেনের ছেলে ও দাড়িপাকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ছিলেন নূরুল ইসলাম। তিনি ওই বিদ্যালয়ে ২৬ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন। এর আগে গত ২৭ আগস্ট স্কুল আঙিনায় ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে নারী শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানির অভিযোগে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এ ঘটনায় দুটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমে তদন্ত কার্যক্রম চলমান ছিল।

ওই শিক্ষকের মেয়ে নিপা আক্তার (২৫) জানান, বাবার বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ দল বারবার ষড়যন্ত্র করে ব্যর্থ হয়েছে। সরকার পতনের সুযোগ নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা যৌন হয়রানির মতো স্পর্শকাতর মিথ্যা অপবাদ দেয়। বাবার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এই এলাকায় কোনো মানুষকে বলতে শুনিনি। ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দলের ব্যানারে থাকা স্থানীয় দাড়িপাকা উচ্চ বিদ্যালয়ে চাকরিচ্যুত প্রধান শিক্ষক কামাল হোসেন, স্থানীয় হামিদুল, খায়রুলসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেন। বাবার কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা চাওয়া হয়েছিল জানিয়ে তিনি আরও বলেন, বাবা সব ঘটনা আমার কাছে বলে গেছেন। স্থানীয় দুটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দিয়ে বাবার বিরুদ্ধে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করিয়েছে জানিয়ে দোষীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

স্ত্রী নাজমা বেগম বলেন, তার স্বামীকে স্থানীয় একটি প্রতিপক্ষ দল মিথ্যা অপবাদ দিয়ে ফাঁসানোর জন্য বহুবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। ষড়যন্ত্রকারীরা বিভিন্ন সময়ে হুমকি-ধমকি দিত। স্বামী ফাঁসিতে মারা গেলেও তিনি আইনিভাবে স্বামীর আত্মহত্যার পেছনে জড়িত দোষীদের ফাঁসি দাবি করেন।

এলাকাবাসী জানান, নূরুল ইসলাম একজন ভালো মানের শিক্ষক ছিলেন। তিনি সহজ-সরল মানুষ। সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। শিক্ষক হিসেবে তার সুনাম রয়েছে। এসব অভিযোগর সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি জানিয়ে আত্মহননের প্ররোচনার পেছনে যারা রয়েছেÑ সেই জড়িতদের শাস্তি দাবি করেন তারা। ওই বিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও তাদের শাস্তি দাবি করেছেন। যৌন হয়রানির অপবাদ সইতে না পেরে মনের ক্ষোভে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন বলে পরিবার ও এলাকাবাসী জানিয়েছেন।

জানতে চাইলে কামাল মিয়া বলেন, আমি নূরুল ইসলামের কাছে টাকা চেয়েছি, এটা মিথ্যা অভিযোগ। আমি কেন এসব করতে যাব? কেউ যদি আমার নামে কিছু বলে থাকে, তবে তা ষড়যন্ত্র। মূলত তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে দ্বিতীয়বার তদন্তের তারিখ ছিল, তাই তিনি মানসিক চাপে হয়তো আত্মহত্যা করেছে।’

প্রধান শিক্ষক বুলবুল আহমেদ বলেন, ‘স্কুলের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি (নূরুল ইসলাম) শিক্ষকতা শুরু করেন। তিনি একজন ভালো শিক্ষক ছিলেন। এ ঘটনার সঠিক তদন্তের দাবি জানাই। আজ (গতকাল) তদন্ত টিম বিদ্যালয়ে আসার কথা ছিল; এর আগেই শিক্ষক আত্মহননের পথ বেছে নিলেন।’

উপজেলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির নেতা ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘শিক্ষক নূরুল ইসলামের আত্মহননের প্ররোচনার নেপথ্যে যারা পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে জড়িত রয়েছে তাদের খুঁজে বের করতে হবে। শিক্ষক সমাজের পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ মোরাদ হোসেন খান বলেন, ‘শিক্ষকের (নূরুল ইসলাম) বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ আসে। অভিযোগপত্রটি জেলা শিক্ষা অফিসে দেওয়া হয়। জেলা শিক্ষা অফিস থেকে সদরের শিক্ষা অফিসারকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়। এ তদন্ত কমিটি সম্প্রতি তদন্তের রিপোর্ট দেয়। ওই শিক্ষক এ রিপোর্টে আপত্তি জানালে জেলার দেলদুয়ার উপজেলার শিক্ষা অফিসারকে প্রধান করে এক সদস্যের আরও একটি পুনঃতদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এই তদন্ত কমিটি আজ (গতকাল) ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তদন্তের কাজে যাওয়ার কথা ছিল। ওই শিক্ষক অনুমোদিত মেডিকেল ছুটিতে ছিলেন। সকালে খবর পেলাম তিনি মারা গেছেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।’

 সখীপুর থানার ওসি মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘জেনেছি তার বিরুদ্ধে (নূরুল ইসলাম) একটি অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছিল। থানায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। লাশ মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত