অবশেষে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিসকে হারিয়ে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। মার্কিন নির্বাচনে ক্ষমতার পালাবদলের প্রভাব সারা বিশ্বেই পড়ে, এবারও পড়বে। এটা ইতিবাচক, নেতিবাচক বিভিন্নরকমভাবেই পড়তে পারে। আমরাও যেহেতু বিশ্ব সম্প্রদায়ভুক্ত, তাই আমাদের ওপরও এর খানিকটা হলেও প্রভাব আসবে। এর মধ্যে কয়েকটা বিষয় থাকে স্পষ্ট। যেমন ইমিগ্রেশন বা অভিবাসন নিয়ে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় তারা অভিবাসন নিয়ে যেসব কথাবার্তা বলেছেন, সেগুলো যদি সত্যিই নীতিগতভাবে বাস্তবায়ন করতে চান বা বাস্তবায়ন করতে যান সেই ক্ষেত্রে শুধু বাংলাদেশ কেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ওপর প্রভাব পড়বে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১৬০ দেশের মানুষ বসবাস করেন। সেখানে এমন মানুষের সংখ্যা অনেক, যারা আইনগতভাবে নিয়মিত হতে পারেননি বা বৈধ নয়। এই সংখ্যা ১২ থেকে ১৩ লাখের মতো বলে মনে করা হয়। এই নন-ডকুমেন্টেড যারা আছেন, তাদের মধ্যে তো বাংলাদেশিও আছেন। ফলে এই নন-ডকুমেন্টেড যারা আছেন, তাদের যদি বের করে দিতে চান, তাহলে বাংলাদেশি নন-ডকুমেন্টেড যারা, তারাও তো ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। অভিবাসন নিয়ে আরেকটা দিক হচ্ছে, তারা বলছেন যে রেমিট্যান্সের ওপর ট্যাক্স বসানো হবে। বাংলাদেশ তো আমেরিকা থেকে ভালো একটা রেমিট্যান্স পায়। এখানে ট্যাক্স বসালে তো রেমিট্যান্সের ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
আমাদের তরুণ ছাত্রছাত্রীদের প্রেফারেন্স ডেস্টিনেশন হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। উচ্চশিক্ষার জন্য তাদের প্রথম পছন্দ হচ্ছে আমেরিকা। এখন সেখানকার সামাজিক পরিসরে যদি বর্ণবাদী উপকরণগুলো বৃদ্ধি পায়, সে ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীরা সেখানে যেতে উৎসাহ হারাবেন। এর বাইরেও পিপল টু পিপল কানেকটিভিটি যেটা বলা হয়, বর্ণবাদের আবহ তৈরি হলে মানুষে মানুষে যোগাযোগটা কমে যাওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।
নির্বাচনী প্রচারণার মধ্যেই ট্রাম্পের একটি টুইটার (এক্স) পোস্টে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ইস্যুর মতো সংবেদনশীল বিষয়ের উল্লেখ অনেকের মনে থাকার কথা। এখানে সংখ্যালঘু বা হিন্দু সম্প্রদায়কে চিহ্নিত করে যে অভিযোগটা করা হয়েছে; আমার মনে হয়, ট্রাম্পের ওই পোস্ট বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন নয়। হ্যাঁ, এখানে একটা সহিংসতা হয়েছে, কিন্তু সেটার লক্ষ্য সম্প্রদায় বা সংখ্যালঘু নয়, সহিংসতা হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক রেজিমের সঙ্গে যারা ছিলেন, তারা এখানে লক্ষ্যবস্তু। এরও কারণ আছে, সেটা কী? যেহেতু বিগত রেজিম একটা হত্যাকা- চালিয়েছে। পাল্টা হিসেবে মানুষের দিক থেকে একটা প্রতিশোধের ঘটনা ঘটেছে, যা সাম্প্রদায়িক হামলা বা সংখ্যালঘু নির্যাতন নয়। বরং আমরা দেখেছি, এখানকার মানুষ হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের ঘরবাড়ি, মন্দির পাহারা দিয়ে রেখেছেন। কাজেই রাজনৈতিকভাবে তো প্রশ্নই আসে না, সামাজিকভাবেও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হয়নি। এ ছাড়া এখনকার সরকার সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই আগ্রহী এবং প্রস্তুত বলে মনে হয়েছে। ফলে ট্রাম্পের ওই পোস্ট বাস্তবতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় মনে করি। এ ক্ষেত্রে আমার মনে হয়, ওখানে যারা হিন্দু জনগোষ্ঠী আছে, যারা সংখ্যায় খুব বড় না হলেও প্রভাবশালী এবং তাদের ভোট পেতেই ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই পোস্ট দিয়েছেন।
বাংলাদেশ এখন যে পরিস্থিতি অতিক্রম করছে, সেখানে আর্থিক সংকট একটা বড় বিষয়, যা আমরা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি, সংস্কার প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে একটা সাসটেইনেবল ডেমোক্রেটিক রিফর্ম আনার পথে আছি। এই দুই জায়গাতেই আমার ধারণা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যারাই ক্ষমতায় আসবে, তারাই বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে। কারণ, এই দুই প্রচেষ্টা সফল না হলে বাংলাদেশ অস্থিতিশীল অবস্থায় থাকবে। আমার মনে হয় না, ট্রাম্প কিংবা যেই-ই ক্ষমতায় আসুক আমেরিকার প্রশাসন এখানে অস্থিতিশীলতা হোক, সেটা চায় না।
আরেকটা বিষয়ও অনেকে আলোচনায় আনছেন। সেটা হচ্ছে ট্রাম্পকে নিয়ে করা আমাদের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটি মন্তব্য। অনেক আগের এবং তার ব্যক্তিগত মন্তব্য, সেটা আমি দেখেছি। কিন্তু এখানে তো অনেক সময় গড়িয়েছে। এ ছাড়া ট্রাম্প ছাড়াও আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি যুক্তরাষ্ট্রে, সে ডেমোক্রেটিক বা রিপাবলিক পার্টি, যে পার্টিরই হোক না কেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সম্মানের চোখে দেখা হয়। আমি মনে করি, ড. ইউনূসের উপস্থিতিকে আমেরিকান প্রশাসন সম্মানের চোখে ইতিবাচক চোখেই দেখবে, এখানে নেতিবাচক হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
(অনুলিখিত)
