নতুন কারিকুলামের ২০০ কোটির খরচ পানিতে!

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৪, ০৮:১০ এএম

প্রাথমিক শিক্ষাকে আনন্দময় করতে এবং পাঠ্যপুস্তকের বোঝা ও পরীক্ষার চাপ কমাতে গভীর শিখনের বিষয়ে গুরুত্ব দেয় সরকার। মুখস্থ নির্ভরতার পরিবর্তে বাস্তবভিত্তিক শিক্ষাদান করতে চালু হয় ধারাবাহিক মূল্যায়ন। এজন্য সরকার ২০২৩ সালে প্রথম ও দ্বিতীয় এবং চলতি বছর তৃতীয় শ্রেণিতে সামষ্টিক মূল্যায়নের পরিবর্তে পাঠভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন চালু করে। ১৯৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ব্যয় করে সারা দেশের প্রায় চার লাখ শিক্ষককে সশরীরে ও অনলাইনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কিন্তু এ পদ্ধতি বাতিল হওয়ায় পুরো খরচই পানিতে যাচ্ছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) মো. ইমামুল ইসলাম বলেন, এরই মধ্যে কারিকুলাম বিস্তরণ প্রশিক্ষণ হয়েছে। কারিকুলাম বাস্তবায়নের বিষয়ে এনসিটিবিও কাজ করে।

গত বছর আগস্ট থেকে দেশের উপজেলা রিসোর্স সেন্টারে পর্যায়ক্রমে দেশের ৬৫ হাজার ৬৫৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় তিন লক্ষাধিক শিক্ষক সশরীরে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। তথাপি চলতি বছরে তৃতীয় শ্রেণিতে ধারাবাহিক মূল্যায়ন শুরু হয়। পাঠদান কাজকে সহযোগিতা করতে স্কুল পর্যায়ে বছরের সাত মাস পর শিক্ষক সহায়িকা প্রেরণ করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। ফলে শিক্ষকরা শিক্ষক সহায়িকা ছাড়াই প্রথমদিকে শ্রেণি পাঠদানকালে পারদর্শিতা যাচাই করলেও ডায়েরি-১ ও ডায়েরি-২-তে মূল্যায়ন ফল সংরক্ষণ করেনি। অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে তথ্য ডায়েরি খুঁজে পাওয়া যায়নি। নতুন কারিকুলামে প্রথম প্রান্তিক মূল্যায়নের ফল প্রকাশের পর শিশুদের প্রত্যেককে রিপোর্ট কার্ড প্রদানের নির্দেশনা থাকলেও প্রথম-তৃতীয় শ্রেণিতে তেমন কোনো মূল্যায়ন হয়নি।

চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি প্রকল্পের আওতায় নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের জন্য ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। এতে অনলাইনে ও সশরীরে প্রশিক্ষণ নেয় প্রায় চার লাখ শিক্ষক। এতে ব্যয় হয় ১৯৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।

প্রাথমিকের দেশসেরা প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলাম বলেন, নতুন কারিকুলামের শতকোটি টাকা ব্যয়ের প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও আদতে এর সুফলতা আসেনি। শ্রেণিকক্ষে নতুন কারিকুলামের ন্যূনতম কোনো বাস্তবায়নও হয়নি। শিক্ষকদের অবহেলা রয়েছে এমন প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া মুশকিল। পরীক্ষা পদ্ধতি যতটা না নেতিবাচক, তার চেয়ে বেশি ইতিবাচক বলে আমি মনে করি। শুধু পরীক্ষা ভীতিকে সামনে রেখে পরীক্ষা পদ্ধতি বাতিল করা যৌক্তিক বলে প্রতীয়মান হয় না। তিনি বলেন, পুরো জীবনটাই যেখানে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হচ্ছে, তাহলে এখানে নয় কেন? উচ্চশিক্ষা এবং চাকরির সবক্ষেত্রেই পরীক্ষা পদ্ধতি চালু রেখে প্রাথমিকে বাতিল করলে সেটা দুর্ভাগ্যজনক।

ফরিদপুর, শরীয়তপুর, বাগেরহাট জেলার একাধিক শিক্ষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, মূল্যায়ন বলতে শিক্ষক-অভিভাবকরা সাময়িক পরীক্ষা বোঝে। প্রথম-তৃতীয় শ্রেণিতে কার্যত কোনো লিখিত পরীক্ষা নেই। সরকারের নতুন কারিকুলামে শিশুদের পাঠভিত্তিক লেখাপড়া যাচাই করে পরবর্তী শ্রেণিতে উন্নীত করা হচ্ছে। অভিভাবকদের একটি অংশ মনে করে, ধারাবাহিক মূল্যায়নের পাশাপাশি সামষ্টিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। স্কুলপর্যায়ে সামষ্টিক মূল্যায়ন না থাকায় শিক্ষার্থী চলে যাচ্ছে কিন্ডারগার্টেন ও মাদ্রাসায়। নতুন কারিকুলাম শুধু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালু করা হলেও বেসরকারি স্কুল আগের মতো তিনটি সাময়িক পরীক্ষা চালু রেখেছে। এরই মধ্যে অধিকাংশ অর্থ ব্যয় হলেও শিক্ষকদের নতুন কারিকুলামের ওপর তেমনভাবে পারদর্শী করে তোলা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ অনেকের। নাম প্রকাশে একাধিক শিক্ষক বলেন, আমরা পাঠদানকালে প্রত্যেক শিশুর পারদর্শিতা যাচাই করি কিন্তু ডায়েরি-১ ও ডায়েরি-২ মেইনটেন করা কঠিন। তাছাড়া ডায়েরি-১ ও ২ মেইনটেন করতে গেলে পাঠদান কাজ সঠিকভাবে করা সম্ভব নয়।

তৃতীয় শ্রেণিপড়–য়া এক শিক্ষার্থীর বাবা দেবাশীষ বিশ্বাস বলেন, সরকার ইচ্ছামতো শিক্ষা পদ্ধতি চালু করছে। বিশে^র কোন মডেলে শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে চায় সরকার, সেটিও অপরিষ্কার। শিক্ষায় কারিকুলাম বলেন আর শিক্ষা পদ্ধতি বলেন, যেটার পরিবর্তন, সংযোজনের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের মতামত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ সেটা নেওয়া হয় কি না, জানি না। পরীক্ষা ছাড়া শিক্ষাব্যবস্থা হতে পারে না। কোনো না কোনো সময় তো পরীক্ষা ফেস করতেই হবে, তাহলে সেটা নিয়মিত নয় কেন?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত