ভাইরাল যুগের সাংবাদিকতা

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৪, ০১:৩৬ এএম

ভিউ বাড়ানোর নেশা : সাংবাদিকতা চ্যালেঞ্জের মুখে। সাংবাদিকতার মৌলিক ধারণা ও কাজ থেকে আমরা অনেকটায় ছিটকে পড়ছি। গণমাধ্যমের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ঢুঁ মারলে আপনি পাঠক বা দর্শক হিসেবে হতাশই হবেন। কারণ সেখানে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নিউজগুলোতে ফোকাস না দিয়ে কোনটাতে ভিউ বাড়বে, ডলার আসবে সেটাতেই বেশি ফোকাস করা হচ্ছে।

ভিউ বাড়ানোর নেশায় সাংবাদিকতা নীতি-নৈতিকতাও মানা হচ্ছে না। খুব একটা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে না, আদৌ এই নিউজ বা সংবাদের কোনো গুরুত্ব আছে কিনা। এই ধরুন কদিন আগে, খুলনার ফুলতলা উপজেলার ছাতিয়ানি গ্রামের কলেজছাত্র নাজমুল হোসেন মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন দিয়ে হেলিকপ্টার বানিয়ে হইচই ফেলে দিল। দেশের প্রথম সারির গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ করল। বিজ্ঞানী বানিয়ে ফেলল নাজমুলকে। সত্যি কি নাজমুল হেলিকপ্টার আবিষ্কার করেছে? যদি করে থাকে তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কী? আদৌ কি উড়তে সক্ষম এই হেলিকপ্টার? কোনো কিছু যাচাই-বাছাই না করেই মনগড়া সংবাদ প্রকাশ করা হলো, শুধু ডলার কামানোর উদ্দেশ্যে। শুধু তাই নয়, একটি সংবাদ প্রকাশের আগে আমরা বর্তমানে তথ্য-উপাত্ত খুব একটা যাচাই-বাছাই করি না। ধরুন, কোন একটি পক্ষ কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ দিল, সঙ্গে কিছু নথিপত্র। এগুলো পেয়েই আমরা নিউজ করতে ঝাঁপিয়ে পড়ি। যাছাই-বাছাই করি না। এই নিউজ বা সংবাদের পেছনে ওই ব্যক্তির কোনো স্বার্থ আছে কিনা, সেটিও ক্ষতিয়ে দেখা হয় না। অনেক সময়, ভুক্তভোগীদের আত্মপক্ষ সমর্থনেরও সুযোগ দেওয়া হয় না। অথচ যত বড় অপরাধী হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত হলেও অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। এরপরই পরিপূর্ণ হবে একটি প্রতিবেদন। কিন্তু বর্তমানে খুব একটা চর্চা করা হচ্ছে না।

ভাইরাল প্রবণতা ও ফেক নিউজ : বর্তমানে ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতা বেশি। এতেই ফেক নিউজের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ফেক নিউজ প্রকাশের তালিকায় দেশের শীর্ষ সংবাদ মাধ্যমের নামও থাকছে। ভাইরাল হওয়ার নেশায় ফ্যাক্ট চেকের ওপর নজর খুব একটা দেওয়া হয় না। বিষয়টা এমন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে, কোনো সংবাদ ভাইরাল না হলে মনে হয় সেই সংবাদের কোনো মূল্য নেই। গ্রহণযোগ্যতাই নেই। অনেক সংবাদমাধ্যম তো যার সংবাদে বেশি ভিউ কামাবে সেই কর্মীকে পুরস্কারের ব্যবস্থা করছে। এটিও সাংবাদিকতাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে। ভাইরাল বিষয়ের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে সংবাদ কর্মীরা। কারণ এসব নিউজে বাহবা বেশি। আলোচনায়ও থাকার সুযোগ তৈরি হয়। এ কারণে রাষ্ট্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ হারিয়ে যাচ্ছে, ভাইরালের ভিড়ে।

উত্তরণের উপায় কী? : এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ খুব জরুরি। দর্শক বা পাঠককে বোঝাতে হবে ফেক সংবাদ, ভাইরাল সংবাদ কিংবা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কী? সেটি অবশ্যই সাংবাদিকদের কাজের মাধ্যমেই ফুটে উঠবে। আর যদি সাংবাদিকতা শুধুই ভিউ বাড়ার ওপর বেশি গুরুত্ব দেয় তাহলে ফেক সংবাদ বন্ধ তো হবেই না বরং সাংবাদিকতা পেশা আরও কলুষিত হবে, নীতি-নৈতিকতা হারাবে। কমবে গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা। 

সোর্স কি ফেসবুক? : ফেসবুকে মানুষ যা পাচ্ছে তাই লিখছে। কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়া যার যেটা ইচ্ছা করছে তাই ওয়ালে আপলোড করছে। কিছু মানুষ তাই আবার বিশ্বাস করছে। অনেক গণমাধ্যম বাদবিচার ছাড়াই সেসব ফলাও করে প্রচার করছে। কিন্তু বিষয়টি এমন হওয়ার কথা না। ফেসবুক কোনো ঘটনা বা তথ্যের উন্মুক্ত সোর্স হতে পারে? সেই তথ্য যাচাই-বাছাই করা সাংবাদিকের কাজ। কিন্তু যখন হুট করে তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়, তখন গণমাধ্যমের ওপরে মানুষের আস্থা কমে যায়। বর্তমানে সেটাই হচ্ছে। ফেসবুকের অনেক উপকারী দিকও রয়েছে, ফেসবুক থেকে কিন্তু অনেক বড় খবরের তথ্য মেলে। আবার যেখানে সংবাদকর্মী পৌঁছাতে পারেনি সে জায়গা থেকেও একটি ঘটনা ফেসবুকের মাধ্যমে মানুষের নজরে আসে। বর্তমানে ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অনেক তথ্য পেয়ে থাকেন সংবাদকর্মীরা। এ কারণে প্রত্যেক সংবাদমাধ্যম অফিসে ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিষয়ক সেল’ তৈরি করা উচিত। ফেসবুকে কোনো তথ্য কিংবা কোনো দাবি উঠলে সেটির সত্যতা নিয়ে গবেষণা করে সেই সেলের তত্ত্বাবধায়নে সংবাদ পরিবেশন করা উচিত।

স্বাধীন সাংবাদিকতা ও সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট : স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ বিশেষ করে অনুসন্ধানমূলক সংবাদের জন্য সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট বড় বাধা। সরকারের উচিত স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য এ কালো আইন বাতিল করা। মূলত সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করার লক্ষ্যেই এ আইন তৈরি করা হয়েছিল। যাতে করে কেউ সত্য কিছু লিখতে না পারে। এ আইন শুধু সাংবাদিক নয়, মুক্তমনা যেকোনো লেখকের জন্য এক ধরনের হুমকিও বটে। বর্তমানে সাংবাদিকদের অনেক সংগঠন আছে। এসব সংগঠনের দায়িত্ব আছে। ধরুন তারা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিভিন্ন কর্মশালার আয়োজন করতে পারে। এতে করে নিত্যনতুন বিষয়ের সঙ্গে সাংবাদিকরা পরিচিত হতে পারবে। বিপদে-আপদে গণমাধ্যম কর্মীদের পাশে দাঁড়ানো উচিত এসব সংগঠনের। বিভিন্ন যৌক্তিক দাবি আদায়ে সরকারকে চাপ প্রয়োগ করতে পারে। একই সঙ্গে ভাইরাল কনটেন্টে ফোকাস না দিয়ে কীভাবে বস্তুনিষ্ঠ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় মনোযোগী করা যায় সেদিকেও নজর দেবে।

সাংবাদিকদের দমানোর একটি বড় হাতিয়ার মানহানির মামলা। এখনো সেই কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে। যদিও এসব মামলা আদালতে খুব একটি টেকে না। তবে সাময়িকভাবে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন সংবাদকর্মী। এ বিষয়েও নজর দিতে হবে সংশ্লিষ্টদের। পাশাপাশি প্রেস কাউন্সিলের কার্যক্রম গতিশীল ও কার্যকর হওয়া উচিত। তবেই সাংবাদিকদের দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা অক্ষুন্ন  থাকবে।

লেখক : সাংবাদিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত