ইলন মাস্ক কী চান

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২৪, ০২:৫৩ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ফিরে এলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাকে নির্বাচিত করতে মিলিয়ন ডলার খরচ করেছেন ইলন মাস্ক। কিন্তু কেন? লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ধনকুবের ইলন মাস্ক ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জেতাতে এবার উঠেপড়ে লাগেন। ট্রাম্পের জন্য তিনি খরচ করেন কয়েক মিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে এভাবে তার জড়িয়ে পড়ার কারণ নিয়ে ভাবছেন অনেকে। ডয়চে ভেলে তাদের এক প্রতিবেদনে এর কারণ অনুসন্ধান করেছে। তারা লিখেছে, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ইলন মাস্ক যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবার ছিলেন কেন্দ্রবিন্দুতে। মাস্ক তার ব্যবসা বা জনপ্রিয়তা হ্রাসের ভয়ে রাজনৈতিক মন্তব্য করা থেকে বিরত ছিলেন না। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দ্বিতীয়বার মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করার জন্য যথেষ্ট সাংস্কৃতিক ও আর্থিক সমর্থন দিয়েছেন।

ট্রাম্পকে নির্বাচিত করার জন্য রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটি বা প্যাককে ১১৯ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি দান করেছেন। নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের ভোটারদের ভোটে যেতে মিলিয়ন ডলার পুরস্কারের প্রস্তাবও দিয়েছেন। পর্যবেক্ষকরা ভাবছেন, মাস্কের বর্তমানে প্রায় ২৯০ বিলিয়ন ডলার সম্পদ রয়েছে। তিনি মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করেছেন ট্রাম্পের জন্য। হোয়াইট হাউজে সরাসরি এখন তিনি উপকৃত হবেন কীভাবে?

মহাশূন্যে বসবাস

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন ইলন মাস্কে। তার বাবা ল্যান্ড ডেভেলপার, প্রকৌশলী এবং প্রাক্তন স্থানীয় রাজনীতিবিদ এরোল মাস্ক এবং মা কানাডিয়ান মডেল ও পুষ্টিবিদ মায়ে মাস্ক। ইলন মাস্ক নব্বইয়ের দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন। তিনি অনলাইন সিটি গাইড, জিপ ২ এবং আর্থিক পরিষেবা প্ল্যাটফর্ম, এক্স ডটকম-এর মতো অনলাইন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় যুক্ত হন। পরে তিনি সম্ভবত মহাশূন্যেও তার বিস্তৃতি ঘটান। স্পেস-এক্স নামে তার প্রতিষ্ঠান এখনকার দুনিয়ায় অন্যতম এক উদ্যোগ। মহাকাশ ভ্রমণের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া এ উদ্যোগ ছিল অভিনব। তবে বৈদ্যুতিক গাড়ি-নির্মাতা টেসলা প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত। মাস্ক স্পেস-এক্স এবং টেসলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনি টানেল নির্মাতা দ্য বোরিং কোম্পানি এবং মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান নিউরালিংকও প্রতিষ্ঠা করেন। মাস্ক মনে করেন, মানবজাতিকে এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে বসবাস করতে হবে। অর্থাৎ মানুষকে বহু গ্রহের প্রাণী হয়ে উঠতে হবে। অন্যান্য গ্রহকেও জনবহুল জনপদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এ উচ্চাকাক্সক্ষা থেকে স্পেস-এক্স তৈরি। যদিও তার উদ্যোগটি বেসরকারি খাতের। তবে তার সংস্থাটি ক্রমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল মহাকাশ সংস্থা নাসার সঙ্গে বিলিয়ন ডলারের চুক্তির মাধ্যমে যুক্ত হচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে স্টারশিপ হিউম্যান ল্যান্ডিং সিস্টেম, যা নাসার নিজস্ব চাঁদে অবতরণের মিশনের সঙ্গে ব্যবহার করা হবে। স্পেস-এক্স মঙ্গল গ্রহে উপনিবেশ স্থাপনের জন্য মাস্কের নিজস্ব পরিকল্পনা অনুসরণ করার পাশাপাশি সেখানে অনুসন্ধানের জন্য নাসার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাতেও যুক্ত হতে পারে। মাস্ক মনে করেন, কম জন্মহার জলবায়ু পরিবর্তনের চেয়ে একটি বড় সমস্যা। যদিও তার এ মতের সঙ্গে বিজ্ঞানী এবং জনসংখ্যাবিদরা একমত নন। আর নিজের মতের পক্ষে সমর্থন তৈরিতে মাস্ক অন্তত ১২টি সন্তানের জন্ম দিয়েছেন।

ডান দিকে মাস্ক

মাস্ক সবসময় ট্রাম্পকে সমর্থন করেননি। তিনি আগে নিজেকে একজন মধ্যপন্থি হিসেবে পরিচিত করাতেন। বলতেন তিনি অর্ধেক ডেমোক্র্যাট এবং অর্ধেক রিপাবলিকান। ২০২২ সালে তিনি এমন মন্তব্যও করেন যেন ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য খুব বেশি বয়স্ক এবং তার অবসরের দিকে যাত্রা করা উচিত। ট্রাম্প এর প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, আমি হোয়াইট হাউজে থাকার সময় মাস্ক ভর্তুকি ভিক্ষা করেছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের শেষ দিকে দেখা গেল তাদের মধ্যে আর কোনো শত্রুতা নেই। বরং তারা বন্ধু হয়ে গেছে। ট্রাম্পের ভিক্ষা চাওয়ার খোঁচার জবাবে ইলন মাস্ক তাকে নির্বাচনী প্রচারের জন্য আনুমানিক ১১৯ মিলিয়ন ডলার দিয়েছিলেন। মাস্ক দীর্ঘদিন ধরে একজন উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। ২০২২ সালে তিনি ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে টুইটার অধিগ্রহণ করেন, যার নাম হয়ে যায় এক্স। তিনি এ প্ল্যাটফর্মের দায়িত্ব নেওয়ার পর ভুল তথ্য ছড়ানোর দায়ে অভিযুক্ত হন। এ ছাড়া অনেক সদস্যকে বরখাস্ত করেন তিনি। ট্রাম্পসহ নিষিদ্ধ, বিতর্কিতদের এই সামাজিক মাধ্যমে ফিরে আসার অনুমতি দেন। এসব কারণে শেষ পর্যন্ত প্ল্যাটফর্মটি থেকে অনেক ব্যবহারকারী সরে যায়। দাম কমে যায় এক্সেরও। যা এখন মাস্ক যে মূল্যে কিনেছিলেন তার প্রায় এক-পঞ্চমাংশে নেমে এসেছে।

তবে এ মূল্য হ্রাসে মাস্ক উদ্বিগ্ন বলে মনে হয় না। তার এ অবস্থান নিয়ে রুজভেল্ট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ডেভিড ফারিস বলেন, এমন অনেক ধনী ব্যক্তি আছেন... যারা অর্থ উপার্জন করেই যেতে চান এবং তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রিজমের মধ্য দিয়ে বিশ্বকে দেখতে চান এবং আরও বেশি সম্পদ সংগ্রহ করতে চান। এদের পরে এমন কেউ আছে, যারা এত ধনী যে ‘আমি টুইটার কেনার জন্য ৪৪ বিলিয়ন হারালেও আমার কিছু যায় আসে না’ (মাস্ক) এমন বলাতে মনে হচ্ছে, সেই পরের শ্রেণিতে পড়েন যিনি তার সম্পদ এমনভাবে ব্যবহার করছেন যার কোনো অর্থনৈতিক মূল্য নেই।

রাজনীতিতে

দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্মগ্রহণ করায় মাস্ক মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন না। তবে একজন মার্কিন নাগরিক হিসেবে তিনি কোনো নিম্ন পদের জন্য দাঁড়াতে পারেন। এর বাইরে তিনি ট্রাম্পের মাধ্যমে নিজের নীতি বাস্তবায়নের জন্য কাজ করতে পারেন। নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির রাজনৈতিক-অর্থনীতিবিদ স্টিভ নেলসন বিলিয়নিয়ারদের রাজনীতিতে যুক্ত থাকার প্রবণতা লক্ষ্য করেছেন। তিনি দেখেছেন এরা বেশিরভাগ স্বৈরাচারের পক্ষে ছিল। তবে নেলসন কল্পনা করেছেন, মাস্ক রাজনৈতিক পদ লাভের চেষ্টা করছেন। কারণ তিনি মনে করতে পারেন যে, তিনি অন্যের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি ক্ষমতায়

থাকলে তার উদ্দেশ্য পূরণ সহজ হবে।

বিবিসি তার এক প্রতিবেদনে বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের জনসাধারণের দৃষ্টিতে ৫৩ বছর বয়সী মাস্ক রিপাবলিকানদের নির্বাচিত করতে তার সময়, জ্ঞান আর বিনিয়োগের মাধ্যমে যে চেষ্টা চালিয়েছেন দেশের অভিজাত ব্যবসায়ীদের মধ্যে তা সত্যি বিরল। কারণ তারা ঐতিহ্যগতভাবে পেছনে থেকে রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পছন্দ করেন। মিশিগান ইউনিভার্সিটির রস স্কুল অব বিজনেসের উদ্যোক্তা বিভাগের চেয়ারম্যান এরিক গর্ডন ব্যাখ্যা করেন, সিইওদের কার্যক্রম জনসাধারণের সামনে হয় না। ট্রাম্পকে বিপুল আর্থিক সহযোগিতার জন্য ইলন মাস্কের একজন প্রধান সহযোগী স্টিভ ডেভিসকে নিয়োগ করা হয়। যিনি স্পেস-এক্স, এক্স ও বোরিং কোম্পানিসহ মাস্কের অন্যান্য কোম্পানিগুলোর জন্যও কাজ করেছেন।

কী চান

গত ১৩ জুলাই পেনসিলভানিয়ার বাটলারে হত্যা প্রচেষ্টার প্রেক্ষিতে ট্রাম্পকে প্রথম সমর্থন দেওয়ার পর থেকে ইলন মাস্ক নির্বাচনী প্রচারের অংশ হয়ে ওঠেন। যেখানে তিনি প্রায়ই বলে আসছেন যে, শুধু ট্রাম্পই আমেরিকার গণতন্ত্রকে বাঁচাতে পারেন। প্রচারণার শেষ দিনগুলোতে মাস্ক পেনসিলভানিয়া রাজ্যে বেশ সক্রিয় হন। যেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্র এবং যেখানে হেরে যান কমলা হ্যারিস। কিছু পর্যবেক্ষক তখন থেকেই মাস্কের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে ইলন মাস্ক এবং তার ব্যবসা উপকৃত হবে। এসব পর্যবেক্ষকদের একজন বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং প্ল্যাটফর্ম চার্জওয়ের সিইও ম্যাট টেস্ক।

তার মতে, মাস্কের এমন রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়ার ব্যাপারটা বৈদ্যুতিক যানবাহন শিল্প জগতে অন্যদের জন্য দুশ্চিন্তার। রাজনীতিতে তার ক্রমবর্ধমান সক্রিয়তার কারণে অন্যদের ওপর চাপ বাড়বে। আমি মনে করি মাস্কের আগ্রহ মূলত তার ব্যবসার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গর্ডনও এতে একমত। তার মতে, ইলন মাস্ক নিজেকে এমন একজন ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখেন, যাকে নিয়ন্ত্রক দ্বারা আটকে রাখা হয়েছে এবং তিনি মনে করেন যে, সরকারি হস্তক্ষেপ প্রযুক্তির বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

আরেক বিশেষজ্ঞ বিবিসিকে বলেন, তিনি একজন বন্য আর অদম্য উদ্যোক্তা হতে চান, যিনি নতুন পথে যেতে চান। এমন কোনো নিয়মের মধ্যে আটকা পড়তে চান না, যাতে প্রযুক্তির অগ্রগতি ৫, ১০, ২০ বছর পিছিয়ে যায়। মাস্ক অন্য পথে যেতে চান, তিনি মঙ্গল গ্রহে যেতে চান।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি নভেম্বরে জয়ী হলে, মার্কিন সরকারের খরচ কমানোর ব্যাপারটা তদারকি করতে পারেন ইলন মাস্ক। এমনকি যদি তিনি সেই দায়িত্ব পালন না করেন, তবুও ইলন মাস্কের সমর্থনের জন্য ট্রাম্প তার কথা শুনবেন এবং মাস্ক প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে শক্তিশালী প্রভাব ফেলতে পারেন বলে পর্যবেক্ষকরা বিশ্বাস করেন। ইলন মাস্ক বলেছেন যে, তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মত প্রকাশের অধিকার রোধ করা ঠেকাতে একটি সরকারি দক্ষতা বিভাগ করা হলে সেটার নেতৃত্ব দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী। ডেমোক্র্যাটরা অবশ্য বলছেন, স্পেস-এক্স ও টেসলার জন্য মাস্কের বিলিয়ন বিলিয়ন সরকারি চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে মাস্কের এমন অবস্থান স্বার্থের জটিল দ্বন্দ্ব তৈরি করতে পারে। ক্যালিফোর্নিয়া গভর্নর গ্যাভিন নিউজমের সাবেক প্রধান অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক উপদেষ্টা লেনি মেন্ডনকা বলেছেন, এটি একই সঙ্গে গভীরভাবে অনৈতিক এবং অবৈধ। তিনি বিশ্বাস করেন, যারা এভাবে সরকার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত, কর্তৃত্বের অবস্থানে তাদের থাকা উচিত নয়।

ফেডারেল নির্বাচন কমিশনের সাবেক জেনারেল কাউন্সিল লরেন্স নোবেল বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইলন মাস্কের দান কার্যক্রমের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার বিশ্বাস, এ ধরনের প্রচারণায় সেই আমেরিকানদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত, যারা নিরাপদ কাজের পরিবেশ এবং ভোক্তা সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেয়। তিনি বলেন, আমরা জানি কোম্পানিগুলো কী করে। তারা তাদের মুনাফা, স্বার্থ-সংশ্লিষ্টদের লাভ আর সিইওকে নিরাপদ রাখে এবং ব্যবসার খরচ হিসেবে নিরাপত্তা ইস্যুগুলোকে ব্যবহার করে। যে ব্যক্তি ব্যবসাকে  যেভাবে দেখে, সরকারকে সেভাবে দেখে, তাকে নিরাপত্তার দায়িত্বে রাখাটা বিপজ্জনক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত