নিজে নিজেই অধ্যক্ষের পদ দখল বিএনপি নেতার!

আপডেট : ১১ নভেম্বর ২০২৪, ১১:১৮ এএম

রাজশাহীর কাটাখালীর আদর্শ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষের চেয়ার দখল করার অভিযোগ উঠেছে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। তার নাম সিরাজুল হক। তিনি সহকারী অধ্যাপক ও রাজশাহী জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক। গত এপ্রিলে দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে কাটাখালী পৌরসভার উপনির্বাচনে মেয়র পদের প্রার্থী হওয়ায় দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল তাকে।

অভিযোগ উঠেছে, গত ৯ আগস্ট তিনি কলেজের অধ্যক্ষ জয়নাল আবেদীনকে তার কার্যালয়ে ঢুকতে দেননি। ফলে ভয়ে জয়নাল কলেজে যেতে পারেননি। কলেজে ঢুকতে বাধা দেওয়া ও বাড়িতে হামলা চালানোর অভিযোগে জয়নাল আবেদীন থানায় আলাদা দুটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

এ অবস্থায় কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি ও পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোহরাব হোসেন কলেজের এক শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছেন। কিন্তু পরদিনই অধ্যক্ষের চেয়ার দখল করে নিয়েছেন সিরাজুল হক। এ নিয়ে গত ২৮ অক্টোবর ইউএনও সোহরাব হোসেন জেলা প্রশাসকের কাছে একটি প্রতিবেদন দিয়েছেন।

এর আগে অধ্যক্ষ জয়নাল আবেদীনকে কলেজে ঢুকতে না দেওয়া ও তার বাড়িতে হামলার ঘটনায় ২০ অক্টোবর তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) কমিশনারকে চিঠি দিয়েছেন। কিন্তু এখনো কলেজে যেতে পারেননি জয়নাল আবেদীন। দায়িত্ব নিতে পারেননি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বদরুল আমিন সরকারও। অধ্যক্ষের চেয়ার দখল করে আছেন ভূগোলের শিক্ষক সিরাজুল হক।

কলেজের অধ্যক্ষ জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের সমর্থকও না। বরং আমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন সবাই বিএনপি করে। আর আমার কলেজের সভাপতি ছিলেন এলাকার সাবেক এমপি আয়েন উদ্দিন। তাই তার কাছে আমাকে যেতে হয়েছে। এখন সিরাজুল হক বলে বেড়াচ্ছেন, আমি নাকি আওয়ামী লীগ করেছি। গত ৯ আগস্ট তিনি বহিরাগতদের নিয়ে এসে আমাকে কলেজে ঢুকতে দেননি। আমার বাড়িতেও হামলা চালিয়েছেন। কলেজে গেলে মেরে ফেলা হবে বলে ভয় দেখানো হয়েছে। তাই আমি কলেজে যেতে পারি না। এখন শুনছি সিরাজুল হক অধ্যক্ষের চেয়ার দখল করে নিয়েছেন।’

গত ২৮ অক্টোবর কলেজের সভাপতি ও ইউএনও সোহরাব হোসেন জেলা প্রশাসকের কাছে যে প্রতিবেদন দিয়েছেন, তাতে বলা হয়েছে, অধ্যক্ষ জয়নাল আবেদীন অনুপস্থিত রয়েছেন। তাই কলেজের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে ২৩ অক্টোবর গণিতের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক বদরুল আমিন সরকারকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হওয়ার আগেই পরদিন ২৪ অক্টোবর ভূগোলের শিক্ষক সিরাজুল হক সব শিক্ষককে ভয়ভীতি দেখিয়ে সম্মতিসূচক স্বাক্ষর নিয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর আগে অধ্যক্ষ জয়নাল আবেদীনকে ঢুকতে না দিয়ে গত ১১ সেপ্টেম্বর তিনি চেয়ার দখল করে নিজেকে অধ্যক্ষ বলে ঘোষণা দেন। এ পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে ওই চিঠি দেন ইউএনও সোহরাব হোসেন।

কলেজের শিক্ষকরা জানান, ১১ আগস্ট সিরাজুল হক নিজেকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ঘোষণা করলে পরে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তারা ইউএনওর কাছে বসেছিলেন। কিন্তু বিষয়টির কোনো সুরাহা হয়নি। কথাবার্তার ফাঁকে ফাঁকে সিরাজুল হক উত্তেজিত হয়ে মারমুখী আচরণ করেন। এ সময় শিক্ষকরা জয়নাল আবেদীন ও সিরাজুল হককে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ করার আবেদন করেন। তখন পাঁচজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের যেকোনো একজনকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু ভীতসন্ত্রস্ত অন্য চারজন শিক্ষক দায়িত্ব নিতে চাননি। রাজি হয়েছিলেন বদরুল আমিন সরকার। কিন্তু পরদিনই সিরাজুল হক অধ্যক্ষের চেয়ার দখল করেন। কার্যালয়ে লাগিয়ে দেন আলাদা তালা। ফলে বদরুলও দায়িত্ব পাননি।

অধ্যক্ষের চেয়ার দখলের অভিযোগ প্রসঙ্গে সিরাজুল হক বলেন, ‘এলাকার লোকজন ও শিক্ষক-শিক্ষার্থী আমাকে এই সম্মান দিয়েছেন। তাদের অনুমতিক্রমেই আমি দায়িত্ব নিয়েছি। অধ্যক্ষ পালিয়ে থাকলে তো কলেজ চলে না। তাই স্বেচ্ছায় এই দায়িত্ব পালন করছি।’ তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হয়েছিল। তিনি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার।

সিরাজুল হকের বিরুদ্ধে কলেজের এক ছাত্রীর মা ২০১৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেছিলেন। ওই মামলায় তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন।

সার্বিক বিষয় নিয়ে কলেজের সভাপতি ও পবার ইউএনও সোহরাব হোসেন বলেন, ‘অধ্যক্ষ অনুপস্থিত থাকার কারণে আমরা একজনকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দিতে চাই। তখন জ্যেষ্ঠ পাঁচজনের নাম আনা হলে তিনজনই দায়িত্ব নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। আর সিরাজুল হক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক হলেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকায় আমরা তাকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ না করে অন্যজনকে করি। কিন্তু পরদিনই সিরাজুল হক নিজেই অধ্যক্ষের চেয়ারে বসে গেছেন। এই পরিস্থিতিতে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। এখন করণীয় কী তা জানতে চেয়ে জেলা প্রশাসককে প্রতিবেদন দিয়েছি। জেলা প্রশাসক বিষয়টি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছে।’

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত