মাওলানা ইসহাক ও মালতিপুর মাদ্রাসার ইতিবৃত্ত

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০২৪, ০১:২৭ এএম

দারুল উলুম দেওবন্দের চেতনা ও আদর্শকে ধারণ করে বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় যারা নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে কাজ করেছেন তাদের অন্যতম একজন মাওলানা ইসহাক। তিনি অত্যন্ত সাদাসিধে, সরলমনা, প্রচারবিমুখ ও পরহেজগার একজন আলেম। জীবনের পুরোটা সময় ইলমে নববির খেদমতে ব্যয় করেছেন। দুনিয়ার চাকচিক্য তাকে কখনো স্পর্শ করেনি। এখন উপনীত হয়েছেন জীবনের পড়ন্ত বেলায়। মহান এই মনীষীকে নিয়ে লিখেছেন মুফতি আতিকুর রহমান

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মালতিপুর মাদ্রাসা। অর্ধ শতাব্দীর অধিক সময় ধরে ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তারে এ মাদ্রাসার অবদান অনস্বীকার্য। এখানে পড়াশোনা করে হাজার হাজার হাফেজ-আলেম দেশ ও দেশের বাইরে ধর্মীয় সেবায় নিয়োজিত আছেন। এ মাদ্রাসার প্রভাবে মালতিপুরসহ আশপাশের এলাকায় ধর্মীয় মূল্যবোধের ব্যাপক চর্চা লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে মালতিপুর মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে এর দুই পাশে গড়ে উঠেছে দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত দুটি মহিলা মাদ্রাসা। তাই এ অঞ্চলের মানুষ সাধারণ শিক্ষার চেয়ে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি বেশি আগ্রহী এবং অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের ধর্মীয় শিক্ষায় গড়ে তুলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। শুধু মালতিপুর গ্রামেই কোরআনের হাফেজের সংখ্যা প্রায় ৫০ জন। আলেমের সংখ্যাও অনুরূপ। সুতরাং শতাধিক হাফেজ-আলেমের গ্রাম বলা যায় মালতিপুরকে।

এই মালতিপুর মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ইসহাক। তিনি এই গ্রামে ১৯২৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা আলহাজ রেজা আলী (ইরাজ আলী) ছিলেন অত্র অঞ্চলের গণ্যমান্য ব্যক্তি। ছয় ভাই এক বোনের মধ্যে মাওলানা ইসহাক সবার বড়। তার পড়াশোনার হাতেখড়ি মা-বাবার কাছে। মা-বাবা ধর্মপরায়ণ হওয়ায় বড় সন্তানকে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করতে মনস্থির করেন এবং প্রাথমিক শিক্ষা শেষে মাদ্রাসায় ভর্তি করেন। তিনি গোয়ালগাতি মাদ্রাসা এবং মুক্তাগাছা আব্বাসিয়া মাদ্রাসায় কয়েক বছর পড়াশোনা করেন। অতঃপর ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দে গিয়ে শরহে বেকায়া জামাতে ভর্তি হন। সেখানে মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.)-এর স্নেহধন্য হন। দেওবন্দ মাদ্রাসায় পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি মাদানি মসজিদের ইমাম এবং হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.)-এর খাদেম নিযুক্ত হন। শরহে বেকায়া থেকে মেশকাত জামাত পর্যন্ত ৪ বছর দেওবন্দে তিনি এভাবে অতিবাহিত করেন। এই উল্লেখযোগ্য সময়ে মাদানি মঞ্জিলের সঙ্গে তার মহব্বত গাঢ় হয়। মেশকাত জামাতের বার্ষিক পরীক্ষার পর ছুটিতে বাড়ি আসেন। দেশে গণ্ডগোল থাকায় পরবর্তী নতুন শিক্ষা বছরে আর ভারত যেতে পারেননি। তাই বাধ্য হয়ে হাটহাজারী মাদ্রাসায় দাওরায়ে হাদিসে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই পড়াশোনার পাঠ শেষ করেন।

তৎকালীন এই অঞ্চলে শিক্ষা-দীক্ষার হার শূন্যের কোঠায় ছিল বললেই চলে। আলেম বা শিক্ষিত হিসেবে মাওলানা ইসহাক ছিলেন এই অঞ্চলের দ্বিতীয় ব্যক্তি। এই অঞ্চলে প্রথম ম্যাট্রিক পাসের গৌরব অর্জন করেন মাওলানা ইসহাকের ছোট ভাই ‘মতলেব সাহেব’। এ নামেই তিনি খ্যাত ছিলেন। এলাকার প্রথম ম্যাট্রিক পাস করা শিক্ষিত মানুষ, সরকারি চাকরি করেছেন, স্বাস্থ্যকর্মী ছিলেন, গায়ে সুগন্ধি লাগিয়ে চলাফেরা করতেন, অত্যন্ত শৌখিন ও রুচিশীল ছিলেন, সবার মধ্যে তাকে আলাদা করা যেত। তাই তার নামের সঙ্গে ‘সাহেব’ শব্দ যুক্ত হয়ে যায়। ‘মতলেব সাহেব’ ছাড়া মাওলানা ইসহাকের অন্য সব ভাই কমবেশি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন। তাদের সন্তানসন্ততির প্রায় সবাই মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন এবং মাদ্রাসার শিক্ষকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন। মাওলানা ইসহাকের তিন ছেলে, ছয় মেয়ে। বড় ছেলে হাফেজ জিয়াউল হক ফারুক, মেজো ছেলে মাওলানা হাবিবুর রহমান, ছোট ছেলে কারী রশিদ আহমদ। বড় ছেলে হাফেজ জিয়াউল হক ফারুক ১৫ বছর আগে ইন্তেকাল করেছেন। বাকি দুই ছেলে মাদ্রাসার শিক্ষকতা ও ইমামতির সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন। মেয়েরাও পারিবারিকভাবে ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন করেছেন। তার ছেলে-মেয়েদের সন্তানসন্ততিদের মধ্যে হাফেজ-আলেমের সংখ্যা প্রায় ৫০ জন।

মাওলানা ইসহাক চেতনা ও আদর্শে দেওবন্দি। হজরত কাসেম নানুতুবি ও হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.)-এর একনিষ্ঠ অনুসারী। তাদের অনুসৃত পথেই নিজের জীবন পরিচালনা করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন তিনি। তাই পড়াশোনা শেষে নিজ গ্রামে দ্বীনি কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেন। এ উপলক্ষে ১৯৬৫ সালে মালতিপুর পাথালিয়া বাগান জামে মসজিদ ইদগাহ মাঠ সংলগ্ন বকুলতলায় পরামর্শ সভার আহ্বান করেন। এতে এলাকার ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিরা উপস্থিত হন। পরামর্শ সভার শুরুতে মাওলানা ইসহাক দ্বীনি কওমি মাদ্রাসার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করেন। আলোচনার এক পর্যায়ে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাব দেন। এতে উপস্থিত ধর্মপ্রাণ মুসলিম জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেন।

অতঃপর মসজিদের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে সড়ক সংলগ্ন সাবাহি মক্তব ঘরে মাদ্রাসার যাবতীয় কার্যক্রম শুরু করা হয়। মাদ্রাসার নামকরণ করা হয় দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা হজরত কাসিম নানুতুবি (রহ.)-এর নামানুসারে, ‘কাসিমুল উলুম মাদ্রাসা’। মাদ্রাসা পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত হন মাওলানা ইসহাক। সঙ্গে থাকেন মাওলানা ওলিউল ইসলাম। ওই সময়েই সবার শ্রদ্ধাভাজন মুরব্বি মাওলানা উসমান গনি (রহ.)-কে মাদ্রাসার সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। এভাবে অল্প কিছু শিক্ষার্থী নিয়ে মাদ্রাসা চলতে থাকে। যত দিন যায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। কিছু দিনের মধ্যে শিক্ষার্থীদের আধিক্যের কারণে মাদ্রাসার পরিধি বাড়ানো এবং নতুন ঘরের প্রয়োজন দেখা দেয়। তাই মাওলানা ইসহাকের পিতা আলহাজ রেজা আলী (ইরাজ আলী) নিজস্ব অর্থায়নে ১৪ হাত চৌচালা দুটি ঘর নির্মাণ করে দেন। এভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত চলতে থাকে। যুদ্ধ চলাকালে মাদ্রাসাটি প্রায় অচল হয়ে পড়ে। যুদ্ধের পর মাদ্রাসাটি পুনরায় চালু করা হয়। অতঃপর স্বাধীন দেশে বিদ্যানুরাগী শিক্ষার্থীদের আগমনে মাদ্রাসা সম্প্রসারণের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই সময়েও এগিয়ে আসেন মাওলানা ইসহাকের পিতা। তিনি ৬৮ শতাংশ জমি মাদ্রাসার জন্য দান করেন।

এভাবে মাদ্রাসা চলতে থাকে। শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। শিক্ষার্থীদের স্থান সংকুলান না হওয়ায় আরও নতুন ঘর নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এ সময় এগিয়ে আসেন মাদ্রাসার সভাপতি আলহাজ মাওলানা ওসমান গনি (রহ.)। তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে মুক্তাগাছা ও ময়মনসিংহ শহরের ধনাঢ্যদের সহযোগিতায় ৬৮ শতাংশ জমিতে ৬৬ ফিট দৈর্ঘ্যরে একটি বিল্ডিং নির্মাণ করে দেন। এই মহতি কাজে এলাকাবাসীও শরিক ছিলেন।

১৯৭২ সাল থেকে মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ব্যাপক উন্নতির দিকে অগ্রসর হয়। এমন পরিস্থিতিতে মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা ইসহাক কয়েকজন অভিজ্ঞ শিক্ষকের প্রয়োজন বোধ করেন। বিশেষ করে তিনি এমন একজন মুরব্বির অভাব অনুভব করেন যিনি প্রজ্ঞায় হবেন পরিপূর্ণ, মাথার ওপর ছায়া হয়ে থাকবেন এবং বাস্তব অভিজ্ঞতায় মাদ্রাসাকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবেন। এই লক্ষ্যে মাওলানা ইসহাক মুরব্বিদের সঙ্গে নিয়ে স্বীয় ওস্তাদ মাওলানা আরিফ রব্বানি (রহ.)-এর কাছে যান এবং তাকে মুহতামিম হওয়ার প্রস্তাব দেন। অতঃপর মাওলানা আরিফ রব্বানি (রহ.) মুহতামিম নিযুক্ত হন। আর মাওলানা ইসহাক হন নায়েবে মুহতামিম। তারা উভয়ে অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত মাদ্রাসাটি পরিচালনা করেন। এই দীর্ঘ ২৪ বছরে মাদ্রাসাটি মেশকাত জামাত পর্যন্ত উন্নীত হয়। এমন পরিস্থিতিতে মাওলানা আরিফ রব্বানি (রহ.) ইন্তেকাল করেন। অতঃপর সবার পরামর্শক্রমে মাওলানা ইসহাক পুনরায় মুহতামিমের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং মাওলানা আরিফ রব্বানি (রহ.)-এর ছেলে মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ সাদী নায়েবে মুহতামিমের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯৬ সাল থেকে মাওলানা ইসহাক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মাদ্রাসা পরিচালনার কাজ করে যান। দিন দিন পড়াশোনা ও অবকাঠামোর দিক দিয়ে মাদ্রাসাটির উন্নতি হতে থাকে। তার অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ২০০৩ সালে মাদ্রাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ ক্লাস দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত উন্নীত হয়। মালতিপুর অত্যন্ত ছোট্ট একটি গ্রাম। তবে দেশব্যাপী বিখ্যাত। বিখ্যাত হওয়ার কারণ এই মাদ্রাসা। যদিও মাদ্রাসার নাম ‘আলজামিয়াতুশ শরইয়্যাহ কাসিমুল উলুম, মালতিপুর, পাথালিয়া, মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ’। কিন্তু দেশব্যাপী মানুষজন এই মাদ্রাসাকে ‘মালতিপুর মাদ্রাসা’ হিসেবেই জানে ও চেনে। সুদূর ঢাকাতেও যদি বলা হয় ‘মালতিপুর মাদ্রাসা’, তাহলে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা বলার আর প্রয়োজন হয় না। এতটাই বিখ্যাত ও প্রসিদ্ধ এই মাদ্রাসা। বিখ্যাত ও প্রসিদ্ধ হওয়ার কারণ হলো, এই মাদ্রাসার বার্ষিক ইসলামি মাহফিল। এটাকে বলা হয়, ‘মালতিপুরের সভা’। আর ‘মালতিপুরের সভা’ বৃহত্তর ময়মনসিংহের এত প্রাচীন একটি বাৎসরিক ইসলামি ওয়াজ মাহফিলের নাম, যা আরও বহু বছর আগে থেকেই ‘ঐতিহ্যবাহী’ অভিধায় বিশেষায়িত হয়ে আসছে। প্রায় অর্ধ শতাব্দীর অধিক সময় ধরে প্রতি বছর ‘মালতিপুরের সভা’ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এই সভা উপলক্ষে মালতিপুর এলাকা সাজে নতুন এক রূপে। চারদিকে বিরাজ করে উৎসব উৎসব ভাব। মানুষের মুখে লেগে থাকে ঝলমলে হাসি। এলাকার বিভিন্ন স্থানে বসে লোকজ মেলা। রাস্তার দুপাশে থাকে ছাউনি ঘেরা বিভিন্ন দোকান। বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসে আদরের মেয়েরা। বাড়িতে বাড়িতে সমাগম ঘটে কাছে-দূরের স্বজনদের। প্রতিটি বাড়িতে চলে রান্নাবান্নার উৎসব। এলাকার প্রতিটি মানুষ মুখিয়ে থাকেন এই দিনটির অপেক্ষায়।

মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় মালতিপুর অত্যন্ত দরিদ্র একটি গ্রাম ছিল। এই গ্রামের প্রায় সব মানুষের আর্থিক অবস্থা ছিল ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’-এর মতো। তৎকালীন ‘মালতিপুরের সভা’ উপলক্ষে এই গ্রামে আল্লাহর বড় বড় ওলি-আওলিয়াদের আগমন ঘটেছে। তারা বিভিন্ন নিদর্শন দেখে বলেছেন, আল্লাহতায়ালা এই মাদ্রাসাকে কবুল করে নিয়েছেন। এই গ্রামের দরিদ্র মানুষগুলো কনকনে শীতের রাতে আল্লাহর সেসব ওলি-আওলিয়াদের মেহমানদারি করেছেন এবং সারা বছর মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। ব্যস! মহান আল্লাহ এই গ্রামকে অনেক উঁচুতে উঠিয়ে দিয়েছেন, এই গ্রামে অপরিমেয় প্রাচুর্য ঢেলে দিয়েছেন এবং এই গ্রামের মানুষদের রিজিকে ব্যাপক প্রশস্ততা দান করেছেন। ফলে অর্ধ শতাব্দী আগের অজ-পাড়াগাঁয়ে শহুরে হাওয়া লেগেছে আরও বহু আগেই। মালতিপুর এখন মৎস্য উৎপাদন ও বিপণন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এই যে একটি অজ-পাড়াগাঁ ক্রমেই অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক সমৃদ্ধ এলাকায় পরিণত হলো এবং দরিদ্র মানুষগুলো ধনবান হয়ে উঠল, এটার একক কৃতিত্ব যদি কাউকে দিতে হয়, তবে সেই কৃতিত্বের অধিকারী মাওলানা ইসহাক।

মাওলানা ইসহাক অত্যন্ত সাদাসিধে ও প্রচারবিমুখ একজন আলেম। ১০০ ছুঁই ছুঁই বয়স। জীবনের পুরোটা সময় ইলমে নববীর খেদমতে কাটিয়েছেন। কখনো ক্লান্ত হননি। এখন পড়ন্ত বেলা। শরীর অতটা সায় দেয় না। তবুও তিনি বারবার উঠে দাঁড়াতে চান। বর্তমানে তিনি মালতিপুর মাদ্রাসার সদরুল মুহতামিম হিসেবে নিযুক্ত আছেন। ইলমের প্রচার-প্রসারে মধ্য বয়সে তার জীবনের যে সংগ্রাম, যে দৌড়ঝাঁপ ছিল তা অল্প কথায় বলে শেষ করা যাবে না। তৎকালীন বিদ্যাগঞ্জ মাদ্রাসার দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। সেখানে ইমামতিও করেছেন। প্রায় ত্রিশ বছর সাইকেল চালিয়ে প্রতিদিন বিদ্যাগঞ্জ থেকে মালতিপুর আসা-যাওয়া করেছেন। দুনিয়ার চাকচিক্য তাকে কখনো টানেনি। যদি টানত কিংবা যদি ইচ্ছা করতেন তাহলে সাইকেল নয়; বরং চার চাকার মোটরগাড়ি করে চলাফেরা করতে পারতেন। তার বাবা ছিলেন এলাকার ধনাঢ্য একজন মানুষ। তারা ছয় ভাই। তিনি ছাড়া তার পাঁচ ভাই এলাকার অন্যান্য ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম। অথচ তিনিও উত্তরাধিকার সূত্রে বাবার সম্পদ থেকে একই পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হয়েছিলেন। এমনকি শ্বশুরবাড়ি থেকেও প্রচুর সম্পত্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু দুনিয়ার এসব প্রাচুর্য তাকে টানেনি। মাদ্রাসা-মসজিদই ছিল তার ধ্যানজ্ঞান। এ ছাড়া অন্যকিছু চিন্তা করেননি। সাধারণত দেখা যায়, মানুষ সারা জীবন উপার্জন করে এবং লক্ষ্য রাখে উপার্জনের বড় একটি অংশ দিয়ে সুন্দর বাড়ি তৈরি করে সেখানে আরাম-আয়েশে জীবনের বাকি সময়টুকু পার করে দেবে। কিন্তু মাওলানা ইসহাক নিজে থাকার জন্য স্থায়ীভাবে ন্যূনতম একটি বাড়ির চিন্তাও করেননি! মহান আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে বাড়ি বানাবেন। যে বাড়ির উপমা দুনিয়াতে নেই। কেননা সেই বাড়ির তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হবে নদী, যা চিরস্থায়ী হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত