কথাশিল্পের জাদুকর, গদ্যকার, নাট্যকার, গীতিকার, ভ্রমণকাহিনি লেখক, অনুবাদক কিংবা চলচ্চিত্র পরিচালক এমন বহুমুখী পদবি হুমায়ূন আহমেদের নামের সঙ্গে যুক্ত হলেও ‘কবি’ হুমায়ূন আহমেদ পাঠকের কাছে ঠিক ততটা পরিচিত বা সমাদৃত নন। দেশের মানুষকে বই পড়ায় আসক্ত করেছেন, প্রয়াত হওয়ার পরও বইমেলার ‘অন্যতম বেস্টসেলার লেখক’ হয়েছেন কিংবা তার হাত ধরেই আধুনিক বাংলা নাটক দর্শক-শ্রোতার কাছে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে ইত্যাদি বিশেষণ বা প্রশংসাসূচক শব্দাবলি হুমায়ূনকে সফলভাবে সংজ্ঞায়িত করলেও ‘কবি’ হুমায়ূন আহমেদকে আবিষ্কার করা তার বিপুল ভক্ত-পাঠকের পক্ষে সম্ভব হয়নি একেবারেই! এর পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে তার গুটিকয়েক কবিতা লেখা এবং সেগুলো বই আকারে প্রকাশিত না হওয়া। বেশ কবছর আগে বইমেলায় ঘুরতে ঘুরতে কাকলী প্রকাশনী, ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘গৃহত্যাগী জোছনা’ নামের কার্ড-সংকলনটি হঠাৎ চোখে না পড়ে গেলে হয়তো হুমায়ূন আহমেদের ‘সুপ্ত কবিসত্তার’ সঙ্গে পরিচিত হতাম না আমিও। ১৯৯৬ সালের এপ্রিলে প্রকাশক ও প্রচ্ছদশিল্পী সমর মজুমদার কর্র্তৃক প্রকাশিত সেই কাব্য-কার্ড সংকলনটিতে হুমায়ূন আহমেদের প্রায় দশটির মতো কবিতা চমৎকার অলংকরণে বুক স্টলে শোভা পেতে দেখে সবিস্ময়ে মাত্র ৫০ টাকায় কিনে ফেলি বেশ দ্রুতই। এক নিঃশ্বাসে কবিতাগুলো পড়ে ফেলার পর বিস্ময় বেড়ে যায় তার কাব্যসত্তার ক্ষণ প্রকাশ বা সুযোগের আফসোসে। জন্ম মাসে তার ভক্ত-পাঠকের সঙ্গে সেই কবিতাগুলো নিয়ে অল্প-বিস্তর আলোচনা করার লোভ সামলাতে পারলাম না।
প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো কবিতার ভাষা ও বিষয়বস্তু নির্বাচনে কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদকে ‘কবি’ হুমায়ূন আহমেদের কাছ থেকে খুব একটা আলাদা করা যাবে না। গদ্য ছন্দে লেখা সহজ সাবলীল প্রকাশভঙ্গিতে তার কবিতায় উঠে এসেছে মধ্যবিত্তের জীবন প্রেম-ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, অর্থকষ্ট ও শারীরিক-মানসিক অপারগতার মাঝেও ছোট ছোট অদেখা, অজানা আনন্দ ছুঁতে পেয়েও না পাওয়ার বর্ণিল আহ্বান।
‘বাবার চিঠি দেয়া’ কবিতায় উঠে এসেছে অদ্ভুত এক রোমান্টিকতা, যেখানে বাবার প্রেমিকার কাছে চিঠি নিয়ে যাচ্ছেন তার ছেলে: ‘আমি যাচ্ছি নাখালপাড়ায়/আমার বৃদ্ধ পিতা আমাকে পাঠাচ্ছেন তাঁর/প্রথম প্রেমিকার কাছে/আমার প্যান্টের পকেটে সাদা খামে মোড়া বাবার লেখা দীর্ঘ পত্র/খুব যতেœ খামের উপর তিনি তাঁর প্রণয়িনীর নাম লিখেছেন’//কবিতার বিষয়বস্তু কিছুটা অদ্ভুত মনে হলেও খুব সহজেই হুমায়ূন বলে ফেলেছেন কিছুটা অসহ্য স্বাভাবিকতা। গদ্যের মতো কবিতার শুরুতেই তিনি এক গল্প ফেঁদেছেন পাঠকের মনে হালকা এক মোচড় দিতে; যে গল্প পাঠক প্রথমে মেনে নিতে না চাইলেও একপর্যায়ে ‘সমব্যথী’ ও ‘একাত্ম’ হয়ে যাবেন কবিতার অপর অংশে যখন পড়বেন: ‘প্রেমিকাও একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর/রোগভুগের কথা পড়তে ভালোবাসেন।/চিঠি পড়তে পড়তে দরদে গলিত হন/আহা, বেচারা ইদানীং বড্ড কষ্ট পাচ্ছে তো...’/তার উপন্যাস কিংবা গল্পের চূড়ান্ত পর্যায়ে মিলিরা প্রায়শই ‘অধরা সমাপ্তির’ মুখোমুখি হলেও ‘সংসার’ কবিতায় শুনতে পায় প্রেম-পরিণয়ের সফল সমাপ্তি কিংবা আশার বাণী: ‘শোন মিলি/দুঃখ তার বিষমাখা তীরে তোকে/বিঁধে বারংবার/তবুও নিশ্চিত জানি, একদিন হবে/তোর সোনার সংসার/উঠোনে পড়বে এসে একফালি রোদ/তার পাশে শিশু গুটিকয়/তাহাদের ধুলোমাখা হাতে/ ধরা দেবে পৃথিবীর সকল বিস্ময়।’
সহজাত কবির মতোই ‘বাসর’ কবিতায় হুমায়ূন আহমেদ আবার নিয়েছেন রূপকের আশ্রয় যেখানে ‘লিফট’কে উল্লেখ করেছেন মিলনে অসফল এক সংসারের প্রতীক হিসেবে। একই সঙ্গে, সেখানে বেহুলা-লক্ষিন্দরের সচেতন উল্লেখে হুমায়ূনের লোককাহিনি প্রীতিও ফুটে উঠেছে: ‘কপাটহীন একটা অস্থির ঘরে তার সঙ্গে দেখা/লোহার তৈরি ছোট্ট একটা ঘর/বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে কোন যোগ নেই/ঘরটা শুধু উঠছে আর নামছে/নামছে আর উঠছে/মানুষ ক্লান্ত হয়/এ ঘরের কোন ক্লান্তি নেই/এ রকম একটা ঘরেই বোধহয় বেহুলার বাসর হয়েছিল...’//হুমায়ূন আহমেদ প্রকৃতিকে শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের আধার হিসেবেই নয়, মানুষের মনের অবস্থা, জীবনযাপন এবং অনুভূতির সঙ্গে একত্রিত এক জীবন্ত সত্তা হিসেবে দেখেছেন সব সময়। প্রকৃতির দুই নৈসর্গিক উপভোগ্য উপাদান, ‘জ্যোৎস্না’ ও ‘বৃষ্টি’ ছিল তার অসম্ভব পছন্দের। আর তাই তো আত্মার সঙ্গে, প্রতিটি লেখায়, নিজ ব্যক্তিত্বের সঙ্গে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত একাত্ম হয়েছিলেন কখনো ‘চান্নি পসর’ রাতে, কখনো আবার বৃষ্টিবিলাসে। ঠিক এমনটাই লক্ষ্য করা যায় সামাজিক মাধ্যমে জনপ্রিয়, আলোচিত কবিতা ‘গৃহত্যাগী জ্যোৎস্নায়’। সদা সর্বদা জ্যোৎস্না প্রকৃতির রূপ ও গুণে মুগ্ধ উদাস হুমায়ূন এখানেও ধরা দিয়েছেন তার কথাশিল্পের অন্যান্য ধারার মতোই: ‘প্রতি পূর্ণিমার মধ্য রাতে একবার আকাশের দিকে তাকাই/গৃহত্যাগী হবার মত জ্যোৎস্না কি উঠেছে?/বালিকা ভুলানো জ্যোৎস্না নয়/যে জ্যোৎস্নায় বালিকারা ছাদের রেলিং ধরে ছোটাছুটি করতে করতে বলবে-/ও মাগো, কী সুন্দর চাঁদ !’//সারা জীবন মানুষের জন্য, মানুষকে প্রাধান্য দিয়ে লিখেছেন হুমায়ূন, লিখেছেন মানুষের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের নানা দিক নিয়ে। তাই বলে তার চোখ কিংবা চেতনা এড়ায়নি মানব চরিত্রের বৈপরীত্যগুলোর দিক থেকেও। ফলে অসুন্দর, অপারগতা, ক্লান্তি-শ্রান্তি, জরাগ্রস্ততা স্পর্শ করত। তাকে গভীরভাবে যা ছুঁয়ে গেছে তার কবিতাকেও: ‘এক জরাগ্রস্ত বৃদ্ধ ছিলেন নিজ মনে/আপন ভুবনে/জরার কারণে তিনি পুরোপুরি বৃক্ষ এক।/বাতাসে বৃক্ষের পাতা কাঁপে/ তাঁর কাঁপে হাতের আঙুল।/বৃদ্ধের সহযাত্রী জবুথবু-/পা নেই, শুধু পায়ের স্মৃতি পড়ে আছে।’ (তিনি)//তার কবিতাগুলো মূলত গদ্য ছন্দে রচিত হলেও আনন্দ বর্ণনায় কিছুটা হাস্যরসাত্মকভাবে ছন্দবদ্ধভাবে উপস্থাপিত হয়েছে ‘অশ্রু’ কবিতাটি: ‘আমার বন্ধুর বিয়ে/উপহার বগলে নিয়ে/আমি আর আতাহার/মৌচাক মোড়ে এসে বাস থেকে নামলাম/দু’সেকেন্ড থামলাম/টিপটিপ ঝিপঝিপ/বৃষ্টি কি পড়ছে?/ আকাশের অশ্রু ফোঁটা ফোঁটা ঝরছে?’// কবিতাকে, কবিতা লেখার প্রক্রিয়াকে উপজীব্য করে ভাগ্যান্বেষী তাসের উপমায় ‘ভয়ংকর সুন্দরভাবে’ উপস্থাপন করেছেন ‘রাশান রোলেট’ নামের ভিন্নধারার এক কবিতায়: ‘প্রথম কলম পেয়েছি আমি,/আম্পায়ার এসে গেছেন।/পিস্তল আকাশের দিকে তাক করে তিনি বললেন, এ এক ভয়ংকর খেলা,/কবিতার রাশান রোলেট/যিনি সবচে ভালো পদ লিখবেন/তাকে তৎক্ষণাৎ মেরে ফেলা হবে।/আমার হাতে কলম কম্পমান/ সবচে সুন্দর পদ এসে গেছে আমার মুঠোয়।’
জন্মের মতো, ভালোবাসার মতো, হাসি-কান্নার মতো নয় বরং মৃত্যুকে তিনি কিছুটা ব্যতিক্রমভাবে গ্রহণ করতে চেয়েছেন। মৃত্যুকে সহজভাবে নিয়েও যেন নিতে পারেননি ঠিক যেমন তার বিদায়ও ভক্ত-পাঠককুলের কাছে এক অপ্রত্যাশিত সত্য। মৃত্যু তাই তার কাছে স্বাভাবিক অথচ কিছুটা সংশয় নিয়ে চলে এসেছে ‘কব্বর’ কবিতায়: ‘তিনি শায়িত ছিলেন গাঢ় কব্বরে/যার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বেঁধে দেয়া,/গভীরতা নয়।/কব্বরে শুয়ে তাঁর হাত কাঁপে পা কাঁপে/গভীর বিস্ময়বোধ হয়।/ মনে জাগে নানা সংশয়।/মৃত্যু তো এসে গেছে, শুয়ে আছে পাশে/ তবু কেন কাটে না এ বেহুদা সংশয়?।’
ব্যক্তিগত জীবনের মতো, তার উপন্যাস কিংবা গল্পের মতো প্রেম ও ভালোবাসার কাছে তার চাওয়া-পাওয়া ছিল খুবই অল্প। দুজন দুজনকে কাছে পাওয়া পাশে পাওয়া নির্লোভ, মোহহীন এক প্রেমই ছিল তার আজন্ম আকাক্সক্ষা। তাই সংখ্যা কিংবা বিস্তার নয় বরং ‘আমি খুব অল্প কিছু চাই’ শিরোনামের কবিতায় ক্ষ্যান্ত হয়েছেন এই বলে: “আমাকে ভালবাসতে হবে না,/ভালবাসি বলতে হবে না/মাঝে মাঝে গভীর আবেগ/নিয়ে আমার ঠোঁট/দুটো ছুঁয়ে দিতে হবে না/কিংবা আমার জন্য রাত/জাগা পাখিও/ হতে হবে না/অন্য সবার মত/আমার সাথে রুটিন মেনে দেখা করতে হবে না/ কিংবা বিকেল বেলায় ফুচকাও খেতে হবে না/এত অসীম সংখ্যক ‘না’-এর ভিড়ে/ শুধুমাত্র একটা কাজ/করতে হবে আমি যখন/প্রতিদিন একবার ‘ভালবাসি’ বলব/ তুমি প্রতিবার/একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে/একটুখানি আদর মাখা গলায় বলবে/ ‘পাগলি’”
হুমায়ূন আহমেদের কবিতা তার কথাশিল্পের অন্যান্য ধারার মতো অতটা বিস্তৃত নয়, নয় পাঠকের কাছে সমাদৃত ও পরিচিত। মাত্র গুটিকয়েক কবিতা বিবেচনায় হুমায়ূন আহমেদকে প্রসিদ্ধ কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়াও তর্কসাপেক্ষ। সংখ্যায় ‘নগণ্য’ অথচ প্রকাশভঙ্গি, উপমা কিংবা প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ‘বিস্তৃত’ কবিতাগুলো তার কবিসত্তার বিস্তৃতির অপার সম্ভাবনাকে ইঙ্গিত দেয়, তার চিরবিদায়ে যা হয়তো পাঠকের মনে রয়ে যাবে আফসোসেই।
