পনেরো বছর আগে সুপার হিরো সুপার হিরোইন প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে শোবিজে যাত্রা শুরু করেন নিলয় আলমগীর। এরপর বাংলালিংক দেশ-এর বিজ্ঞাপন দিয়ে দর্শকপ্রিয়তা পান। মডেলিং থেকে নাম লেখান সিনেমায় কিন্তু সেখানে ভাগ্য তার সহায় হয়নি। এরপর নাটকে অভিনয় শুরু করলেও নিজের আলাদা অবস্থান তৈরি করতে পারেননি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তার নাটক মানেই সর্বাধিক ভিউ। দশটি নাটক কোটি ভিউয়ের মাইলফলক ছুঁলে সেখানে অধিকাংশই থাকে এই অভিনেতার। কাজ, ক্যারিয়ার ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে।
এই মুহূর্তে টেলিভিশন নাটকের সবচেয়ে ব্যস্ত অভিনেতা আপনি, যিনি মাসের প্রায় ত্রিশ দিনই শুটিং করেন...
মাসের ত্রিশ দিন তো শুটিং করা যায় না। শুক্রবারে শুটিং না করার চেষ্টা করি। ঐদিনটাতে পরিবারকে সময় দিই। জুমার নামাজ পড়ি। বাকি দিনগুলোতে কাজ করা হয়। আর ঈদের পরে দেশের পরিস্থিতিতে কাজ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবুও কাজ চলছে, এই আর কি!
অভিনয়শিল্পীদের সবাই যেখানে রোমান্টিক নাটকে স্বচ্ছন্দ সেখানে আপনাকে দেখা যায় না কেন?
এটা নিয়ে বলতে হলে বলব, এক সাইড থেকে কিছু হয় না। সব সাইড থেকে মিললে তবেই হয়তো হয়। প্রথমত, আমি যে ধরনের কাজ পছন্দ করি সেখানে রোমান্টিক জনরা মেলে না। দ্বিতীয়ত, দর্শকরা আমাকে সেভাবে দেখতে চান কি না আমি জানি না। আমি কিছু রোমান্টিক নাটকে অভিনয় করেছি। কিন্তু সেগুলোর খুব বেশি ভিউ হয় না। ভিউ না হলে বুঝা যায় মানুষজন আমাকে রোমান্টিক চরিত্রে খুব বেশি দেখতে চান না। এর বাইরে নির্মাতারাও আমাকে নিয়ে খুব একটা আগ্রহ দেখান না রোমান্টিক কাজ করতে।
যে কোনো কাজে মানের চেয়ে ভিউকে গুরুত্ব দিচ্ছেন বেশি?
যে কোনো কাজ করা হয় দর্শকদের জন্য। দর্শক দেখে মানেই তো ভিউ। কোনো কাজ তো নিজের জন্য করা হয় না। প্রতিটা কাজ করা হয় দর্শকদের জন্য।
আপনার কাজ নিয়ে যখন দর্শকরা প্রতিনিয়ত সমালোচনা করেন, সেগুলো আপনাকে ভাবায় না?
যারা সমালোচনা করেন বা করছেন সেটা গুটিকয়েক, যাদের হয়তো আমাকে পছন্দ না বা আমার কাজ পছন্দ না। আগে তো জনরা বাছাই বা পছন্দের অপশন পেতাম না। যেখানে যেভাবে অভিনয়ের সুযোগ পেতাম সেখানে কাজ করতাম। এখন আমি যে ধরনের বা জনরার কাজগুলো করি সেটা হচ্ছে সিচুয়েশনাল কমেডি। আমি এতে অভিনয় করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। আর এ কাজগুলোই কিন্তু দর্শকরা বেশি উপভোগ করছেন।
অন্য কোনো জনরার নাটকে অভিনয়ের জায়গাটা পাচ্ছেন না?
অন্য জনরার নাটকে অভিনয় করছি না, সেটাও ঠিক না। দশটা কাজ পছন্দের জনরাতে করলে একটা কাজ করি অন্য জনরার। এজন্য ওই কাজগুলো দর্শকের চোখেও পড়ে না। আমি চাইলেই যে অন্য জনরার কাজ করতে পারব তেমনটাও না। তার জন্য একটা চ্যানেল, প্রযোজক, পরিচালক দরকার। সেটাও পাওয়া জটিল। আমাকে নিয়ে যারা কাজ করতে চান তারা ভিউয়ের জন্যই করতে চান। কারণ ভিউ হবে, টাকাও উঠবে।
তার মানে প্রতিষ্ঠিত নির্মাতারা আপনাকে নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করার আগ্রহ দেখান না?
জি... হয়তো বা! এখন পরিচালকদের হাতে নায়ক পছন্দ করার সুযোগ কম। চ্যানেল মালিক যাকে চান তাকে দিয়েই অভিনয় করাতে হয়। এখানে একটা হিপোক্রেসি আছে- যেকোনো চ্যানেল মালিক বা পরিচালক আমাকে নিয়ে একটা নেগেটিভ কথা বলবে। নিলয় আলমগীরের কাজ ভালো না, সস্তা কাজ করে। তখন কিন্তু সেই প্রযোজক আমার পেছনে ইনভেস্ট করবে না। তারা ভালো কাজ বলতে রোমান্টিক বা সিরিয়াস কাজকে বুঝে আর কমেডি নাটককে সস্তা মনে করে। এখন যে পরিচালক আমাকে নিয়ে প্রযোজকের কাছে নেগেটিভ মন্তব্য করেছেন তিনি কিন্তু আমাকে নিয়ে ভালো কাজটি করবেন না। বরং উনি যখন কাজ করতে আসবেন তখন আমার যে ধরনের কাজগুলোতে ভিউ হয় সেই নাটকের কাজই নিয়ে আসবেন। এই জিনিসটাই আমার পছন্দ হয় না।
আপনি প্রথম দিকে যে ধরনের নাটকে অভিনয় করতেন সেখান থেকে সরে গেছেন কি না?
আমি যখন ক্যারিয়ার শুরু করি (২০১১ সালের শেষ দিকে) তখন মাসে সর্বোচ্চ দুইটা সিঙ্গেল নাটকে কাজ করতাম। ধারাবাহিকে বেশি অভিনয় করা হতো। তখন ইউটিউব ছিল না। নির্মাতারা কাস্ট করলে কাজ করা হতো। তখন নাটকের ক্যারিয়ার বলতে বা নাটকের মার্কেট বলতে কোনোটাই তৈরি হয়নি। ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বলার মতো আমার কোনো উল্লেখযোগ্য সিঙ্গেল নাটক খুঁজে পাবেন না। তাই ওই সময়ের কাজ ধরে বলা যায় না।
প্রথম দিকে রোমান্টিক নাটকের ক্যারিয়ার ছিল। যারা প্রথম দিকের ক্যারিয়ারের সঙ্গে বর্তমান সময়কে তুলনা করেন আমার মনে হয় তারা না জেনেই বলেন। তাদের জিজ্ঞাসা করলে আমার একটা নাটকের কথা বলতে পারবেন না। তখন সালাহউদ্দিন লাভলু ভাইয়ের একটা সোনার পাখি রুপার পাখি ধারাবাহিকে অভিনয় করতাম। যেটা অনেক জনপ্রিয় হয়েছিল।
আপনার মতে ২০১৭-এর আগে আপনার কোনো ক্যারিয়ার ছিল না?
সিঙ্গেল নাটকের হিসাবে বলতে গেলে তখন ক্যারিয়ার বলতে আমার কিছুই নেই। আমার কোনো কাজ খুব বেশি আলোচনা, সমালোচনা বা খুব প্রশংসিত- কোনোটাই ছিল না। তবে ভালো কাজ করার চেষ্টা করে গেছি। কিন্তু উল্লেখ করার মতো দর্শকদের থেকে সাড়া পাইনি।
একটি প্লাটফর্ম থেকে বিজয়ী হয়ে আসার পরেও উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারেননি। এর কারণ কী?
ওই যে বললাম, একদিক থেকে সব কিছু হয় না। খুব ভালো বাজেটের, ভালো স্ক্রিপ্ট বা ভালো ক্যারেক্টারে কাজ পেতাম না আমি। ওই সময়টাতে অনেক ভালো ভালো অভিনেতা ছিলেন। তখন ভালো কোনো কাজ এলে পরিচালক বা চ্যানেলগুলো আমার কথা ভাবত না। কারণ তখন এখানে আমার থেকে আরও ভালো অভিনয় শিল্পীরা ছিলেন। আমাকে নিয়ে তাদের ভাবার কোনো কারণ নেই। হয়তো আমিও পরিচালক হলে ভাবতাম ভালো আর্টিস্ট রেখে তাকে কেন নেব! মার্কেটের ব্যাপারটাও ভাবতে হবে। মডেলিংয়ের পর অভিনয় শুরু করলাম। তখন অনেক দুর্বলতা ছিল। এখন বুঝতে পারি তখন ভালো ভালো কাজে কেন আমাকে নেওয়া হতো না। কারণ আমার অভিনয়ও এত ভালো ছিল না। অভিনয় যে শিখব, এমন ভালো জায়গাও ছিল না। সালাহউদ্দিন লাভলু ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করে আস্তে আস্তে অভিনয়টা শিখতে শুরু করি।
২০১৭-এর পর থেকে অভিনয়কে সিরিয়াসলি নিয়েছেন...
আমি কাজের প্রতি সিরিয়াস প্রথম থেকেই ছিলাম কিন্তু দর্শক এই সময়ে এসে পছন্দ করছে। অভিনয়ে সবাইকে সিরিয়াস হতে হয়। এখানে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই। যে যতটুকু অভিনয় পারে সে সেটা দিয়েই চেষ্টা করে ভালো করার।
সুযোগ না পাওয়া নিয়ে কখনো আক্ষেপ, ক্ষোভ কাজ করেনি?
না। আক্ষেপ বা ক্ষোভ কখনোই আসেনি। তবে আমি চেষ্টা করে গেছি।
এর জন্যই কি নিজে প্রোডাকশন হাউজ খুলেছেন?
না। লাভলু ভাইয়ের ধারাবাহিকে কাজ করার সময়েই আমার ইউটিউব চ্যানেলটা খোলা হয়েছিল। তবে প্রোডাকশন হাউজের যাত্রাটা শুরু হয় ২০১৭ সালে। এটা শুধু আমার নিজের জন্য না, যারা কাজ করতে চান কিন্তু সুযোগ পান না তাদের চিন্তা করেই শুরু করা। যেমন বেশ কয়েকজন নতুন ছেলে-মেয়েকে নিয়ে কাজ করেছি। ব্যবসার চিন্তা তো সবারই থাকে কিন্তু আমি চেয়েছি তাদের একটা ক্যারিয়ার হোক। সামনেও তাই করব।
