৮ হাজার কোটির বাজার শঙ্কায়

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০২৪, ০৮:০৯ এএম

বাংলাদেশের সিরামিক শিল্পের বাজার ধীরে ধীরে বাড়ছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানির হিস্যা বাড়ছে বাংলাদেশের। কাঁচামাল আমদানিনির্ভর এ শিল্পে চলমান গ্যাস, বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি যোগ হয়েছে ঋণপত্র খোলার জটিলতাও। এতে শিল্প খাতটির উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

চলতি অর্থবছরের (২০২৪-২৫) অক্টোবরে আগের বছরের তুলনায় সিরামিক পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ৩০ শতাংশ। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সিরামিক রপ্তানি হয়েছিল ৩ কোটি ৩১ লাখ ডলারের। এবার চার মাসে রপ্তানি হয়েছে ১ কোটি ২৪ লাখ ডলারের বেশি। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এটি ৬ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ বেশি।

চলতি বছরের অক্টোবরে সিরামিক পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৩৫ লাখ ৭০ হাজার ডলারের। আগের বছরের একই মাসে রপ্তানি আয় ছিল ২৭ লাখ ৪০ হাজার ডলারের। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৩০ দশমিক ২৯ শতাংশ।

বাংলাদেশের শিল্প খাতে এক বছরের বেশি সময় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট রয়েছে। এ সংকটের প্রভাব পড়েছে সিরামিক শিল্পেও। ডলার ও গ্যাসÑ এই দুই সংকটে চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে দেশের সিরামিক খাত। ডলার-সংকটে কাঁচামাল আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খুলতে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে সিরামিক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। অন্যদিকে গ্যাস-সংকটে অধিকাংশ কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

সিরামিক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, সিরামিক পণ্যের ৯০ শতাংশ কাঁচামালই আমদানিনির্ভর। ডলার ও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে গ্যাস সংকটের কারণে গত শীত মৌসুমে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী টাইলস উৎপাদন করা যায়নি। আর ডলার সংকটে ঋণপত্র খুলতে ব্যাংকে ব্যাংকে ঘুরতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের।

বাংলাদেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষ ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। ফলে আবাসন খাতের নির্মাণ কাজও থমকে পড়েছে। এ ছাড়া স্থাপনা নির্মাণে সব পণ্যের দামই বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মাসিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস মূল্য সূচক (বিএমপিআই) সেপ্টেম্বরে বেড়েছে ৬ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এর মধ্যে নির্মাণাধীন পণ্যের দাম বেড়েছে ৫ দশমিক ৮১ শতাংশ।

এই শিল্পের অন্যতম প্রধান সমস্যা মূল্যস্ফীতি। এটি সিরামিক পণ্যের স্থানীয় চাহিদা কমিয়ে দিয়েছে। বিবিএসের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশে। ২০১১-১২ অর্থবছরের পর এটি সর্বোচ্চ। সংশ্লিষ্টদের মতে, গত চার-পাঁচ মাসে স্থানীয় পর্যায়ে সিরামিক পণ্যের বিক্রি কমেছে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। রপ্তানি বাড়লেও উৎপাদন সংকটের কারণে তাও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

বাংলাদেশেই এখন প্রতি বছর ভালোমানের টাইলসের উৎপাদন বাড়ছে। দেশের ৩৩টি প্রতিষ্ঠান আছে, যারা আন্তর্জাতিকমানের টাইলস উৎপাদন করছে। আরও অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান পাইপলাইনে আছে। বাংলাদেশ সিরামিক পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিকারক সংগঠন বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে সিরামিকের বাজার বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১২-১৫ হাজার কোটি টাকা। এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত সিরামিক দেশের চাহিদার ৮০ ভাগ পূরণ করে। এই শিল্পে প্রায় ২ লাখ নারীসহ প্রায় ৫ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। তারা ৫০টিরও বেশি দেশে পণ্য সরবরাহ করেন।

দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপ আকিজ, আবুল খায়ের, ডিবিএল, শেলটেক, বিএইচএল, মেঘনা গ্রুপসহ ১০-১২টি কোম্পানি বিনিয়োগ করেছে। শুধু দেশি নয়, বিদেশি কোম্পানি সিবিসি, ফু-ওয়াং, আরএকে, চায়না-বাংলাসহ বিভিন্ন কোম্পানি।

সিরামিক ব্রিক তৈরিতে বাজারে একচেটিয়া প্রাধান্য বিস্তার করছে মিরপুর ও খাদিম সিরামিকস। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি সিরামিক টাইলস, রুফ টাইলস, পার্কিং টাইলসসহ বিভিন্ন ধরনের টাইলস উৎপাদন করে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে ৬৮টি সিরামিক তৈরির কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি কারখানা স্যানিটারিওয়্যার, ২০টি টেবিলওয়্যার ও বাকিগুলো টাইলস তৈরি করে। ৬ হাজার কোটি টাকার সিরামিক বাজারের মধ্যে টাইলস বিক্রির পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকা, যেখানে পাঁচটি প্রধান নির্মাতার টাইলসের বাজারের ৬০ শতাংশের এর বেশি শেয়ার রয়েছে।

প্রত্যেকের ১৬ শতাংশের বেশি মার্কেট শেয়ারসহ, আরএকে ও আকিজ যৌথভাবে টাইলস মার্কেট নিয়ন্ত্রণ করে, এরপর গ্রেটওয়াল, স্টার, আবুল খায়ের এবং মীর সিরামিকস।

স্থানীয়ভাবে সিরামিক একটি উদীয়মান শিল্প হলেও, বাংলাদেশ শুধু সিরামিক টেবিলওয়্যার রপ্তানি করে। উদ্যোক্তারা বলেন, বেশি শুল্ক দিয়ে সব কাঁচামাল আমদানি করে রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া অনেক সরকারি প্রকল্পে বিদেশি টাইলস ব্যবহার করায় দেশীয় সিরামিক পিছিয়ে রয়েছে বলে দাবি তাদের।

বিক্রেতা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে টাইলস ব্যবসায় বেচা-বিক্রি একেবারে কমে গেছে। সরকারি ঠিকাদার, ডেভেলপার কোম্পানির কোনো ক্রেতা আসেন না। শেয়ারে যারা ফ্ল্যাট বা বাড়ি করছেন তারা আসছেন। কিন্তু এর পরিমাণ কম। এজন্য বিক্রি কমে গেছে।

বাংলাদেশে উচ্চবিত্তের খাবার টেবিলে টেবিলওয়্যার হিসেবে শৌখিনতার জন্য সিরামিকস পণ্যের ব্যবহার শুরু করে এ দেশের মানুষ। ২০ শতকের শেষ দিকেও আমদানি এবং দেশের অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এ শৌখিন পণ্যের জোগান দিত।

শৌখিনতা ছাড়িয়ে সিরামিকস এখন জীবনের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য। বাংলাদেশে মূলত এখন তিন ধরনের সিরামিক পণ্য উৎপাদন হচ্ছে। টেবিলওয়্যার, টাইলস ও স্যানিটারিওয়্যার। বাংলাদেশের গড়ে উঠেছে ৬৬টি ব্র্যান্ড। প্রথম সিরামিক শিল্প কারখানা ১৯৫০-এর দশকে স্থাপিত হয় এবং সে সময় থেকেই এই শিল্পের যাত্রা শুরু। প্রধানত খাবার থালা-বাসন, টয়লেটসামগ্রী এবং টাইলস তৈরি করাই এই শিল্পের কাজ। প্রথম সিরামিক প্ল্যান্ট ১৯৫৮ সালে বগুড়ায় স্থাপন করা হয়। তাজমা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি নামে এই প্ল্যান্টটি ছিল ছোট এবং চীনামাটির বাসন-কোসন তৈরি করত। পিপলস সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি, যার আগের নাম পাকিস্তান সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি ১৯৬৬ সালে উৎপাদন শুরু করে। বেঙ্গল ফাইন সিরামিক লিমিটেড বাংলাদেশের প্রথম পোড়ামাটির তৈরি পণ্যের উৎপাদক। এই কোম্পানি ১৯৮৬ সালে চালু হয়। মুন্নু সিরামিক বাংলাদেশের বৃহত্তম কারখানাগুলোর মধ্যে একটি, যেটি ১৯৮৫ সালে চালু হয়। প্রথম দিকে এই কোম্পানি চীনামাটির বাসন তৈরি করলেও পরে সব ধরনের সিরামিক পণ্য উৎপাদন করে। শাইনপুকুর সিরামিক ১৯৯৭ সালে স্থাপিত হয়। দেশের প্রয়োজনের প্রায় শতকরা ৬০ ভাগ পণ্য এই কোম্পানি উৎপাদন করে। আরএকে সিরামিকস ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০০০ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত