বৈষম্যবিরোধী বাংলাদেশে নারীরা কোথায়?

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২৪, ০২:২৮ এএম

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে নারী শিক্ষার্থীদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। শোষকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে মাঠে নেমেছেন, বন্দুকের নলের সামনে বুক পেতে দিয়েছেন, মার খেয়েছেন, প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন, বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠেছেন আমাদের মেয়েরা। ৫ আগস্টে স্বৈরাচারের পতনের পর যেন দৃশ্যপট সহসা বদলে যেতে থাকে। ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসে কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারী শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ক্রমশ কমতে থাকে। সার্বিকভাবে সর্বস্তরের নারীই যেন দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যায়। সময়ে সময়ে এ নিয়ে সমালোচনা ও হতাশা দেখা গেলেও কার্যকরী কোনো উদ্যোগ এখনো নিতে দেখা যায়নি। বরং বিপরীতটা ঘটেছে। সমালোচনার মুখে পড়ে কখনো তড়িঘড়ি করে কোনো নারীকে সংলাপে যুক্ত করা হয়েছে, কখনো বৈষম্যবিরোধী নীতির প্রসঙ্গে নারীর জন্য প্রচলিত ছাড়, সুযোগ-সুবিধা তুলে দেওয়ার কিংবা পুরুষের জন্য একই সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব উঠেছে এখানে-সেখানে। একজন নারীবাদী সংগঠক এবং ইনক্লুসিভিটি বিষয়ক পেশাদার হিসেবে সর্বজনীন ভবিষ্যতের চিন্তা আমার কাজের অংশ। নতুন বাংলাদেশে নারীদের দৃশ্যমান অনুপস্থিতি এবং নানামুখী চিন্তার আলোকে যৎসামান্য কার্যকারণ ভাবতে বসেছি। উত্তরের থেকে প্রশ্নই আমার মনে বেশি। তবে প্রশ্নগুলো জরুরি। কারণ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুধু ছাত্রদের আন্দোলন ছিল না। ছাত্রীদেরও ছিল।

এ বছরের ২৪ জুলাই কোনোরকম সাড়াশব্দ ছাড়াই নারী কোটা বাদ পড়ে গেল। এ নিয়ে কথা বলার সময় বা সুযোগ সে সময় খুব একটা পাননি কেউ। কারণ চারদিকে তখন গুলি আর সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ। সবাই যে কথা বলতে চেয়েছেন এমনও নয়। উত্তরাধিকারে নারী-পুরুষের সমানাধিকারের প্রশ্নে প্রতিবারই যেমন কিছু নারী এগিয়ে এসে বলেন তারা সম্পত্তিতে সমান ভাগ চান না, তেমনি কোটা বিষয়ক আলাপেও এমন নারী দেখা গেছে যারা দাবি করেছেন তাদের কোটার প্রয়োজন নেই।

রিতা (ছদ্মনাম) একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। নারী কোটা তুলে দেওয়ার ব্যাপারে মত জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোটা আমার ভালো লাগে না। নারীর জন্য কোটা চাইতে লজ্জা লাগে। কেমন যেন ভিকটিম মনে হয় নিজেকে।’ রিতার মতো নারীদের হয়তো কোটার প্রয়োজন নেই। কিন্তু যে নারীর কোটার প্রয়োজন রয়েছে তার কী হবে? যে নারী আজ কোটার প্রয়োজন অনুভব করছেন না, তিনি কি জানেন তার জন্য বৈষম্যের কোন ব্যবস্থা পূর্বনির্ধারিত? কোটা কি আদৌ যথেষ্ট ছিল সেই বৈষম্য নিরসনের জন্য? নারীর জন্য নির্ধারিত কোটা তুলে দিয়ে কি আমরা এগোলাম নাকি আরও দু-কদম পিছিয়ে গেলাম? দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী হওয়া সত্ত্বেও সরকারি চাকরিতে নারীর উপস্থিতি পাঁচ শতাংশও নয়। যে নারী জন্মের পর থেকে সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বৈষম্য পেরোতে পেরোতে জীবনের নানান ধাপে পিছিয়ে পড়েছেন কিংবা ঝরে পড়ার পথে আছেন তার অংশীদারত্ব নিশ্চিত করার পথ তৈরি না করে যৎসামান্য সংরক্ষিত সুবিধাটুকু সরিয়ে নিয়ে আমরা কতটুকু বৈষম্যমুক্ত হতে পারলাম?

আন্দোলন পরবর্তী বাংলাদেশে ক্ষেত্রবিশেষে সমন্বয়ক ছাত্রীরাও বলেছেন যে তারা নারী হিসেবে ক্ষমতায় আসতে চান না। তারা মানুষ হিসেবে সমান অধিকার চান। শুনতে চমৎকার লাগলেও নারীর প্রতি বিরাজমান কাঠামোগত বৈষম্যকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে এমন ঢালাও অবস্থান নারীর বৈষম্যের পথকে আরও প্রসারিত করে। এমনকি বিভিন্ন কমিশনে নারীর অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুললে এমনটাও শোনা গেছে যে বাংলাদেশে বিষয়ভিত্তিক নারী বিশেষজ্ঞ নেই বিধায় কমিশনগুলোতে নারী নেই। নীতিনির্ধারণী জায়গায় সুশিক্ষিত, সচেতন নারী ও নারীবান্ধব ব্যক্তিদের সংকটে আগামীর বাংলাদেশ নারীর জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীর অনুপস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে তার উৎস খোঁজাটা জরুরি।

বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে নারীবাদী আন্দোলনের বিভিন্ন দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নভেম্বরের শুরুতে একটা আলোচনার আয়োজন করেছিল একটি সংগঠন। এই প্রসঙ্গে এমন আলাপের আয়োজন সম্ভবত ওটাই প্রথম ছিলও। নির্ধারিত সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে গিয়ে জানতে পারি অনিবার্য কারণবশত আলোচনাটি স্থগিত। সেই কারণ আর জানতে পারিনি পরে। এখন পর্যন্ত নতুন আয়োজনের কোনো তারিখও আসেনি। ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ, বিশেষত ঢাকা শহর চিন্তা এবং আলোচনায় জমজমাট হয়ে উঠেছে। প্রতি সপ্তাহেই অজস্র আলোচনা সভার আয়োজন হচ্ছে। সেখানে নারীদের অংশগ্রহণ নেহাত কম নয়। আশা করি সর্বস্তরের নারীর জন্য, নারীকে কেন্দ্র করে, নারীর সঙ্গে গঠনমূলক আলাপ এবং আশাবাদও আসবে অচিরেই।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্রী, শিক্ষক এবং নাগরিক সমাজের সঙ্গে ছোট-বড় আলোচনা থেকে কিছু সম্ভাব্য সমস্যা আমি লিপিবদ্ধ করেছি। সমস্যাগুলো নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণের অবকাশ রয়েছে। প্রথমত, নামে বৈষম্যবিরোধী হলেও ছাত্র আন্দোলন কাঠামোগতভাবে পিতৃতান্ত্রিক। এখানে চিরাচরিত পুরুষপ্রধান নেতৃত্ব ও পুরুষের আনুকূল্যে নারীকে স্থান দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, এই আন্দোলনে লৈঙ্গিক রাজনীতি বিষয়ে জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে। তৃতীয়ত, পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর প্রান্তিকতা বুঝতে না পারার কারণে বিভিন্ন নারীবিদ্বেষী পদক্ষেপের অনুকূলে পদক্ষেপ নিয়ে নারীর অবস্থানকে আরও নাজুক করে তোলার পথ সৃষ্টি হচ্ছে। নারী কোটা তুলে দেওয়া কিংবা ক্ষমতায় পুরুষের জন্য জায়গা ছেড়ে দেওয়া তারই বহিঃপ্রকাশ। চতুর্থত, বাংলাদেশের গড়পড়তা নারী ক্ষমতার জন্য লড়াই করে অভ্যস্ত নয়। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে নারীকে নীরবতা ও প্রচারবিমুখতার শিক্ষা দেওয়া হয়। নারীর সমতার আকাক্সক্ষা এবং ক্ষমতায় অনাগ্রহ বা অনভ্যস্ততাকে বৈষম্যবিরোধিতার নামে তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। নারীকে বলা হয় সে সমতা চাইলে নিজের যোগ্যতায় আসুক, নারী হিসেবে নয়। অথচ নিজের যোগ্যতা উপলব্ধি করার ও ক্ষমতার চর্চা করার জায়গা নারীকে দেওয়া হয় না। বরং নারী যেন সেই জায়গাটুকু দাবি না করে তার জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চেষ্টা থাকে।

এবং সবশেষে যে আলাপ ক্ষীণস্বরে এখানে ওখানে উঠে আসছে তা হলো আন্দোলন চলাকালে এবং আন্দোলনের পরে যেসব নারী আন্দোলনের পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতাকাঠামোকে প্রশ্ন করেছেন, হয় তাদের পেছনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, নয়তো তারা নিজেরাও বিরাগ নিয়ে সরে এসেছেন। ফলে সাংগঠনিক জায়গায় নারীর কার্যকর অবস্থানের জায়গায় শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে।

বৈষম্যের কাঠামোকে প্রশ্ন না করে, বিদ্যমান বৈষম্যকে উপেক্ষা করে সমতা কিংবা ইনক্লুসিভিটির দাবি তুললে আন্দোলনের ফসল আখেরে সুবিধাভোগীর সুবিধাকেই অগ্রাধিকার দেবে। তখন হয়তো মনে হবে বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে সবচেয়ে বড় বৈষম্য হয়েছে বাঙালি মুসলিম বিষমকামী পুরুষের সঙ্গে, এবং তার জন্য দায়ী প্রগতিশীল সংস্কৃতিকর্মী ও নারীবাদীরা। কারণ তারা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে এসেছেন, সম্প্রদায়গত আধিপত্যের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, তারা নারীর অধিকার বাড়ানোর কথা বলেছেন, নারীর জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ও ছাড়ের কথা বলেছেন, নারীর প্রতি সহিংসতার কঠোর শাস্তি চেয়েছেন, লিঙ্গবৈচিত্র্যকে গ্রহণ করতে বলেছেন। নারীকে কেন্দ্র করে এই চিন্তাভাবনাকে প্রশ্ন ও দমন করাও গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজনীতি। এই রাজনীতি না বুঝলে নারী ও বিবিধ সংখ্যালঘুর প্রতি আইনগত বৈষম্যগুলো সমন্বয় করা সম্ভব হবে না, সে হোক ধর্ম নির্বিশেষে নারীকে উত্তরাধিকারে সমান অধিকার দেওয়া, বিয়ে তালাক ও সন্তানের অভিভাবকত্বের ক্ষেত্রে সমান অধিকার ও দায়িত্ব নিশ্চিত করা কিংবা গৃহকর্মে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণের চর্চা।

মুক্তির আন্দোলনে নারীর সক্রিয় ভূমিকা বাংলাদেশে নতুন নয়। এমনকি বাংলাদেশের জন্মেরও আগে যত বিপ্লব, যত গণ-অভ্যুত্থান, যত স্বাধীনতা আন্দোলন এই অঞ্চলে হয়েছে, তার সবখানেই নারীর উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ ছিল। দেশের প্রয়োজনে, মানুষের প্রয়োজনে, প্রাণের তাগিদে নারী বারবার রাজপথে নেমে এসেছে। মুক্তি অর্জিত হওয়ার পর কেন নারী বারবার দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে গেছে তা দীর্ঘ আলাপ এবং বিশ্লেষণের বিষয়। আদতেই বৈষম্যবিরোধী নতুন বাংলাদেশ গঠন করতে চাইলে এই আলাপের বিকল্প নেই। শুধু শারীরিকভাবে নারী গুটিকয় মানুষকে দিয়ে যে নারীর মুক্তি সম্ভব নয় তা অতীতের ক্ষমতাশালী নারীদের দিয়ে আমরা দেখেছি সে রাজনীতিতে হোক বা অন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠানে।

বৈষম্য নিরসন করতে চাইলে বৈষম্য চিনতে পারতে হবে, বৈচিত্র্যকে ধারণ করতে পারতে হবে। নারীর সঙ্গে ঘটতে থাকা বৈষম্যকে নাকচ করে কিংবা টোকেনমুখী অন্তর্ভুক্তি দিয়ে উত্তরণ হওয়ার নয়। জুলাই আন্দোলন চলাকালে যারা সম্মুখভাগে ছিলেন না বা থাকতে পারেননি, যারা সরে এসেছেন এমন ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলা, বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস ও লৈঙ্গিক রাজনীতি নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনার পরিসর সৃষ্টি করা এবং সর্বোপরি নারীবাদকে সহজবোধ্য ও জনসম্পৃক্ত করা এখন সময়ের দাবি।

লেখক: নারীবাদী সংগঠক ও ফিউচারিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত