কয়েক মাস আগে বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যে ‘দুর্নীতি’ বড় বাধা বলে মনে করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (ইউএসএআইডি) মিশনপ্রধান রিড জে এশলিম্যান। তিনি বলেছিলেন, এজন্য দুর্নীতি কমাতে ও সেবা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিতে নির্ভরশীলতা বাড়াতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সুশাসন ও জবাবদিহি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা ‘দুর্নীতি’ বলে মনে করেছিলেন ব্যবসায়ীরা। তখন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছিল। প্রায় ৬৮ শতাংশ ব্যবসায়ী উচ্চমাত্রার এ সমস্যাকে এক নম্বর হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। দ্বিতীয় স্থানে ছিল অদক্ষ আমলাতন্ত্র। এবার নতুন করে সিপিডির এক জরিপে উঠে এসেছে দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি, উচ্চ করহারসহ ১৭ ধরনের বাধায় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বিপর্যস্ত। পাশাপাশি জানিয়েছে, আগামী দুই বছরে দেশের অর্থনীতিতে তিন ধরনের ঝুঁকি থাকবে। সোমবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানা গেল। রবিবার মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘বাংলাদেশে ব্যবসায়িক পরিবেশ সংস্কার : অন্তর্বর্তী সরকারের এজেন্ডা’ শীর্ষক এক সংলাপে জরিপের ফলাফল তুলে ধরেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার শাসনামলে পরিচালিত জরিপের তথ্য ধরে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে প্রায় ১৭ শতাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিকে তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আর ডলারের বিনিময় হারে অস্থিরতাকে দ্বিতীয় বৃহত্তম চ্যালেঞ্জ হিসেবে ধরা হয়েছে। এরপর রয়েছে অদক্ষ সরকারি আমলাতন্ত্র, মূল্যস্ফীতি ও মূলধন পাওয়ার সীমিত সুযোগ।
অনেকদিন ধরে সিপিডি বলে আসছে, এই ধরনের সমস্যার কথা। কিন্তু যে সমস্ত সমস্যা তারা চিহ্নিত করেছিল, তার তেমন পরিবর্তন হয়নি। এমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, যাতে চিহ্নিত সমস্যাগুলো সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উঠেপড়ে লেগেছে। এবার খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম তার প্রবন্ধে সেবা, কৃষি, ম্যানুফ্যাকচারিং ও নন-ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের এক দশকের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত নিয়েছেন। বলেছেনমুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক মন্দা এবং দারিদ্র্য ও বৈষম্য এ তিন ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির পাশাপাশি বেকারত্ব, জ্বালানি ঘাটতি এবং হৃদরোগ, ক্যানসার ও ডায়াবেটিস রোগের প্রাদুর্ভাব অর্থাৎ স্বাস্থ্য খাতের দুরবস্থা ও সামাজিক অবক্ষয়ের মতো সামাজিক ঝুঁকিও রয়েছে। পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেছেন ‘যদিও অপর্যাপ্ত অবকাঠামোর সমস্যা ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়েছে। বছরের পর বছর অদক্ষ আমলাতন্ত্র একটি প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিরতা একটি বড় কারণ হয়ে উঠেছে। মুদ্রাস্ফীতি সবসময় বড় চিন্তার কারণ। অন্যদিকে নীতির অস্থিতিশীলতা একটি মাঝারি স্তরের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে।’ সংলাপে বলা হয়েছে, ‘সার্বিকভাবে অর্থনীতির অবস্থা যথেষ্ট খারাপ। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, দুর্নীতি, প্রবৃদ্ধির হিসাবে গরমিলের কারণে অর্থনীতিকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হচ্ছে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থনীতির বড় অনিশ্চয়তা এখন উৎপাদন খাতে। নানা রকম উদ্যোগের পরও সবচেয়ে বড় রপ্তানি শিল্প পোশাক খাতে উৎপাদনব্যবস্থা এখনো ভঙ্গুর রয়ে গেছে।’ বলা হয়েছে, স্বচ্ছতার জন্য আধুনিকীকরণ প্রয়োজন। প্রাথমিক শিক্ষা র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে। এ ছাড়া শিক্ষায় মাথাপিছু ব্যয় কম। এ ছাড়া প্রাথমিক শিক্ষার স্তর অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করা ও সব শিক্ষার্থীর জন্য শক্তিশালী ভিত্তি নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর কর্মক্ষমতা পর্যালোচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। পাশাপাশি আর্থিক খাতেও ন্যায়পাল নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি।
এ ধরনের পরামর্শ সিপিডিসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিগত সরকারকে বেশ কয়েকবার দিয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এ ধরনের সমস্যাসঙ্কুল পরিস্থিতি সমাধান তো দূরের কথা, তা ব্যবসাবান্ধব এবং উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে যুক্ত করার কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। এবার ‘বাংলাদেশে ব্যবসায়িক পরিবেশ সংস্কার : অন্তর্বর্তী সরকারের এজেন্ডা’ শীর্ষক সংলাপে জরিপের ফলাফল তুলে ধরে সিপিডি যা বলেছে, তার সমাধান আদৌ হবে কি না, তা আমরা নিশ্চিত নই। তবে এটা মানতেই হবে, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে গতিশীলতা আনতে চাইলে যে সমস্ত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তা দ্রুত সমাধানের দিকে যেতে হবে। না হলে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে সমস্ত কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, তা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আমরা চাই, অর্থনীতির পলিসি হোক জনকল্যাণে ব্যবসাবান্ধব।
