শেয়ার বেচে ১০ হাজার কোটি আদায় করবে ইসলামী ব্যাংক

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২৪, ০২:২৪ এএম

ইসলামী ব্যাংকে এস আলম গ্রুপের শেয়ার বিক্রি করে ১০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ। তিনি বলেন, এস আলমের কোম্পানির ৬০ মিলিয়ন ডলার ইতিমধ্যে বকেয়া হয়ে গেছে। আগামী মাসে আরও ১৮০ মিলিয়ন ডলার ওভারডিউ হবে। গ্রুপটির এলসির বিপরীতে ২০ হাজার কোটি টাকার মতো দায় পরিশোধ করা হয়েছে। এ দায়ের অর্ধেক সমন্বয় করা হবে তার নামে-বেনামে থাকা শেয়ার থেকে। যার বর্তমান শেয়ারমূল্য প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া বাকি ১০ হাজার কোটি টাকার নতুন শেয়ার ইস্যু হবে।

গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

তবে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এস আলমের নামে-বেনামে ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৮১ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। তারপরও এসব শেয়ার বিক্রি করে ১০ হাজার কোটি টাকা আদায় করা কঠিন হবে। কারণ বিপুল পরিমাণে শেয়ার বিক্রি করতে গেলে এর দাম ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে বেশিরভাগ শেয়ার লকড ইন (বিক্রয় নিষিদ্ধ) থাকায় শেয়ারটির দর সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে। বিক্রয় নিষিদ্ধ থাকা এসব শেয়ার বিক্রি করতে গেলই দর কমতে শুরু করবে।

এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংকের প্রায় অর্ধেক আমানত এস আলম ঋণের নামে লুট করেছে, যা ফেরত আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এ ঋণ ইতিমধ্যেই খেলাপি হতে শুরু করেছে। এর ফলে প্রতি প্রান্তিকে ইসলামী ব্যাংকের সঞ্চিতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়তে থাকবে। ফলে আগামী কয়েক বছর ব্যাংকটির মুনাফায় থাকার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। মৌলভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়লে শেয়ার দরেও প্রভাব ফেলবে। ফলে ব্যাংকটির শেয়ার দর কমে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এমন পরিস্থিতিতে এস আলমের শেয়ার বিক্রি করে কাক্সিক্ষত অর্থ সংগ্রহ করা যাবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, এস আলমের শেয়ার বিক্রির জন্য শিগগিরই আদালতে মামলা করা হবে। এরপর বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে এস আলমের মালিকানার মধ্য থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করা হবে। শিগগিরই ভিসা পেলে আমরা সৌদি যাব। সেখানে ইসলামী ব্যাংকে আল রাজি ও ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকসহ আগের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য সৌদি যাব। তাদের বিনিয়োগ আবারও ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করব।

ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান বলেন, গত তিন মাসে আমাদের ব্যাংকের অনেক অগ্রগতি হয়েছে। ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ঋণাত্মক কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স এখন ২ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। ধীরে ধীরে এটা আরও কমবে। গত তিন মাসে আমরা ৪ হাজার ৯৭২ কোটি টাকার নতুন আমানত সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছি। পাশাপাশি নতুন ঋণ বিতরণ পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে। নতুন করে ২ হাজার ৭০০ এজেন্ট পয়েন্টে তিনজন করে ব্যাংকের কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে আমাদের আমানতের পরিমাণ অনেকগুণ বাড়বে বলে আশা করছি।

লুটপাট হওয়া টাকা আদায় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এস আলম ইসলামী ব্যাংকের ১৭টি শাখা থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে। শুধু টাকাই নেয়নি, আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে ব্যাংকের যে সম্পর্ক ছিল, সেটাও ধ্বংস করে দিয়েছে। আমরা ইতিমধ্যে চারটা আন্তর্জাতিক তদন্ত সংস্থা নিয়োগ করেছি। তাদের কাজ হলো সার্বিক বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা। তদন্ত শেষ হলে আমরা অ্যাকশনে যাব। ক্ষতি নিরূপণসহ ব্যাংকের টাকা আদায় প্রক্রিয়াকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। আগামী জানুয়ারির মধ্যে প্রথম ভাগ সম্পন্ন হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

চেয়ারম্যান আরও বলেন, আমরা গ্রাহক এবং বিদেশি গ্যারান্টার ব্যাংকগুলোর আস্থা ফেরানোর চেষ্টা করছি। আমরা এস আলমের উৎপাদনরত কোম্পানির এলসিও করছি। এস আলমের চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। কিন্তু তার কোম্পানির অন্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হয় আমাদের। ঋণ আদায়ে সবরকম প্রচেষ্টায় চলছে বলে জানিয়েছেন ওবায়দুল্লাহ আল মাসুদ।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, সব ব্যাংককে রক্ষা করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব। পরিচালনায় বদল এনেও যেসব ব্যাংক এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি, তাদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সব আমানতকারীকে রক্ষা করা হবে। তাড়াহুড়া বা ইমোশন অল্প সময়ের জন্য মানুষকে উত্তেজিত করে। কিন্তু ইমোশন দিয়ে দেশ চালালে সেটা ভালো হয় না। আমাকে বাস্তববাদী হতে হবে। পাশাপাশি সঠিক নীতি প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিবর্তন আনতে হবে।

তিনি বলেন, অনিয়মের মাধ্যমে যারা ব্যাংক থেকে টাকা নিয়েছেন, সেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কোনো প্রতিষ্ঠানকেই বন্ধ হতে দেব না। এটাই হলো আমাদের লক্ষ্য। এস-আলমই হোক বা বেক্সিমকোই হোক প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয় সম্পদ। প্রকৃত মালিক থাকুক বা না থাকুক প্রতিষ্ঠানগুলো চালানোর ব্যবস্থা হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনেক কর্মচারী কর্মরত আছেন। দেশ উৎপাদনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আছে, তাদের সঙ্গে ব্যাংকেরও সম্পর্ক রয়েছে। এগুলো তো বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। কাজেই আমাদের একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান কিন্তু আলাদা। যাতে ফান্ড ডাইভারশন না হয়। এটা আমাদের প্রচেষ্টা থাকবে। কোনো প্রতিষ্ঠানকে আমরা মরতে দেব না। প্রতিষ্ঠান মারা খুব সহজ কিন্তু গড়ে তোলা অনেক কঠিন এবং অনেক সময়ের ব্যাপার। প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে দেশ উপকৃত হয়, জাতি উপকৃত হয়। আমরা ব্যর্থ হতে চাই না। প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যর্থ হতে দেব না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত