জুলাই ও আগস্টে আওয়ামী লীগের পতন আন্দোলন ও পরবর্তীকালে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। এমন পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির পূর্বাভাসে পরিবর্তন এনে দীর্ঘমেয়াদি ঋণমান ‘স্থিতিশীল’ অবস্থা থেকে কমিয়ে ‘ঋণাত্মক’ করেছে ঋণমান যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান মুডিস রেটিংস। সরকারের ইস্যুয়ার ও সিনিয়র আনসিকিউরড রেটিংস ‘বি১’ থেকে ‘বি-২’-এ নামিয়ে আনা হয়েছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে এ সিদ্ধান্ত বলে জানিয়েছে মুডিস।
সিঙ্গাপুর থেকে গতকাল সোমবার প্রকাশিত রেটিংস প্রতিবেদনে মুডিস আরও জানিয়েছে, বাংলাদেশের স্বল্পমেয়াদি ইস্যুয়ার রেটিংস ‘নট প্রাইম’ বা শ্রেষ্ঠ গুণসম্পন্ন নয় হিসেবে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
বিশে^র প্রধান তিনটি ঋণমান যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের একটি মুডিস। গত ৩১ মে প্রতিষ্ঠানটি সর্বশেষবার বাংলাদেশের ঋণমান কমিয়েছিল। সেবার তারা ঋণমান একধাপ কমিয়ে বিএ৩ থেকে বি১-এ নামায়। এর কারণ হিসেবে মুডিস জানিয়েছিল, বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে উঁচুমাত্রার দুর্বলতা ও তারল্যের ঝুঁকি রয়েছে।
চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশকে ঘাটতি পূরণে আরও বেশি স্বল্পমেয়াদি ঋণের ওপর নির্ভরশীল করে তুলবে বলে মনে করে মুডিস। এ ছাড়া সম্পদের গুণগত মানের ঝুঁকির কারণে ব্যাংকিং ব্যবস্থার পুঁজি ও তারল্যসংক্রান্ত দুর্বলতা বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে রাষ্ট্রের দায়সংক্রান্ত ঝুঁকিও বেড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ‘প্রবাসী আয়ের প্রবাহ এবং উন্নয়ন অংশীদারদের কাছ থেকে পাওয়া ঋণের পরিমাণ বাড়লেও, গত কয়েক বছরে রিজার্ভের স্থিতিশীলতা কমায় বাহ্যিক কিছু আশঙ্কার ঝুঁকি রয়ে গেছে।’
প্রতিবেদনে ঝুঁকির একটি কারণ হিসেবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচনী রোডম্যাপ না থাকাকে অন্যতম ঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। মুডিস বলছে, ‘উচ্চ সামাজিক ঝুঁকির পাশাপাশি সুস্পষ্ট নির্বাচনী রোডম্যাপ না থাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং সাম্প্রদায়িকতার উত্থানও রাজনৈতিক ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে।’
মুডিস বলছে, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বৃদ্ধি ও বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীরা আরও বেশি ঋণ দিলেও বহিঃস্থ দুর্বলতাসংক্রান্ত ঝুঁকি আগের মতোই রয়েছে। এর কারণ গত কয়েক বছর ধরেই দেশের রিজার্ভ কমছে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। সামাজিক ঝুঁকি বৃদ্ধি, একটি পরিষ্কার পথনির্দেশকের অনুপস্থিতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং জনগোষ্ঠীভিত্তিক উত্তেজনার পুনঃআবির্ভাবের কারণে রাজনৈতিক ঝুঁকি বেড়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক করার কারণ হিসেবে মুডিস জানিয়েছে, তাদের প্রত্যাশার চেয়েও এবার কম প্রবৃদ্ধি হবে। ফলে তা দেশটির দুর্বল রাজস্ব পরিস্থিতি ও বহিঃস্থ খাতের চাপ আরও বাড়াতে পারে। এ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও আইনশৃঙ্খলার কারণে পণ্য সরবরাহের সমস্যার কারণে। এর ফলে রপ্তানি ও তৈরি পোশাক খাতের সম্ভাবনা মেঘাচ্ছন্ন হয়েছে।
মুডিস বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকার একটি বিস্তৃত সংস্থার কর্মসূচি পরিচালনা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে তা বাস্তবায়ন করার সক্ষমতা সম্পর্কে অনিশ্চয়তা রয়েছে। যদি অন্তর্বর্তী সরকার মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে ধরা ও উচ্চ বেকারত্ব কমানোসহ দ্রুত ফল না দিতে পারে, তাহলে সংস্কারের পেছনে যে রাজনৈতিক পুঁজি রয়েছে, তা দ্রুতই চলে যেতে পারে।
মুডিস আরও জানিয়েছে, ঋণমান কমানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের স্থানীয় মুদ্রা (এলসি) ও বিদেশি মুদ্রার (এফসি) ঊর্ধ্বসীমা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এলসির জন্য ঊর্ধ্বসীমা বিএ২ থেকে বিএ৩ এবং এফসির ঊর্ধ্বসীমা বি১ থেকে বি২-তে নামানো হয়েছে।
