রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের হাজারতম দিনে এসে বড় একটি সিদ্ধান্তের কথা জানায় যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ওই দিন তার দেশ থেকে পাঠানো অস্ত্র দিয়ে রাশিয়ার ভূমিতে হামলার অনুমোদন দেন। এরপরই গত মঙ্গলবার ইউক্রেন রাশিয়ায় মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছিল। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র কিছু বিতর্কিত ভূমিমাইনও দিয়েছে ইউক্রেনকে। বিষয়টি নিয়ে সে সময় থুকই কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। এরপর যুক্তরাজ্যে তৈরি স্টর্ম শ্যাডো মিসাইল দিয়ে রাশিয়ায় হামলা করে ইউক্রেন। এরপরই পুতিন পারমাণবিক হামলারও হুমকি দেন। বলেন, ইউরোপের যেকোনো দেশই তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্য হতে পারে। ইতিমধ্যে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালায় নতুন ধরনের অস্ত্র দিয়েছে। পুতিন বলেছেন, আরও নতুন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করবে তাদের সেনাবাহিনী।
গেল কয়েক দিন ধরেই বিষয়টি নিয়ে উত্তেজনা চলছে উভয়পক্ষের মধ্যে। অনেকেই বলছেন, এই উত্তেজনা বিশ্বকে আরও বড় যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। শুধু তাই নয়, ইউরোপের অনেক দেশের নেতারা বলছেন, দুপক্ষের মধ্যকার চলমান এই উত্তেজনা যুদ্ধ আরও কয়েকটি দেশে বিস্তৃত করতে পারে।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক বলেছেন, যুদ্ধ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং এতে বৈশ্বিক দ্বন্দ্বের সত্যিকার ঝুঁকি আছে। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান বলেছেন, পশ্চিমাদের উচিত ভøাদিমির পুতিনের সতর্কতাকে গুরুত্ব দেওয়া। কারণ, রাশিয়া সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করেই তার নীতি ঠিক করে। আর উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বলে উল্লেখ করেছেন।
এর মধ্যে গত শুক্রবার ভøাদিমির পুতিন বলেছেন, তাদের হাতে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত শক্তিশালী নতুন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ আছে। ইউক্রেনের নিপ্রো শহরে নতুন করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার একদিন পর তিনি এমন মন্তব্য করলেন। এক অনির্ধারিত টেলিভিশন ভাষণে তিনি বলেন ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্রকে বাধা দেওয়া যায় না।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি পুতিনকে সমুচিত জবাব দেওয়ার জন্য বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন, যাতে করে তিনি তার কর্মকাণ্ডের সত্যিকার পরিণতি অনুধাবন করতে পারেন। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, তিনি ইউক্রেনের জন্য পশ্চিমাদের কাছ থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চেয়েছেন। বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্স-ইউক্রেন জানিয়েছে, কিয়েভ যুক্তরাষ্ট্রের টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) চেয়েছে বা প্যাট্রিয়ট অ্যান্টি ব্যালিস্টিক মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমের মান উন্নত করার প্রস্তাব দিয়েছে।
তবে শুক্রবারের ওই ভাষণে পুতিন বলেছেন, ওরেশনিক হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের চেয়ে ১০ গুণ বেশি গতিতে উড়ে যেতে পারে এবং তিনি এর উৎপাদনের নির্দেশ দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার নিপ্রোতে যে হামলা হয়েছে তাকে প্রত্যক্ষদর্শীরা অস্বাভাবিক বলে আখ্যায়িত করেছে এবং এর ফলে যে বিস্ফোরণ হয়েছে তা তিন ঘণ্টা পর্যন্ত চলছিল। ক্ষেপণাস্ত্রসহ ওই হামলা ছিল খুবই শক্তিশালী এবং হামলার পর ইউক্রেনের কর্মকর্তারা বলছেন, এটা ছিল আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো। রিস্ক অ্যাডভাইজরি কোম্পানি সিবিলাইন এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও জাস্টিন ক্রাম্প বিবিসিকে বলেছেন, মস্কো সতর্কতা হিসেবে ওই হামলা করে থাকতে পারে। তার মতে যে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে তা এত দ্রুতগামী ও আধুনিক যে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাকে মারাত্মকভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। রাশিয়া ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে সর্বাত্মক আগ্রাসন শুরু করেছিল। এখন আগামী জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে উভয় দেশ নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থানে দেখতে চাইছে। ট্রাম্প যুদ্ধ বন্ধ করার কথা বলেছেন। কিন্তু কীভাবে করবেন সেটি এখনো বলেননি।
এদিকে মস্কো নতুন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর চীন যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তার সমালোচনা করেছেন জেলেনস্কি। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সব পক্ষকে শান্ত থাকতে ও সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। তিনি একই সঙ্গে নিপ্রো হামলার পর নিরাপত্তা ইস্যুতে ইউক্রেন পার্লামেন্টের অধিবেশন স্থগিত করারও সমালোচনা করেছেন।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডনাল্ড টাস্ক বলেছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি থেকে দেখা যাচ্ছে হঠাৎ করে বৈশ্বিক সংঘাত শুরু হয়ে যাওয়ার বাস্তব ঝুঁকি বিরাজ করছে। তিনি বলেন, গত কয়েক ঘণ্টায় ঘটে যাওয়া সব ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে যে, বৈশ্বিক সংঘাতের প্রসঙ্গে বলতে গেলে এ হুমকি খুবই গুরুতর এবং বাস্তব।
সব মিলিয়ে যুদ্ধ আরও বড় পরিসরে হতে পারে সে আশঙ্কার কথা আর অমূলক নয়। পুতিন যেমন বলেছেন ইউক্রেন মার্কিন ও ব্রিটিশ অস্ত্র হামলা চালানোর মুহূর্ত থেকেই যুদ্ধ আঞ্চলিক থেকে বৈশ্বিক রূপ নিয়েছে। আর জেলেনস্কি রাশিয়ার এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে উত্তেজনা আরেক ধাপ বৃদ্ধি বলে অভিহিত করেছেন।
