মহারাষ্ট্রে বড় জয় বিজেপির, বিরোধীরা কেন ব্যর্থ?

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৪:১৭ পিএম

ভারতের দুই রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট হয়ে গেছে। মহারাষ্ট্রে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছে। ঝাড়খণ্ডে অবশ্য ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা ও কংগ্রেসের জোটই আবার ক্ষমতায় ফিরছে।

মহারাষ্ট্রের বিধানসভা ভোটের ফলাফল অনুযায়ী পাওয়া গেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে ২৮৮টি আসনের মধ্যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ২৩৬ টি আসন আর শিবসেনা (উদ্ভব ঠাকরে)-এনসিপি-কংগ্রেসের জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন।

মে মাসে অনুষ্ঠিত লোকসভা নির্বাচনে বিরোধী জোট মহা বিকাশ আঘাদি মহারাষ্ট্রের মোট ৪৮টি আসনের মধ্যে ৩০টি আসন জিতেছিল। মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যেই চিত্রটা সম্পূর্ণ পাল্টিয়ে গেল।

মহারাষ্ট্রে বিজেপির জয় যত চমকপ্রদ, ততটাই বিস্ময়কর ইন্ডিয়া জোটের বিপর্যয়। গত জুনে লোকসভা ভোটে কংগ্রেসসহ ইন্ডিয়া জোট চমৎকার ফল করলেও বিধানসভা ভোটে তারা ধরাশায়ী।

মহারাষ্ট্রে পাঁচ মাসেই ছবি বদল

লোকসভা ভোটের ফলাফল দেখে অনুমান করা হচ্ছিল, বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ও তার নেতৃত্বাধীন ‘মহায়ুতি’ জোটকে বড়সড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। কিন্তু ভোটের ফল বের হওয়ার পরে দেখা যাচ্ছে যে হয়েছে তার বিপরীত।

বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট বিপুল সংখ্যক আসন নিয়ে জিতেছেই, বিজেপি একাই রাজ্যের বৃহত্তম দল হিসাবে উঠে এসেছে। ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়ে গেছে যে সম্ভবত মুখ্যমন্ত্রীর পদটা তাদের থেকেই কেউ হবেন।

কিন্তু গত পাঁচ মাসে এমন কী হল যাতে বিজেপির ফলাফল পুরোপুরি ঘুরে গেল?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার বিজেপি নেতৃত্বাধীন ‘মহায়ুতি’ জোট লোকসভা নির্বাচনের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছে। যার দরুন তারা অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি বা ওবিসি ভোটারদের নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করেছিল।

উত্তর মহারাষ্ট্রে, যেখানে সবথেকে বেশি পেঁয়াজ চাষ হয়, সেখানে কৃষকরা পেঁয়াজ রপ্তানির উপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন। সরকার তাদের জন্য স্পষ্ট নীতি ঘোষণা করেছে।

বিশেষ করে 'লাডলি বহিন যোজনা' প্রকল্পটি এক কথায় ‘গেম চেঞ্জার’ বা খেলা ঘুরিয়ে দেওয়ার কাজ করেছে। ওই প্রকল্পের অধীনে প্রতি মাসে নারীরা ১৫০০ টাকা পেয়ে থাকেন। যেসব পরিবারের বার্ষিক আয় আড়াই লক্ষ টাকার কম, সেরকম পরিবারের ২১ থেকে ৬০ বছর বয়সী নারীরা এই প্রকল্পের সুবিধা পান।

নারীদের মাসে মাসে কিছু টাকা পাইয়ে দিয়ে অর্থনৈতিক দিক থেকে স্বনির্ভর করে তুলতে প্রথমবারের মত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘লক্ষ্মীশ্রী’ নামে এরকম প্রকল্প চালু করেন। জুনে লোকসভা ভোটে খারাপ ফলাফল করার পর গত জুলাইয়ে এই যোজনা চালু করেন মুখ্যমন্ত্রী শিন্ডে।

নভেম্বরে ভোটের আগে এই অর্থ নিয়মিত নারীদের ব্যাংক হিসাবে দেওয়া হয়। অভিযোগ, সে কারণে হরিয়ানার সঙ্গে মহারাষ্ট্রের ভোট করানো হয়নি। এ প্রকল্প নারীদের সমর্থন ঢেলে দিয়েছে মহায়ুতিকে। এর মোকাবিলায় বিরোধী ইন্ডিয়া জোট কিছু করতে পারেনি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, লাডলি বহিন যোজনা, হিন্দুত্ব ও বিভিন্ন জাতের ভোটারদের ঐক্যবদ্ধ করার কৌশলই বিজেপিকে এই সাফল্য এনে দিয়েছে। লোকসভা নির্বাচনের পরেই 'লাডলি বহিন যোজনা' চালু করা হয়, যাতে আড়াই কোটি নারীর অ্যাকাউন্টে চার মাসের টাকা একসঙ্গে চলে আসে। এর পাশাপাশি 'বাটেঙ্গে তো কাটেঙ্গে’ যে স্লোগান তুলেছিল তারা, তার ফলে হিন্দু ভোট কিছুটা হলেও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।

এর প্রভাব পড়েছে এখানকার বৌদ্ধ ও দলিত ভোটে। প্রায় নয় থেকে ১০ শতাংশ বৌদ্ধ ভোট বিরোধী ‘মহা বিকাশ আঘাদি’র দিকে গিয়েছে। মারাঠা-দলিত ভোট সুসংহত করার পাশাপাশি মুসলিমদের ভোটও বেড়েছে।

বিরোধীরা কেন ব্যর্থ?

মহারাষ্ট্র নির্বাচনে বিরোধী ‘মহা বিকাশ আঘাদি’ জোটে ১০১টি আসনে লড়েছিল কংগ্রেস। লোকসভা ভোটের ফলের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে বিধানসভায় বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে আসবে বলে তারা আশা করেছিল। কিন্তু ফলাফল বের হওয়ার পরে দেখা যাচ্ছে বিরোধী জোটের রথী মহারথীরাও পরাজিত।

কোথায় ভুল ছিল তাদের?

বিশ্লেষকরা বলছেন, মহায়ুতি সরকার ১৫০০ টাকার লাডলি বহিন প্রকল্প চালুর সময় মহা বিকাশ আঘাদি তার সমালোচনা করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে মহা বিকাশ আঘাদি নিজেই তাদের নির্বাচনি ইস্তেহারে তিন হাজার টাকা দেওয়ার একটা প্রকল্পের কথা বলে।

বিশ্লেষকদের মতে, মহা বিকাশ আঘাদির দলগুলিতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজের অভাব। এর ফলে কংগ্রেস-শিবসেনায় মতানৈক্য দেখা দেয়।

এছাড়া মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনের সময় 'বান্টেগে তো কাটেঙ্গে', অর্থাৎ ভাগ হলেই আক্রমণ আসবে – এই স্লোগানটি খুব শোনা গেছে। একই সঙ্গে 'এক হ্যায় তো সেফ হ্যায়', অর্থাৎ এক থাকলেই সুরক্ষিত থাকবেন - এই স্লোগান দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজে।

এই দুটি স্লোগানই ছিল হিন্দুদের উদ্দেশ্য করে দেওয়া, যাতে হিন্দু ভোট একজোট হয়ে যায়। আর এগুলো ছিলো বিজেপির রাজনৈতিক কৌশলের জিত। মহারাষ্ট্র বিধানসভার নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদীর নীতিসমূহ এবং তার জনপ্রিয়তাকেও বিজেপি ভালই ব্যবহার করেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত