চোখেই পড়ে না ১৯২ কোটির কাজ

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২৪, ০৭:১৬ এএম

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সেচ বিভাগের অধীনে ‘মুজিবনগর সেচ উন্নয়ন প্রকল্পে’ বরাদ্দ টাকার সিংহভাগই নয়ছয়ের অভিযোগ উঠেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৪৮ কোটি টাকার প্রাক্কলন ব্যয় ধরে অনুমোদিত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের নামে গত চার বছরে ১৯২ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে। প্রকল্পের অগ্রগতি দেখানো হয়েছে ৭৫ শতাংশ। তবে মাঠচিত্রে এই ‘কাগুজে কর্মকা-ের’ সিংহভাগের কোনো অস্তিত্ব নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি তদন্তের দাবিতে দুর্নীতি দমন কমিশনে একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। নিজ পছন্দের ঠিকাদার সিন্ডিকেট, প্রকল্প পরিচালকের যোগসাজশে কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা জেলার পলাতক তিন সংসদ সদস্যের কারসাজিতে এই অর্থের বেশিরভাগই আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অবশ্য প্রকল্প পরিচালক এ অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন।

প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে অতিউর্বর মাটির জেলা কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর অঞ্চলকে বিশেষ বিবেচনায় নেওয়া হয়। এই অঞ্চলের প্রায় সাড়ে ২১ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে নিষ্কাশন সুবিধাসহ সেচব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে বিএডিসি। এতে সুবিধা সৃষ্ট জমিতে প্রতি বছর ৫১ হাজার টন ধান, গম, ভুট্টাসহ খাদ্যশস্য উৎপাদনের লক্ষ্যে গৃহীত হয় প্রকল্পটি। ২৪৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকার প্রাক্কলন ব্যয় ও পাঁচ বছর বাস্তবায়নকাল ধরে অনুমোদন লাভ করে ‘মুজিবনগর সেচ উন্নয়ন প্রকল্প’। প্রকল্প বাস্তবায়নের খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে, ১৩০টি সৌরচালিত ডাগওয়েল নির্মাণ; যার প্রতিটি নির্মাণ ব্যয় ১২লাখ টাকা, প্রতি কিলোমিটার ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৮০ কিমি খাল পুনঃখনন, ২৫৫টি পাম্প হাউজ নির্মাণ; যার প্রতিটির ব্যয় ১৫ লাখ টাকা, ৯৫টি ২ কিউসেক ফোর্সমোড পাম্প সেট স্থাপন; যার প্রতিটির ব্যয় ১৫ লাখ টাকা, ৫ কিউসেক সোলার পাম্প ২৫টি; যার প্রতিটি নির্মাণ ব্যয় ১৫ লাখ টাকা, ১৫টি বড় আকারের সেচ অবকাঠামো; যার প্রতিটিতে ব্যয় ৪০ লাখ টাকা, ১২০টি মাঝারি আকারের সেচ অবকাঠামো; যার প্রতিটি ব্যয় ২৫ লাখ টাকা, ৩০০ ছোট আকারের সেচ অবকাঠামো; যার প্রতিটির ব্যয় সাড়ে ৭ লাখ টাকা এবং ২১৫টি বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ; যার প্রতিটি নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ টাকা।

কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই উন্নয়ন প্রকল্পটি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে টেন্ডার সিন্ডিকেটসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বরাদ্দকৃত টাকা কাগুজে বিল ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ ও হরিলুটের অভিযোগ উঠেছে। অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিপুল অঙ্কের রাষ্ট্রীয় টাকা আত্মসাতের ঘটনা তদন্ত করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে (চলতি) প্রকল্পের বাকি অংশের বাস্তবায়নে ৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ের স্বচ্ছতার ভিত্তিতে সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা।

কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা ঠিকাদার হাজি বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘আমরা ১০ বছর ধরে বিএডিসির লাইসেন্সধারী ঠিকাদার, দরপত্র আহ্বান করলে আমরা সেখানে অংশগ্রহণের যোগ্যতা রাখি। কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর জেলা হলো এই প্রকল্পাধীন এলাকা। সে কারণে এই তিন জেলার ঠিকাদারই এখানে টেন্ডারে অংশ নিতে পারেন, কিন্তু ১৫ বছর ধরে এই তিন জেলার প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের মদদে গড়ে উঠা সিন্ডিকেটের কারণে তাদের পছন্দের হাতেগোনা কয়েকজন ঠিকাদার ব্যতীত আর কোনো ঠিকাদারই টেন্ডারে অংশ নিতে পারেননি। আমাদের কাছে অসংখ্য তথ্য-প্রমাণ আছে, তারা ওয়ার্ক-অর্ডার পাওয়ার পর একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা পার হওয়ার পর থেকে কাজ না করেই বিল ভাউচার করে টাকা তুলে নিয়েছে প্রকল্প পরিচালকের যোগসাজশে।

এই প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে তার যথাযথ তদন্তের দাবি করেছেন মেহেরপুর পৌর এলাকার শাখাওয়াত আরেফীন। তিনি তার আবেদনে উল্লেখ করেছেন, ‘তদন্তে সত্যতা পাওয়া সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আত্মসাৎ করা রাষ্ট্রীয় টাকা উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

একইভাবে দুদকে পাঠানো একাধিক লিখিত দরখাস্তে এই প্রকল্পের টাকা কীভাবে আত্মসাৎ ও হরিলুট করা হয়েছে তার বর্ণনা উঠে এসেছে। এর মধ্যে প্রকল্প পরিচালকের যোগসাজশে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান একই কাজ দুবার বা তিনবার দেখিয়ে ভুয়া বিল ভাউচার করে কাগজে-কলমে প্রকল্প বাস্তবায়ন দেখিয়ে ওই খাতের টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ জমা পড়েছে দুদকে। এ ছাড়া প্রকল্প পরিচালক মনোনীত ঠিকাদারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভুয়া কোটেশনে কাজ দেখিয়ে তার বিল ভাউচার করে টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ঘুষ, কমিশন-বাণিজ্যও হয়েছে।

এ বিষয়ে মুজিব নগর সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক আলী আশরাফ অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। অনেকটা চ্যালেঞ্জের সুর কথা বলেন ও দাবি করেন এই প্রকল্পে যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে পূর্ববর্তী প্রকল্প পরিচালকের সময় হয়ে থাকতে পারে।

তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। আপনাদের কাছে কোনো অভিযোগ থাকলে তা উল্লেখ করে সংবাদ প্রকাশ করেন, আমি আমার কায়দায় পারলে বাইরাইবো, না পারলে গেলামগা।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত