জানিয়ারিতেই ঢাকায় চালু হচ্ছে পূর্ব ইউরোপের সম্ভাবনাময় দেশ রোমানিয়ার শ্রম কনস্যুলার মিশন অফিস। অফিস স্থাপন হয়ে গেলে হাজার হাজার ভিসাকাক্সক্ষী রোমানিয়াগামী কর্মীকে আর দিল্লিতে ভিসার জন্য ছুটতে হবে না। কমবে দুর্ভোগও। সাশ্রয় হবে অভিবাসনে ব্যয়ের টাকা। গত বছর জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর সাবেক একজন মহাপরিচালকসহ একাধিক কর্মকর্তার অনৈতিক প্রস্তাবের কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে রোমানিয়া সরকারের নির্দেশে ৬ সদস্যের অস্থায়ী ভিসা মিশন অফিস গুটিয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিল।
রোমানিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাস ও বাংলাদেশ কমিউনিটি সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পূর্ব ইউরোপের দেশ রোমানিয়ার শ্রমবাজারে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করার সুযোগ পায়। এখন নানা কারণে বাংলাদেশিদের অবস্থান তিন নম্বরে আছে। যদিও রোমানিয়া সরকার বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসা ইস্যুর কার্যক্রম আরও সহজ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশে ৬ জন কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি অস্থায়ী ভিসা অফিস খুলেছিল কাকরাইলের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে। ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে ভিসা দেওয়া শুরুর এক পর্যায়ে অস্থায়ী ভিসা ইস্যু অফিস বন্ধ করে তারা দিল্লিতে চলে যান। এরপর শুরু হয় শ্রমিকদের ভোগান্তি। ভিসা না পাওয়া কর্মীদের লাখ লাখ টাকা এজেন্সি মালিকদের পকেটে আটকে যায়। বেশিরভাগ শ্রমিক এখনো তাদের জমা দেওয়া টাকা তুলতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
দীর্ঘদিন পর রোমানিয়া সরকার তাদের শ্রমিক ঘাটতি অনুভব করতে পেরে আবারও বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার লক্ষ্যে ভিসা অফিস স্থাপনে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে রোমানিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবকিছু ঠিক থাকলে রোমানিয়াগামী শ্রমিকদের ভিসা ইস্যুর কার্যক্রম আগামী বছরের জানুয়ারি মাস থেকেই শুরু হবে। যদি কোনো কারণে দেরি হয় তাহলে পরের মাসে হবে। নিয়োগকর্তাদের চাহিদার বিপরীতে রোমানিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশে ভিসা মিশন অফিসের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি প্রতিনিধি পাঠাতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আগের ইস্যু হওয়া মেয়াদোত্তীর্ণ ওয়ার্ক পারমিটগুলো ১৫ জানুয়ারি থেকে ১২৫ ইউরো ফি দিয়ে নবায়ন করার জন্যও রোমানিয়ান নিয়োগকর্তাদের এক বার্তার মাধ্যমে বলা হয়েছে। আগে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ঢাকায় ভিসা অফিস পরিচালনা করা হলেও এবার আইএলওর মধ্যস্থতায় ঢাকায় বিশেষ ভিসা সেন্টার দিয়ে কাজ করা হবে বলে রোমানিয়া সরকার নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি গত দুই বছর ধরে রোমানিয়ায় আবেদন করে বসে থাকা কর্মীদের বিষয়গুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুনর্বিবেচনারও নির্দেশ দিয়েছে রোমানিয়ার অভিবাসন মন্ত্রণালয়। এ জন্যই আগের ইস্যু করা ওয়ার্ক পারমিটগুলো নবায়ন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে নিয়োগকর্তাদের। জনশক্তি রপ্তানিকারকরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য এটি আবারও একটি সুযোগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। কারণ প্রায় ২০ হাজারের মতো বাংলাদেশি কর্মী আবেদন করার পরও ভিসা পাননি। অনেকে টাকা দিয়ে দিনের পর দিন অপেক্ষায় থেকেও রোমানিয়ায় যেতে পারেননি। এবার তাদের সমস্যাগুলো সমাধানের সুযোগ এসেছে। তবে সবাইকে এবার সতর্ক থাকতে হবে।
রোমানিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত দাউদ আলী বলেন, ‘আমার দেশের সরকারের সার্বিক সহযোগিতায় আমি রোমানিয়া, বুলগেরিয়াসহ আমার দায়িত্বপ্রাপ্ত ৪টি দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের আসার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছি। কিন্তু আমাদের শ্রমিকরা দালাল দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার কারণে এসেই ইতালি, জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পালিয়ে যাচ্ছেন। পালানোর কারণেই রোমানিয়া সরকার এখন কর্মী নিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। যদি কর্মী পালানো ঠেকানো যায় তাহলে অনেক শ্রমিকের এ দেশে এসে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।’
রোমানিয়া দূতাবাসের শ্রম কাউন্সেলর বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা নিজের পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন, ‘আমরা যতটুকু খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, বাংলাদেশি শ্রমিকদের দিল্লিতে গিয়ে ভিসা পেতে সমস্যা হচ্ছে। এটি রোমানিয়া সরকার জানে। এই পরিপ্রেক্ষিতে রোমানিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঢাকায় আন্তর্জাতিক কোনো একটি ভিসা সেন্টারের সহযোগিতায় রোমানিয়া ও বুলগেরিয়াগামী কর্মীদের ভিসা ইস্যুর কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। সেটি আগামী বছরের জানুয়ারিতে হতে পারে।
এক প্রশ্নের উত্তরে ওই কর্মকর্তা বলেন, রোমানিয়া সরকার সিদ্ধান্ত নিলেও তাদের পার্লামেন্টে এ সংক্রান্ত বিল পাস না হওয়ার আগ পর্যন্ত ভিসা অফিস খোলার সুযোগ নেই। তাই পার্লামেন্টে অফিস খোলার বিলটি পাস হওয়া পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
গতকাল শুক্রবার একাধিক জনশক্তি রপ্তানিকারক ঢাকায় অস্থায়ী ভিসা অফিসটি কাদের কারণে চলে গেছে সে ব্যাপারে বলেন, ‘বিএমইটির আগের মহাপরিচালক শহীদুল হকসহ কয়েকজন কর্মকর্তা রোমানিয়ার অস্থায়ী ভিসা অফিসের কতিপয় কর্মকর্তার কাছে জনপ্রতি এক লাখ টাকা করে দাবি করেছিলেন। এটা মানতে না পেরে তারা অফিস গুটিয়ে দিল্লি যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।’
