স্বামী-সন্তান নিয়ে সংসারধর্মই ছিল তার সব। রাজধানীর মগবাজারের একটি বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজে শিক্ষকতা করতেন তিনি। এর সুবাদেই তার নামের আগে যুক্ত হয় অধ্যাপিকা অভিধাটি। ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। জড়িত হন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে একাধিবার এমপি হয়েছেন।
সাবলীল কথাবার্তায় কাছে টেনে নিয়েছিলেন দলের নেতাকর্মীদের। ভালো ব্যবহার তাকে করে তুলেছিল সবার ‘আপা’। তবে তার ভিন্নরূপ প্রকাশিত হয় আওয়ামী লীগের টানা ক্ষমতার সময়। তিনি মুন্সীগঞ্জ-২ আসনের আওয়ামী লীগের একাধিকবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য; তার নাম অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি।
‘সাগুফতা আপা’র বিরুদ্ধে অবৈধ বালু উত্তোলন, বিসিএস ক্যাডারসহ নানা চাকরির সুপারিশ ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নৌকা প্রতীক পাইয়ে দিয়ে বিস্তর টাকা কামানোর অভিযোগ রয়েছে। উপঢৌকন হিসেবে জমি, গাড়ি নেওয়ার ও সরকারি দপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পের কাজের নিয়ন্ত্রণ করে টেন্ডারবাণিজ্য করার অভিযোগও রয়েছে।
৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলির অপকর্মের নানা তথ্য বেরিয়ে আসে। জাতীয় সংসদের এই সাবেক হুইপ ও সংসদ সদস্যের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার শামুর বাড়ি গ্রামে। তার বাবা নুরুল ইসলাম খান স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জামালউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলির স্বামীর নাম ইমদাদুল হক। এমিলি ১৯৭৮ সালে ধানম-ি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৮০ সালে হলিক্রস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৮৪ সালে তিনি ভূগোল ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিষয়ে স্নাতক এবং ১৯৮৬ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
১৯৯৬ সালে মুন্সীগঞ্জ থেকে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হন সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান তিনি। এ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী মিজানুর রহমান সিনহার কাছে পরাজিত হন। ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও সর্বশেষ ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
এ অভিযোগও আছে, মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার পদ্মা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের নিয়ন্ত্রণ ছিল সংসদ সদস্য সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলির হাতে। তার নির্দেশে উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রশিদ সিকদার ও কুমারভোগ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সেলিম দেওয়ানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে বালু উত্তোলনের সিন্ডিকেট। ওই সিন্ডিকেট বালু উত্তোলনের প্রতিটি ড্রেজার ও বালু বহনকারী বাল্কহেডের তালিকা বানাত। আর সাগুফতা এমিলির কাছে চলে যেত নির্ধারিত মাসোহারার টাকা।
জানা গেছে, স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে পছন্দের চেয়ারম্যান প্রার্থীকে নৌকা প্রতীক পাইয়ে দিয়ে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন এমিলি। শুধু টাকা নয়, নিতেন জমি-গাড়িও। উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের এক চেয়ারম্যান প্রার্থীর কাছ থেকে শিমুলিয়াঘাট এলাকার ৩৫ শতাংশ জমি লিখে নিয়েছেন তিনি। এক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেই উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীকে নৌকা প্রতীক পাইয়ে দিয়ে প্রায় ৩০ কোটি টাকা কামিয়েছেন সাগুফতা আপা।
অভিযোগ আছে, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অধিদপ্তর ও উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রতিটি প্রকল্পে তার জন্য রাখা হতো নির্ধারিত হারে চাঁদার টাকা। তাকে টাকা না দিলে কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টেন্ডার পেত না। টেন্ডারবাণিজ্যে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল সাগুফতা এমিলির।
পদ্মার তীরে লৌহজং থেকে টঙ্গীবাড়ি উপজেলা পর্যন্ত ৪৪৬ কোটি টাকার স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে ২৯ কোটি টাকা নিয়ে পছন্দের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। খুলনার মোংলায় তার নামে রয়েছে শত শত বিঘা জমি। অধুনালুপ্ত মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে তার নামে চলত কয়েকটি স্পিডবোট। এ নৌরুটের ইজাদারের কাছ থেকে মাসিক চাঁদার টাকাও পেতেন তিনি।
পুলিশ নিয়োগে, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের চাকরিতে সুপারিশ করতেন সাগুফতা আপা। গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর গণভবন থেকে তার সিল ও স্বাক্ষরযুক্ত চাকরির সুপারিশের কাগজপত্র উদ্ধার করে ছাত্র-জনতা।
সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলির জমিজমা ও সম্পদ বেড়েছে। নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী, ২০০৮ সালে নির্বাচনের আগে এমিলির কোনো জমিজমা ছিল না। সংসদ সদস্য হওয়ার পর ২০১৪ সালে ৩৯ দশমিক ৫ শতাংশ জমি ও ৫ কাঠা প্লটের মালিক হন এমিলি।
জানা গেছে, সাগুফতা এমিলির নিজের নামে ৮৪ লাখ ১২ হাজার ৪৫২ টাকা মূল্যের দালান বাড়ি ও তার স্বামীর নামে ২৩ লাখ ২১ হাজার টাকা মূল্যের দুটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। ২০১৪ সালে এমিলি নিজের নামে ৬০ লাখ ৯৯ হাজার ৭৮৮ টাকা মূল্যের ল্যান্ডক্রুজার গাড়ি কেনেন। ২০১৮ সালে তিনি মডেল বদলে ৭১ লাখ টাকায় কেনেন ল্যান্ডক্রুজার ভি-৮ গাড়ি।
