পারস্পরিক প্রকাশ্য কঠিন দোটানার সময়ে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রির ঢাকা সফর। শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল জানিয়েছেন, দুদেশের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থ-সম্পর্কিত নানাবিধ বিষয়ে মিশ্রির কথা হবে। শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের শপথের পর এটিই প্রথম দিল্লির কোনো কূটনীতিকের ঢাকা সফর। এ নিয়ে দুদিকেই কিছু আশাবাদের কথা রয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলম বলেছেন, বিক্রম মিশ্রির সফরের মাধ্যমে চলমান অস্থিরতার নিরসন হবে। ভারতের দিক থেকে কথা পরিষ্কার নয়। ঢাকায় ভারত-বাংলাদেশের ‘ফরেন অফিস কনসালটেশন’-এফওসি আলোচনায় যোগ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে রণধীর জয়সোয়াল বলেছেন, এফওসির বৈঠক ‘স্ট্রাকচার্ড’ বা কাঠামোগত। ঢাকা অবস্থানের সময় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিক্রম মিশ্রির বৈঠক হবে কি না, সে বিষয়টিও শুক্রবার পর্যন্ত স্পষ্ট করেননি তিনি। বরং অতিকূটনীতি করে বলেছেন, এফওসির বৈঠক ছাড়াও আরও অনেকের সঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব মিশ্রির কথা হবে। কথা পরিষ্কার না করা ভারতীয় কূটনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
সর্বশেষ বার্ষিক এফওসি হয় দিল্লিতে, গত বছরের ২৪ নভেম্বর। এবার ঢাকায়। এবার প্রেক্ষিতও ভিন্ন। এফওসি বৈঠকে যোগ দিতে বিক্রম মিশ্রির ঢাকা সফরটি নিয়মিত ব্যাপার হলেও এর ভিন্নতা না থেকে পারে না। চলমান অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে তার সফরের রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। সচরাচর দুই দেশের বহুমাত্রিক সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় ওঠে এফওসিতে। এর বাইরেও আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক আলোচনাও হয়। নতুন সরকার আমলে এটি ভারতীয় কোনো কূটনীতিকের প্রথম ঢাকা সফর হলেও সাক্ষাৎ বা কথাবার্তা যে হয়নি, এমন নয়। এর আগে, জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে তথা বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার পর, গেল সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্কে আমাদের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে কথা হয় ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের। এখন সচিব পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত কিছু হোমওয়ার্ক সেরে নিয়েছে। ভারতের সঙ্গে এফওসির প্রস্তুতির মধ্যেই এই অঞ্চলের সব দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসকে দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র সচিব মো. জসীম উদ্দিন এক ভার্চুয়াল বৈঠকে মিশন প্রধানদের এ নির্দেশনা দেন।
বৈঠকটি নিয়ে ঢাকার এ প্রস্তুতির মধ্যেও ভারতের নানা তৎপরতায় বাংলাদেশে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। কিন্তু দমছে না ভারত। দমও নিচ্ছে না। কোনো না কোনো ইস্যুতে প্রতিবন্ধকতা পাকাচ্ছেই। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পাকানোর চেষ্টাও চলছে বলে অনেকে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ড. ইউনূসের সরকারকে ব্যর্থ করার যত আয়োজন আছে একটিও বাদ দিচ্ছে না। এর অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনকে প্রভাবিত করতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত কয়েক মার্কিনি এরইমধ্যে একাট্টা হয়েছেন। জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় বসার পর তারা সেই অভিযাত্রায় নামবেন। ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন জনগোষ্ঠীর প্রভাবশালী নেতা চিকিৎসক ভরত বড়াই তা আরেকটু পরিষ্কার করে দিয়েছেন। বার্তা সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভরত বড়াই ‘বাংলাদেশি হিন্দুদের ওপর দমন-পীড়নের’ কথিত অভিযোগের কথা নির্বাচনের আগেই ট্রাম্পকে দিয়ে বলাতে পারায় যারপরনাই স্বস্তি তার। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে গোলমাল বাধানোর আশাও দেখছেন ভরত বড়াই। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের এমন নিদারুণ পতন ও পলায়ন ভারতের কাছে ছিল কল্পনা বা দুঃস্বপ্নেরও বাইরে। সেই জ্বালা মেটাতে বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র প্রমাণ করার বিশাল দায়িত্ব ভারতের কাঁধে।
নিষ্ঠুর বাস্তবতা হচ্ছে, ভারতের চারপাশে বন্ধুভাবাপন্ন দেশ নেই। বাংলাদেশসহ আশপাশের দেশগুলোকে হেয় করা, একটা ঘটনা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখা, এটা নিয়ে ষড়যন্ত্র করা যেন দেশটির মিশন। নেপাল, মালদ্বীপ নিকট অতীত, অনেকেরই মনে থাকার কথা। গুজব-উত্তেজনা ছড়ানোর বিষয়ে অক্লান্ত খাটছে মোদি সরকারের একনিষ্ঠ ভারতীয় মিডিয়াগুলোও। প্রায় প্রতিদিনই তাদের কোনো না আয়োজন থাকছে বাংলাদেশ ও অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর নরেন্দ্র মোদি এবং তার সরকার ও দলের কয়েক ব্যক্তি বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন করা হচ্ছে বলে একের পর এক বিবৃতি দিয়ে আসছেন, যা শেখ হাসিনার কথারই প্রতিধ্বনি। বাংলাদেশের দিক থেকে কড়া প্রতিবাদ জানানো হলেও ভারত এ অবস্থা থেকে সরছে না। কোনো সীমা টানছে না। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন ভেরিফায়েড পেজ থেকেও চালানো হচ্ছে নানা প্রপাগান্ডা। পুরনো এবং ভিন্ন জায়গার ছবি প্রকাশ করে দেওয়া হচ্ছে ধর্মীয় উসকানি।
নেপাল, মালদ্বীপ, ভুটান, শ্রীলঙ্কাসহ আশপাশে খবরদারি ফলাতে পারছে না ভারত। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর ১১ তারিখে পেন্টাগনে হামলা এবং নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধ্বংস হওয়ার পর মুসলিম দেশগুলোকে যখন যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসী তকমা দেয় তখন স্নায়ুযুদ্ধে পরাজিত ভারত দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম দেশ পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং মালদ্বীপকে সন্ত্রাসী দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করে আঞ্চলিক শক্তি হওয়ার স্বপ্ন দেখতে থাকে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় নতুন স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো ভারতের হাতছাড়া হয়ে যায়। এরপর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেমে আসে আরও বিপর্যয়। ভারত তখন পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনে তা এখন এনেছে কানাডার বিরুদ্ধে, যা অনেকটা ‘যেমন কর্ম তেমন ফল’ প্রবাদের মতো। আশপাশে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কুলাতে না পেরে ভারতের অবশিষ্ট জায়গা বলতে গেলে কেবল বাংলাদেশই।
বাংলাদেশও এ বাস্তবতা আমলে নিয়েই এগোচ্ছে। হাল ছাড়ছে না একটুও। ভারতকে ছেড়ে কথা বলছে না। দেশের ভেতরে বাইরের ষড়যন্ত্রকে মোকাবিলা করতে হলে জাতীয় ঐক্য গড়ার একটি সূত্রপাতও এরই মধ্যে হয়েছে। ঢাকার মিরপুর সেনানিবাসের ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ কমপ্লেক্সে ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স ও আর্মড ফোর্সেস ওয়ার কোর্স সমাপনী অনুষ্ঠানে ড. ইউনূস সার্টিফিকেট প্রদান শেষে বলেছেন, বর্তমানে বাংলাদেশ কঠিন সময় পার করছে, অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকা প্রয়োজন। এরপর সংলাপে বসেছেন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে। তার এ জাতীয় ঐক্যের ডাক দেওয়ার আলাদা গুরুত্ব ও দৃশ্যমান তাৎপর্য রয়েছে। আধিপত্যবাদী শক্তিকে মোকাবিলা করার জন্য এখন দেশের সবগুলো শক্তির শক্ত সেতুবন্ধন তৈরির তাগিদ আসছিল বিভিন্ন মহল থেকেই। এখন এর কার্যকর বাস্তবায়নের অপেক্ষা। তবে আমরা শান্তি চাই, সমৃদ্ধ ও আগামীর পথে বন্ধুত্বের রাস্তাই আমাদের কাম্য। অবিরাম তিক্ততায় বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের জায়গাটা যেন নষ্ট না হয় ভারতকে তা বুঝতে হবে। দেশের সঙ্গে সম্পর্কের বদলে তারা সম্পর্ক টেনেছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে, শেখ হাসিনার সঙ্গে। এ থেকে তারা যত দ্রুত সরবে ততই মঙ্গল। কিন্তু ভারতের সেই সদিচ্ছাতে ঘাটতি রয়েছে বলে মনে হয়েছে। যে কারণে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক সামনের দিনগুলাতে আরও তিক্ত হওয়ার সমূহ শঙ্কা ভর করেছে। আগরতলায় বাংলাদেশের হাইকমিশনে হামলা, লুট পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে বাংলাদেশ ও ভারতের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি পরিলক্ষিত হয়েছে। চিকিৎসাসেবা ও সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ থেকে শুরু করে দুই দেশে পতাকা পোড়ানো বা পদদলিত করা, বিবৃতি-পাল্টা বিবৃতি, ভিসা বন্ধ বা সীমিত করার ঘটনাসহ সাম্প্রতিক অস্থিরতা বাজে ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক বহুমুখী, এখানে কথা বলার অনেক ক্ষেত্র রয়েছে।’
কূটনীতির মারপ্যাঁচে যত কথাই বলা হোক বাস্তবতাটা ভিন্ন। গত ১৫-১৬ বছর বাংলাদেশে ভারতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নানা স্বার্থরক্ষা করেছে শেখ হাসিনা সরকার। তার ওপর বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে বড় ভূমিকা রাখছে দুই দেশের ধর্মভিত্তিক রাজনীতি। গত নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায় এবং ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো তুলনামূলক ভালো করেছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশে হিন্দু নিপীড়ন করা হচ্ছে, এমন প্রচার চালিয়ে ভারতের জনগণকে আরও বেশি মুসলিমবিদ্বেষী করার এজেন্ডায় নরেন্দ্র মোদির বিজেপি। তারা আগামী নির্বাচন পর্যন্ত এই ইস্যুটি জিইয়ে রাখতে চায়। একইভাবে ভারতীয় কিছু গণমাধ্যমে বাংলাদেশে হিন্দু নিপীড়ন সম্পর্কে ভুয়া ও অতিরঞ্জিত খবর প্রকাশ করছে। যা বাংলাদেশে ভারত-বিরোধিতা আরও বাড়াচ্ছে। ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যের নিরাপত্তা এবং কৌশলগত কারণে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী শক্তিকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না দিল্লি। সেই সমীকরণে ভারতের খাস পছন্দ আওয়ামী লীগ। দলটির সভানেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে বলেছেন, ভারতকে তিনি যা দিয়েছেন, তারা তা আজীবন মনে রাখবে। সেখানে গণআন্দোলনে শেখ হাসিনাকে পালাতে হয়েছে। ভারত ছাড়া দুনিয়ার কোনো দেশ আশ্রয় দেয়নি তাকে। এটি ভারতের জন্য কত কষ্টের তা ভারতই জানে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কোন পথে এগোচ্ছে তা বুঝতে খুব বড় কূটনীতিক বা বিশেষজ্ঞ না হলেও চলে। ফলে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রির এই সফরে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জটিলতা খুব একটা কাটবে বলে মনে হয় না। তবে এ ধরনের সফর, সংলাপ সম্পর্ক ও জটিলতা নিরসনের পথ তৈরিতে সহায়ক বলেই মনে করি। এখন দেখা যাক ঢাকার তেতোমুখ দিল্লির মিছরিতে কতটা মিষ্টি হয়।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট
