ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেছেন, ‘গত ১৫ বছরে পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগের আগে নানাভাবে যাচাই করা হয়েছে। নিয়োগ প্রার্থী কোন দলের, তার বাবা, দাদা এবং আরও পূর্বপুরুষ কোন দল করতেন তার খবর নেওয়া হয়েছে। দুই লাখ পুলিশের মধ্যে ৮০ থেকে ৯০ হাজার পুলিশ সদস্য এভাবে রাজনৈতিক পরিচয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন।’
গতকাল সোমবার রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
মানবিক কারণে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া পুলিশ সদস্যদের বাহিনী থেকে বের করা যায় না উল্লেখ করে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘এই ৮০ থেকে ৯০ হাজার পুলিশ সদস্যকে তো বলতে পারি না গো হোম (বাসায় ফিরে যাও)। তবে যারা দুষ্ট, পেশাদারিত্বের বাইরে গিয়ে নানা অপকর্মে লিপ্ত হয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
জুলাই-আগস্টে ঢাকা মহানগর পুলিশের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে নগরবাসী ও দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চান ডিএমপি কমিশনার। এ সময় তিনি বলেন, ‘বর্তমানে পুলিশ নতুনভাবে মানুষকে সেবা দেওয়ার কাজ শুরু করেছে। এ ঘটনার পর পুলিশ যে পরিমাণ নিষ্ক্রিয় হয়েছিল, সেটা থেকে উত্তরণে সক্ষম হয়েছে। ঢাকাবাসীর সঙ্গে মতবিনিময় করতে একটি প্রোগ্রাম শুরু হয়েছে। আমরা ঢাকাবাসীর মতামত নিয়ে পুলিশের সেবা দিতে চাই। তবে অনেক ক্ষেত্রে ঢাকাবাসীর সহযোগিতা ছাড়া আমাদের পক্ষে কিছুই করা সম্ভব হবে না।’
সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার এক ঘণ্টার মধ্যে ভুক্তভোগী বা অভিযোগকারীর কাছে পুলিশ চলে যাবে। সেই সঙ্গে কোনো ঘটনাই লুকানো যাবে না উল্লেখ করে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘যে ঘটনায় জিডি হওয়া দরকার জিডি হবে, মামলা হওয়া দরকার মামলা হবে। জিডি হলে এক ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ অভিযোগকারীর কাছে যাবে। মামলা হওয়ার মতো ঘটনা হলে থানায় এনে মামলা নেওয়া হবে। আগামী ১০-১৫ দিনের মধ্যে এ কাজটি শুরু হবে।’
জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে যেসব মামলা হয়েছে, তার বেশিরভাগই আদালতের নির্দেশে হয়েছে। এসব মামলায় অভিযুক্ত আসামিদের থেকে পুলিশ মামলাবাণিজ্য করছে এমন অভিযোগ থাকায় ডিএমপির এক উপপরিদর্শককে বরখাস্ত করা হয়েছে। এমনটা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এসব মামলার সব আসামি ঘটনায় জড়িত ছিল না। এখন মামলার বাদী আসামির কাছে গিয়ে টাকা চাইছে। ভয়ের কোনো কারণ নেই, তাদের আমরা গ্রেপ্তার করব না। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে জড়িত থাকার প্রমাণ মিলবে, শুধু তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আসামি করে চাঁদাবাজি করছেন। আবার আমার লোক (পুলিশ) সব যে ভালো তা নয়। তারাও আসামিদের কাছ থেকে নানা ধরনের টাকা আদায়ের চেষ্টা করছেন। এ কাজে লিপ্ত একজনের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
রাজধানীতে এখনো চাঁদাবাজি হয় এবং চাঁদাবাজি রুখতে জনগণকে অগ্রগণ্য ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে কমিশনার বলেন, ‘আপনারা (ঢাকাবাসী) চাঁদা দেবেন না। যারা চাঁদা নিতে আসে, তারা কী করে আমরা (ডিএমপি) দেখতে চাই। চাঁদাবাজির জন্য নিত্যপণ্যের দাম পর্যন্ত বেড়ে যায়। এ ব্যাপারে কাজ করছি। অচিরেই দেখবেন এ ক্ষেত্রে অনেকটা উন্নতি হয়েছে।’
ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত বিশৃঙ্খল জানিয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘যারা রাস্তা ব্যবহার করেন, তারা ট্রাফিক আইন মানতে চান না। গত সরকারের সময়ে অটোরিকশাকে অনুমতি দেওয়ার কারণে হুহু করে অটোরিকশার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অটোরিকশার সংখ্যা যদি রোধ করা না যায়, অচিরেই এমন শহর পাবেন যেখানে বাসা থেকে বের হলেই নড়াচড়ার সুযোগ থাকবে না। তাই আগে যে হারে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের মামলা করা হতো, এখন তার দ্বিগুণ হয়। সরকারের সঙ্গে বিষয়টি আলাপ করে একটি ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনার অনুরোধ করা হয়েছে।’ সেই সঙ্গে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থা সুশৃঙ্খল করতে ঢাকাবাসীর সহযোগিতা চেয়েছেন এ পুলিশ কর্মকর্তা।
রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে জানিয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘আমরা ছিনতাই প্রতিরোধের জন্য ডিবি এবং থানা পুলিশকে সক্রিয় করেছি; যাতে ছিনতাই রোধ করা সম্ভব হয়।’
নগরবাসীর সমস্যা ও অভিযোগ শুনতে ডিএমপি সদর দপ্তরে একটি অভিযোগ সেল খোলা এবং ওপেন ডে আয়োজন করে নগরবাসী সমস্যা ও পুলিশের সেবার পরামর্শ নেওয়া হবে বলেও জানান কমিশনার। এ ছাড়া ডিএমপিতে ওসিদের একটি সিন্ডিকেট রয়েছে, সেই সিন্ডিকেট ভাঙা হবে কি না, জনতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোনো সিন্ডিকেট আর কাজ করবে না। থানার সব ওসি নতুন।’
