বিশ্লেষকদের মত

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক উন্নয়নে সময় লাগবে

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২৪, ১২:১৩ এএম

বেশ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কে এক ধরনের উত্তেজনা চলছে। দুই দেশের সামাজিক মাধ্যম ও রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে উত্তেজনাকর বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যেই ভারতে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এ পরিস্থিতিতে গত সোমবার অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ও ভারতের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকটির (এফওসি) গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। বৈঠকে দুই সচিবই নিজ দেশের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন।

যদিও কূটনীতিকরা বলছেন, এ বৈঠকে উত্তেজনা কমাতে দৃশ্যমান কোনো ফল আসার কথা নয়। উভয় দেশই তাদের হতাশা ও প্রত্যাশার বিষয়গুলো পরস্পরকে জানিয়েছে মাত্র। এর প্রতিক্রিয়া পেতে আরও কিছু সময় লাগবে। আসলে উত্তেজনা প্রশমনের পুরো বিষয়টা নির্ভর করছে ভারতের ওপর। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে আরও কিছু সময় লাগবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সোমবার (৯ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকায় পৌঁছান বিক্রম মিশ্রি। তাকে স্বাগত জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (দক্ষিণ এশিয়া অণু বিভাগ) ইশরাত জাহান। এরপর দুপুরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক হয় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায়। এফওসির পর ভারতের পররাষ্ট্র সচিব প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে তার কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এর আগে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব জসীম উদ্দিন বৈঠকে সংখ্যালঘু ইস্যুতে ঢাকার অস্বস্তির বিষয়গুলো ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের কাছে তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে কোনো একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলানোর বিষয়েও ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া এবং ভারতীয় মিডিয়ায় বাংলাদেশ নিয়ে অপপ্রচারসহ বেশ কিছু বিষয় তুলে ধরেছেন তিনি।

এ ছাড়া সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনা, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, মাদক পাচারসহ অন্যান্য অপরাধমূলক কার্যক্রম নির্মূলে ভারতের সহযোগিতাসহ সীমান্ত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা সমাধানে ভারত সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছেন। প্রতি বছর পর্যটন এবং চিকিৎসা উপলক্ষে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি ভারত সফর করে। তাদের ভিসা প্রাপ্তি সহজীকরণসহ অন্যান্য কনস্যুলার সহজীকরণের জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব। অন্যদিকে দিল্লি সম্পর্ক এগিয়ে নিতে একমত হলেও সংখ্যালঘু ইস্যুতে তারা স্পষ্টই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি সে কথাই বলেছেন বারবার।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক এম হুমায়ুন কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এজেন্ডায় যাই থাকুক, সব ধরনের উসকানি নিরসন করে উত্তেজনা কমিয়ে এনে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য উভয়পক্ষ থেকে আলোচনা হয়েছে। এটা এবারের এফওসি বৈঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিক। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এবারের আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত নেতাদের পক্ষ থেকে ভারতকে নিয়ে যেসব বক্তব্য বিবৃতি এসেছে, তাতে ভারতের দিক থেকেও নিরাপত্তা ইস্যুতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে অনেকে ধারণা করছেন।’

তিনি বলেন, সব মিলিয়েই দুই দেশের মধ্যে ‘সম্পর্কের শীতলতা’ কিংবা ‘উত্তেজনা’ তৈরি হয়েছে। এ বৈঠকে সেগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এখন দেখা যাক পরবর্তীকালে এর প্রতিফলন কী হয়।

এদিন ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় প্রায় তিন ঘণ্টা বৈঠক করেন দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিব। বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মো. জসীম উদ্দিন এবং ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি নিজ নিজ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন।

এ ছাড়া ভারতের পররাষ্ট্র সচিব অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকেও সাম্প্রতিক সময়ে দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কে কিছু মেঘ জমে ছায়া তৈরি করেছে। এই ‘কালো মেঘ’ মুছে ফেলতে ভারতের সাহায্য চেয়েছেন ড. ইউনূস।

এর আগেও গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া অডিও রেকর্ড ফাঁস হওয়ার বিষয়ে ঢাকা দিল্লিকে তাদের অস্বস্তি ও আপত্তির বিষয় জানিয়েছে। কিন্তু সেটি খুব বেশি কাজে আসেনি। গত সোমবার বিক্রম মিশ্রির ঢাকা সফরের দিন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লি থেকে যুক্তরাজ্যে সেখানকার আওয়ামী লীগ আয়োজিত সমাবেশে আধঘণ্টার বেশি সময় বক্তব্য রাখেন।

সেই বক্তব্যে শেখ হাসিনা দলের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেন। ভারত থেকে শেখ হাসিনার এ ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানো সরকারের জন্য গলার কাঁটা বলেই মনে করা হচ্ছে। ফলে ঢাকা এ ব্যাপারে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। অন্যদিকে দিল্লিও বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ইস্যুতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অভিযোগ অব্যাহত রেখেছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে আরও কিছু সময় লাগবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত