জুলাই-আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণে ভারতকে আইনগতভাবে আহ্বান জানানো হবে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের বিশেষ পরামর্শক টবি ক্যাডম্যান।
টবি ক্যাডম্যান আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘ভারত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত না পাঠালে তার অনুপস্থিতিতেই বিচারের বিষয়টি বিবেচনা করবে বাংলাদেশ সরকার।’ বিচারে সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক মানদ- বজায় রাখার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজে যেন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না হয়।’ গতকাল বুধবার ট্রাইব্যুনালে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এ কথা বলেন তিনি।
গণহত্যার অভিযোগে বিচারের লক্ষ্যে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয় গত ১৪ অক্টোবর। গত ২০ নভেম্বর ব্রিটিশ আইনজীবী, লন্ডনভিত্তিক ল’ ফার্ম ‘গুয়ের্নিকা ৩৭’ গ্রুপের সহ-প্রতিষ্ঠাতা টবি ক্যাডম্যানকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের বিশেষ পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয় বলে তিনি নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ হ্যান্ডেলে জানান। এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালও একটি বিজ্ঞপ্তি দেয়।
প্রসিকিউশনের পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ লাভের পর গতকালই প্রথম ট্রাইব্যুনালে আসেন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এ ট্রাইব্যুনালে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকাজ চলার সময় অভিযুক্তদের পক্ষের আইনজীবী হিসেবে বাংলাদেশে আসতে চেয়েছিলেন টবি ক্যাডম্যান। তখন তাকে আটকে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। গতকাল বুধবার সকাল ৯টায় টবি ক্যাডম্যান চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর ও ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ভারত আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে এবং প্রত্যর্পণের বিষয়ে যথাযথ সম্মান জানালে আমরা অবশ্যই তাদের শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের আহ্বান জানাব। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে যা কিছু বলা হয়েছে, সে সম্পর্কে আমরা জানি ও সচেতন রয়েছি। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যথাযথভাবে অভিযোগ আনা ও তাকে দেশে এনে বিচারের মুখোমুখি করানোর জন্য ভারতকে জানানোর বিষয়গুলো নিশ্চিত করার গুরুদায়িত্ব এখন এ ট্রাইব্যুনাল ও এর চিফ প্রসিকিউটরের।’ তিনি বলেন, ‘ভারত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ না করলে তার অনুপস্থিতিতেই বিচারের বিষয়টি বাংলাদেশ সরকার বিবেচনা করবে।’
টবি ক্যাডম্যান বলেন, ‘আমি অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন আলোচনায় স্পষ্টভাবে বলেছি, এ যাবৎকালে যত বিচার হয়েছে, সেসবের মধ্যে এবারের বিচারকাজ খুবই স্বচ্ছ হতে হবে। এবারের বিচার প্রক্রিয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ধৈর্য ধারণ করতে হবে, যাতে করে প্রসিকিউটর টিম ও তদন্ত সংস্থা সুন্দরভাবে তাদের কাজ করে এটি করতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘আমার অনুরোধ থাকবে, আমি যাদের (প্রসিকিউশন) সঙ্গে কাজ করছি, তাদের কাজে যেন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না হয়। এ বিচার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পুরো সমর্থন থাকবে। আমি জাতিসংঘ, ইউকে গভর্নমেন্ট ও আমেরিকার গভর্নমেন্টসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তারা এটিকে সমর্থন করেছে।’
বিচারে অভিযোগ প্রমাণসাপেক্ষে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদন্ড প্রসঙ্গে টবি ক্যাডম্যান বলেন, ‘বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থা শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদ-কে সমর্থন করে না। সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড হলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘের সমর্থনের বিষয়ে কী হবে তা নিয়ে সরকারকে আলোচনায় বসতে হবে। সে রকম পরিস্থিতিতে এ মামলার শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ডের বিষয়টি হবে আদালতের বিবেচ্য বিষয়।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সংশোধনীর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, সংশোধনীর বিষয়ে সঠিক পদক্ষেপ ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে। যে সংশোধনীগুলো করা হয়েছে, সেগুলো সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য এবং এখনো কিছু বিষয় রয়েছে যেসবের সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।’ এখন পর্যন্ত বিচারকাজের অগ্রগতি ও ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের নেওয়া উদ্যোগের প্রশংসা করেন তিনি।
