নীলফামারী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্লাটিনাম জুবিলি উৎসব

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৬:৫৫ পিএম

নীলফামারী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৭৫তম বর্ষপূর্তি প্লাটিনাম জুবলি উদযাপন উপলক্ষে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী বসেছিল নবীন-প্রবীণ শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা। দীর্ঘদিন পর সতীর্থদের পেয়ে অনেকেই চোখ ভিজিয়েছেন আনন্দাশ্রুতে, অনেকে মেতেছেন উচ্ছ্বাসে। তবে স্কুলের ৭৫তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপনে পুরনো সহপাঠীদের সঙ্গে পেয়ে মোবাইলে সেলফি তুলে রাখলেন অনেকেই। কেউ মঞ্চে উঠে পুরনো দিনের স্মৃতিচারণ করলেন। কেউ পুরনো সহপাঠীদের সঙ্গে এক বেঞ্চে বসে কব্জি ডুবিয়ে ফেরালেন পুরনো দিনের কথা। 

বৃহস্পতিবার (১২ ডিসেম্বর) বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে জাতীয় পতাকা, বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে দিনটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এরপর একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালী শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ফিরে এসে আলোচনা সভায় মিলিত হয়। 

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়ীরুজ্জামান। বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. সাইদুল ইসলাম, সিভিল সার্জন ডা. হাসিবুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন নীলফামারী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামীমা হক। আলোচনা সভা শেষে দুজন রত্নাগর্ভা বেগম জুলেখা ইসলাম ও সাবেকুন নাহার সম্মাননা প্রদান করা হয়। এ ছাড়া ওই স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ভাষা সৈনিক ফৌজিয়া বেগমকে মরোনোত্তর সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। 

সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকেই বিভিন্ন বয়সের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে পুরো ক্যাম্পাস  জুড়ে আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি হয়েছে। নানান বয়সী মানুষজন দলবেঁধে ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ফটোবুথে তুলছেন ছবি ও সেলফি। কলেজের বিভিন্ন প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন করছেন অনেকেই। প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা স্কুল জীবনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে স্মৃতিচারণ করছেন। সাজানো হয়েছে প্রতিষ্ঠানের মূলফটক ও ভবন প্রাঙ্গণ। যারা এই অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য রেজিস্ট্রেশন করেছিলেন বাইরের বুথ থেকেই সংগ্রহ করছেন বিভিন্ন গিফট আইটেম। স্কুল মাঠে করা হয়েছে বিরাট প্যান্ডেল। সেখানেই আয়োজন করা হয়েছে কুইজ প্রতিযোগিতা, রম্য বিতর্ক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

এদিকে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে উৎসব মঞ্চে শুরু হয় স্মৃতিচারণা পর্ব। এ পর্বে বিদ্যালয়কে ঘিরে শৈশব স্মৃতি তুলে ধরেন পুরানো শিক্ষার্থী। এ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন অনেক শিক্ষার্থী নিজ নিজ ক্ষেত্রে সাফল্যের নজির সৃষ্টি করেছেন। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে এলাকার জন্য, দেশের জন্য তারা কাজ করেছেন। প্রতিষ্ঠানে সুশিক্ষার ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। নবীন শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষিত হয়ে এলাকার জন্য কাজ করতে হবে। ভালো কাজ দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। এমন কথা তুলে ধরেন পুরানো শিক্ষার্থীরা।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শামিমা হক দেশ রূপান্তরকে জানান, নীলফামারী সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭৫ তম বর্ষ উদযাপনে স্কুল চত্বরে নবীন প্রবীন শিক্ষার্থীরা মেলায় রূপান্তর করেছেন। তারা বিভিন্ন স্টল দিয়ে স্কুল চত্বরে মা বোন নাতী নাতনীদের সঙ্গে নিয়ে নিয়ে এসে পুরানো স্মৃতি স্মরণ করছিলেন। 

উত্তরাঞ্চলের তৎকালিন মহকুমা শহর নীলফামারীতে স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের প্রচেষ্টায় ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত করা হয় বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। যা জাতীয়করণ হয় ১৯৭০ সালে। স্কুলটির এপর্যন্ত ২৬ জন প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এরমধ্যে প্রথম প্রধান শিক্ষক আমেনা বেগম।  তিনি আজ বেঁচে নেই। 

প্রবীণ-নবীনদের মিলন মিলায় দেখা পাওয়া গেল ৯২ বছরের জেলা শহরের থানাপাড়ার গৃহবধু হাফিজা বেগম তোতার। ১৯৪৭ সালে তিনি এই স্কুলের ছাত্রী ছিলেন। বয়সের ভারে হাটতে না পারলেও মনোবল তার শক্ত। তাই ছেলে ডাঃ রেজাউল করিম রেজার সাথে হুইল চেয়ারে বসে মঞ্চের সামনে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করছিলেন। 

সেনাবাহিনীর ডাক্তার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমা বেগম নাজু দেশ রূপান্তরের বলেন, আমার মা জননী জুলেখা ইসলাম এই স্কুলে এক সময় চাকরি করতেন। আজ তিনি যোগ হয়েছেন এই অনুষ্ঠানে। মাকে সম্মাননা দিলেন স্কুল কর্তৃপক্ষ। অনেক ভাল লাগলো। তিনি বলেন, সেই সময় এত ক্যামেরার প্রচলন ছিল না। সহপাঠীদের সঙ্গে ছবি আছে বলে মনে পড়ছে না। এদিন স্কুল প্রাঙ্গণে সহপাঠী সঙ্গে দেখা হয়। আমরা এক সঙ্গে মঞ্চে উঠে গান পরিবেশ করলাম। মোবাইলে সবার সঙ্গে নিজস্বী তুলে রেখেছি। তবে চোখের সামনে ভেসে উঠছে না ফেরার দেশে চলে যাওয়া সহপাঠীদের।  

১৯৬৪ সালে মেট্রিক পাসের পর এক সঙ্গে ছবি তুলেছিলেন কিনা মনে নেই তাসকিনা রহমানের। চার প্রজন্মের স্মৃতিচারণ করছিলেন এই স্কুলের শিক্ষার্থী ৭৭ বছরের গৃহবধু তাসকিনা রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে জানালেন, ৬৪ সালে মেট্রিক পাস করেন এই স্কুল থেকে। বিয়ে পর তার সন্তানদের মধ্যে তিন মেয়ে মরহুমা আফরোজা ফেরদৌস, আফছানা ফেরদৌস, আফ্রিনা ফেরদৌস মেট্রিক পান করেন এই স্কুল থেকে। তাসকিনা রহমানের বড় বোন মরহুমা তোয়বা খাতুন ১৯৫২ সালে মেট্রিক পাস করেছিলেন। তাসকিনা রহমান স্কুল চত্বরে পা রেখে স্মৃতি হাতিয়ে খুঁজছিলেন। ১৯৮৫ সালে এসএসসি ব্যাচের আফরোজা বিনতে আজিজ গেøারী, বলছিলেন আমার দুই মেয়েও এই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত