স্বামী বিএনপি করায় আটকে যায় বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৪, ১২:৩৭ এএম

স্বামী বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে চার বছর ধরে দপ্তরে দপ্তরে ঘুরেও বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পাননি চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের বাকখালী গ্রামের সখিনা খাতুন। উল্টো পরিবারের সদস্যদের সামনে অপমান-অপদস্থ হতে হয়েছে ৭৮ বছর বয়সী এই বৃদ্ধাকে। ২০২০ সালে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার বরাবর বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি চেয়ে আবেদন করেন সখিনা খাতুন। সেখান থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিল্টন রায় সমাজসেবা কর্মকর্তা লুৎফুন্নাহার বেগমকে দায়িত্ব হস্তান্তর করলে চার বছরের জন্য ফাইলটি আটকে যায়। এ ছাড়া তদন্তের নামে পরিবারের সদস্যদের সামনেই অপমান-অপদস্থ করার অভিযোগ ওঠে ওই সমাজসেবা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের হাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার সখিনা খাতুনের বড় মেয়ে মোহছেনা বেগম বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের অনুরোধে আমার মা বীরাঙ্গনার স্বীকৃতির জন্য তৎকালীন সরকারের মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। আবেদন সঠিক থাকলে আমার মা স্বীকৃতি পাবেন, অন্যথায় পাবেন না এটাই তো হওয়ার কথা। কিন্তু সমাজসেবা কর্মকর্তা আমার মাকে জঘন্য ভাষায় আক্রমণাত্মক প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেন। তাও আমার বাবা ও আমাদের ভাই-বোনের সামনে। সেই অপমান সইতে না পেরে আমার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন।’

সখিনা খাতুনের মেয়ে জাহেদা বেগম বলেন, ‘বিএনপি সমর্থন করা ও ঘুষ দিতে না পারার অপরাধে বীরাঙ্গনা খেতাব পেতে আবেদন করে আমাদের সামনে চরম অপমান-অপদস্থ হতে হয়েছিল মাকে। সমাজসেবা কর্মকর্তার অবান্তর ও বিশ্রী প্রশ্নে জর্জরিত হয়ে আমার মা কান্না করে দেন। অথচ সমাজসেবা কর্মকর্তা নিজেও একজন নারী। আমার বাবা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন সৈয়দপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার বাহিনীর সদস্যের ধর্ষণের শিকার হলেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই আমার মা বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি না পেয়ে উল্টো অপমানিত হয়েছিলেন।’

স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘সখিনা খাতুন মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্যাতিত হয়েছিলেন এটি দিবালোকের মতো সত্য। আমি এ ঘটনার সাক্ষী। আমার সামনে তাকে হানাদার বাহিনী ধরে নিয়ে যায়। আমরা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে স্পষ্ট করে স্বীকারোক্তি দিলেও তিনি রাজনৈতিক কারণেই আবেদনটি আটকে রাখেন। তিনি সবার সামনে আমাকেও নানা ধরনের বিব্রতকর প্রশ্ন করেন।’

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল মুনসুর বলেন, ‘সখিনা খাতুন মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্যাতিত হয়েছিলেন তা শতভাগ সঠিক। ২০২০ সালে তিনি বীরাঙ্গনার স্বীকৃতির জন্য আবেদন করলে সে সময় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। তাই অনেক মুক্তিযোদ্ধা সঠিক ঘটনা জেনেও লিখিত সাক্ষী দেওয়ার সাহস করেননি। তবে আমি লিখিত সাক্ষী দিয়েছিলাম।’

বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে গেলে সমাজসেবা কর্মকর্তা লুৎফুন্নাহার বেগম বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়। আমি নিজে একজন নারী হয়ে আরেকজন মায়ের বয়সী নারীকে অপমান করার প্রশ্নই আসে না। মূলত পর্যাপ্ত সাক্ষী না থাকায় সখিনা বেগমের বীরাঙ্গনার আবেদনের ফাইলটি আটকে যায়।’      

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত