চট্টগ্রামে চুরির অভিযোগে গাছের সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে এক যুবককে। গত বুধবার দুপুরে হাটহাজারী উপজেলার ফতেয়াবাদ স্কুল মাঠ থেকে সাজ্জাদ হোসেন পারভেজ ওরফে লেদু (২৫) নামের ওই যুবকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে গত মঙ্গলবার উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের মদনহাট এলাকায় মঞ্জুরুল ইসলাম সিনিয়র মাদ্রাসা মাঠে তাকে মারধর করা হয়। মারধরের এক পর্যায়ে তার হাত ও পিঠে ধারালো অস্ত্র দিয়ে জখম করে ক্ষতস্থানে মরিচের গুঁড়া লাগিয়ে দেওয়া হয়। করা হয়নি চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা। ১৪-১৫ ঘণ্টা ফতেয়াবাদ স্কুল মাঠে কাতরাতে কাতরাতে বুধবার সকালে মারা যান তিনি।
পুলিশ জানিয়েছে, নিহত লেদু চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পশ্চিম শাকপুরা নিরঞ্জন মাস্টার বাড়ির আহমদ নুরের ছেলে। তাকে হত্যার ঘটনায় হাটহাজারী থানায় তিনজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ১৫ থেকে ২০ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন তার বড় বোন সালমা আক্তার। ওই মামলায় মাদ্রাসাটির এক শিক্ষার্থী ও মাদ্রাসা মসজিদের ইমামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
স্থানীয় লোকজন, প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার কোনো এক সময় মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও মাদ্রাসা মসজিদের মুয়াজ্জিন আবদুল্লাহ আল নাঈমের (আলিম বিভাগের ছাত্র) বাসা থেকে মোবাইল ফোন ও একটি সাইকেল চুরি করেন লেদু। চুরির ঘটনা মাদ্রাসার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে ধরা পড়ে। ওইদিন দিন সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ১ নম্বর রেলগেইট এলাকায় সন্দেহভাজন হিসেবে লেদুকে আটক করে স্থানীয় লোকজন। খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান নাঈম। এরপর ঘটনাস্থলে গিয়ে লেদুকে শনাক্ত করেন মাদ্রাসা মসজিদের ইমাম মো. মুছা কাজেম। পরে ১ নম্বর রেলগেইট থেকে লেদুকে নিয়ে যাওয়া হয় অন্তত আধা কিলোমিটার দূরের মাদ্রাসায়। সেখানে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে লেদুকে বেধড়ক পিটুনি দেওয়া হয়। এক পর্যায়ে লেদুর ডান হাতে কাঁধের নিচে এবং পিঠে ধারালো অস্ত্র দিয়ে জখম করে সেখানে মরিচের গুঁড়া লাগিয়ে দেওয়া হয়। এরপর গুরুতর আহত লেদুর চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে চট্টগ্রাম শহরগামী একটি সিএনজি অটোরিকশায় তুলে দেওয়া হয়। ঘটনাস্থল থেকে চট্টগ্রাম শহরের দিকে দুই কিলোমিটার দূরে ফতেয়াবাদ এলাকায় এনে আহত লেদুকে নামিয়ে দেন অটোরিকশা চালক। এরপর রাতভর খালি গায়ে স্কুল মাঠের পশ্চিম পাশে গোলপোস্টের কাছে গড়াগড়ি করতে থাকেন লেদু। সকাল ৭টার দিকে স্থানীয় লোকজনকে দেখে নির্যাতনের বর্ণনাও দেন। সকাল ৮টার দিকে স্থানীয় এক কৃষকের কাছে চেয়ে দুই গ্লাস পানিও পান করেন। এরপর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। খবর পেয়ে দুপুর ১২টায় স্কুল মাঠ থেকে লেদুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে লেদুর লাশ হস্তান্তর করে পুলিশ।
সালমা আক্তার জানান, সাজ্জাদ হোসেন পারভেজ ওরফে লেদু তার পিতা-মাতার পালক সন্তান। দশ বছর আগে বাবার সঙ্গে অভিমান করে ঘর থেকে বেরিয়ে আর বাড়ি ফেরেননি। এখন ভাইয়ের লাশ নিয়ে তাকে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হাটহাজারী থানার উপপরিদর্শক অরুণ আচার্য্য বলেন, ‘মোবাইল ফোন ও সাইকেল চুরির অপরাধে ধরে নিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় লেদুকে নির্যাতন করা হয়েছে। তার কোনো চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়নি।
পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, লেদুকে হত্যার ঘটনায় তার বোন সালমা আক্তার ফতেপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সেকান্দর হোসেনের ছেলে আবদুল্লাহ আল নাঈম (১৯) এবং একই ইউনিয়নের মদনহাট এলাকার আবদুল খালেকের ছেলে মাদ্রাসা মসজিদের ইমাম মো. মুছা কাজেমকে (৩৭), একই এলাকার ফয়েজ উল্লাহ উকিল বাড়ির আবদুল কুদ্দুসের ছেলে মো. এরশাদসহ কয়েক জনের নামে মামলা করেছেন। এদের মধ্যে নাঈম ও মুছা কাজেমকে বুধবার রাতেই গ্রেপ্তার করা হয়। বৃহস্পতিবার তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
