চট্টগ্রামে সিভিল এভিয়েশন কর্মচারী হত্যা

রাতে খুন করে সকালের ফ্লাইটেই পগারপার প্রধান আসামি

আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৬:৩৬ পিএম

চট্টগ্রামে সিভিল এভিয়েশন কর্মচারী মো. ওসমান সিকদার (৪০) ‘কিলিং মিশনে’চোরাচালান চক্রের সদস্য মামলার প্রধান আসামি মো. রাসেলসহ অংশ নেন চারজন। হত্যাকাণ্ডটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করে ‘ফিল্ডার’কোম্পানির স্টেশন ওয়াগন টাইপের কার। ১০ থেকে ১২ মিনিটের মধ্যে ওসমানের মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে শাহ আমানত বিমানবন্দরের সিভিল এভিয়েশনের ‘চৈতালি’নামের সরকারি কোয়ার্টারে নিজের কক্ষেই খুন হন ওসমান।

এরপর লাশ গাড়িতে তুলে বিমানবন্দরের অদূরে চরপাড়া আউটার রিং রোডের পাশে ফেলে দেয় খুনিরা। হত্যাকা্ডে ঘটানোর পর ৩ থেকে ৪ ঘণ্টার মধ্যে শাহ আমানত বিমানবন্দর দিয়ে সৌদি আরব পালিয়ে যান মামলার প্রধান আসামি মো. রাসেল। হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া বাকি তিনজনের হদিস মিলছে না। বিমানবন্দর এবং মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সুত্রে এই তথ্য জানা গেছে।  

পুলিশ জানায়, ৩৭ হাজার রিয়াল পাচার নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে ১১ ডিসেম্বর দিবাগত আড়াইটার দিকে খুন করা হয় সিভিল এভিয়েশন কর্মচারী ওসমান সিকদারকে। এ ঘটনায় সিভিল এভিয়েশন কর্মচারী মো. ইব্রাহিম খলিল, বাদল মজুমদার এবং মো. আরিফ নামের তিনজনকে ঘটনার দিন গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওসমান খুনের ঘটনায় চোরাচালান চক্রের সক্রিয় সদস্য চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলা নানুপুরের বাসিন্দা মো. রাসেলসহ তিনজনকে আসামি করে পতেঙ্গা থানায় মামলা দায়ের করেন ভিকটিম ওসমানের বড়ভাই এমরান সিকদার। তবে এজাহারে আসামি করা হয়নি আরিফকে। 

এই প্রসঙ্গে মামলার বাদী এমরান সিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলা দায়েরের আগে হত্যাকাণ্ডে আরিফের সম্পৃক্ততা টের পাইনি। পরে জানতে পেরেছি আমার ভাইকে খুনের পেছনে আরিফের যোগসাজশ আছে।’

এ দিকে গ্রেপ্তার তিনজনের মধ্যে আসামি ইব্রাহিম খলিল গত শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সরকার হাসান শাহরিয়ারের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। 

পতেঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহফুজুর রহমান জানান, বিমানবন্দর দিয়ে সৌদি আরবের মুদ্রা ৩৭ হাজার রিয়াল পাচার ও ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে  দ্বন্দ্ব থেকে উসমান সিকদারকে খুন করা হয়। 

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পতেঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদুল আলম মঙ্গলবার বিকেলে দেশ রূপান্তরকে জানান, ওসমান হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার আসামি মো. আরিফ ও বাদল মজুমদারকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে আদালতে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে ওসমান সিকদার হত্যা মামলা সংক্রান্ত কোনো ধরনের তথ্য জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন পতেঙ্গা থানা পুলিশের এই কর্মকর্তা।  

মামলার প্রধান আসামি মোহাম্মদ রাসেল (৪৪) চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানাধীন নানুপুর মধ্য গামরিতলা বদিউর রহমান চৌধুরী বাড়ির আবুল কাসেমের ছেলে। গ্রেপ্তার হওয়া আসামি ইব্রাহিম খলিল ওরফে মাসুদ (৪৪) ভোলা জেলার লালমোহন থানাধীন গজারিয়া ইউনিয়নের শিপু মাতবর বাড়ির মৃত মোফাজ্জল হোসেন ছেলে। আসামি মোহাম্মদ বাদল মজুমদার (৪২) বান্দরবান পার্বত্য জেলার সদর থানাধীন ৬ নং ইউনিয়নের আর্মিপাড়া বিধু বালার বাড়ির দুলাল মজুমদারের ছেলে। এ ছাড়া গ্রেপ্তার আরিফের গ্রামের বাড়ি হাটহাজারীর মেখল ইউনিয়নের কাছিয়া বটতল এলাকায়। তার বাবার নাম মোহাম্মদ জুনু। ভিকটিম মো. ওসমান সিকদার (৪০) চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার মেখল ফকিরহাট এলাকার রুহুল্লা সিকাদার বাড়ির মো. শাহা আলম সিকদারের ছেলে।

গ্রামের বাড়ির সূত্র জানায়, পাঁচবছর আগে সৌদি আরব যান রাসেল। প্রতিমাসেই তিনি দেশে আসেন। স্বর্ণ চোরাচালান ও মুদ্রা পাচারসহ নানান অপরাধে যুক্ত। গ্রামের বাড়িতে গড়ে তুলেছেন বিলাসবহুল বাড়ি। সম্প্রতি দেশে আসেন রাসেল। ওসমান হত্যাকাণ্ডের পর (১২ ডিসেম্বর) থেকে তাকে এলাকায় দেখা যাচ্ছে না। 

বিমানবন্দর সূত্র জানাচ্ছে, ১১ ডিসেম্বর দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে একটি প্রাইভেটকার (স্টেশন ওয়াগন) নিয়ে আসে দুর্বৃত্তরা। এ সময় বিমানবন্দর কর্মচারীদের সরকারি কোয়ার্টারে ঢোকার প্রধান ফটকে (জাপানি গেইট) ওই প্রাইভেট কারটি আটকান কর্তব্যরত এক আনসার সদস্য। এ সময় জাপানি গেইট থেকে আনুমানিক ৩০০ গজ অদূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন সিভিল এভিয়েশনের কর্মচারী (ইলেকট্রিশিয়ান) ইব্রাহিম খলিল। তিনি (খলিল) দূর থেকে গেইটে দায়িত্বরত আনসার সদস্যকে দুর্বৃত্তদের বহন করা কারটি কোয়ার্টারে ঢুকতে দেওয়ার জন্য হাতের ইশারা দেন। গাড়িটি কোয়ার্টারে ঢোকার ১৫ থেকে ১৭ মিনিটের মধ্যে জাপানি গেইট ত্যাগ করে। এ সময় ইব্রাহিম খলিল নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করলেও ধরা পড়ে যান সিসিটিভি ক্যামেরায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত