দেশেই সম্ভব বেশিরভাগ চিকিৎসা

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৪:০৮ এএম

বিদেশে চিকিৎসার জন্য বছরে বাংলাদেশিরা ব্যয় করছেন ৫০০ কোটি ডলার। জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। গভর্নর বলেন, চিকিৎসার জন্য বেশিরভাগ বাংলাদেশি ভারত ও থাইল্যান্ড যান। কারণ এসব দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা বাংলাদেশের তুলনায় উন্নত। তবে এই খরচের বড় অংশ অনানুষ্ঠানিকভাবে পাঠানো হয়, যা দেশের ব্যালেন্স অব পেমেন্ট বা বৈদেশিক লেনদেনের ওপর যথেষ্ট চাপ তৈরি করে। বাংলাদেশে যারা ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে পরিচিত, তাদের অনেকেরই চিকিৎসা নেওয়ার জন্য থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ইউরোপ কিংবা আমেরিকায় ছুটে যাওয়ার বিষয়টি নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এই প্র্যাকটিস চলছে। সাধারণ মানুষ যখন দেখেন, সামর্থ্যবানরা উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাচ্ছেন, তখন তাদের দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে এক ধরনের সন্দেহ তৈরি হয়। তারা ভাবেন, আদতেই কি বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থা উন্নত! সাধারণ মানুষের মধ্যে এ ধরনের দ্বান্দ্বিকতা দূর করার দায়িত্ব সরকারের। তাদের জানাতে হবে, বাংলাদেশ চিকিৎসাসেবায় বর্তমানে অনেক উন্নত। হয়তো কিছু কিছু রোগের কারণে, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে কেউ বিদেশ যেতে পারেন। তাই বলে বছরে ৫০০ কোটি ডলার ব্যয়!  

আসলে তাদের আমাদের দেশের উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পর্কে জানানো হয় না। বাংলাদেশ এখন চিকিৎসার ক্ষেত্রে কোন পর্যায়ে চলে গেছে, তা অনেকেরই ধারণা নেই। আবার এটাও হতে পারে, এই না জানানোর পেছনে রয়েছে ভিন্ন ধরনের রাজনীতি। যে পরিমাণ অর্থ চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হচ্ছে, এর ফলে যে টাকা পাচ্ছে বিদেশি হাসপাতাল ইচ্ছাকৃতভাবে তার বিরুদ্ধে কোনো জনসচেতনতাই তৈরি করা হচ্ছে না। একদিকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার প্রচারণা, অন্যদিকে বিশেষ শ্রেণির অর্থ লোভ। যে কারণে রোগীদের বিদেশগামিতা আটকানো যাচ্ছে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে দেখা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বিদেশগামী বাংলাদেশির ৬০ দশমিক ৪১ শতাংশ প্রতিবেশী দেশ ভারতে গেছেন। ব্যক্তিগত টাকা খরচ করে বিদেশে চিকিৎসা নিলে সেটি নিয়ে তেমন হয়তো কোনো আপত্তি উঠে না, কিন্তু রাষ্ট্রের টাকায় অর্থাৎ জনগণের করের টাকায় বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে অনেক সময়ই প্রশ্ন ওঠে। আসলে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা এবং চিকিৎসা পাওয়া দুটো এক জিনিস নয়। অধিকাংশ চিকিৎসাই আমাদের এখানেই সম্ভব। মূলত এর জন্য দেশের চিকিৎসায়  শৃঙ্খলার অভাব এবং ব্যবস্থাপনা দায়ী। এই সংকট উত্তরণে রেফারেল পদ্ধতি চালু করা উচিত। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে সেবার মান বৃদ্ধি করতে হবে। এ জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নজরদারি প্রয়োজন।

ভারতের ভেলোরের ডিরেক্টরের বিস্ফোরক মন্তব্য ‘দেশের করপোরেট হাসপাতালগুলোতে আধুনিক চিকিৎসার ৩০ শতাংশ যন্ত্রই অপ্রয়োজনীয়। রোগীর পকেট কাটার রাস্তা ছাড়া আর কিছুই নয়।’ দেশের এক নম্বর সরকারি ক্যানসার হাসপাতাল টাটা মেমোরিয়ালের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে মুম্বাইয়ে হয়ে গেল তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সম্মেলন। সেখানে এমন উক্তি করলেন দেশের অন্যতম সেরা স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ভেলোরের ক্রিশ্চিয়ান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডিরেক্টর ডা. সুনীল চ-ী। তিনি বলেন, রোগীকে একজন চিকিৎসক নিজস্ব ডাক্তারি বিদ্যাবুদ্ধি এবং বিবেচনা দিয়ে সুস্থ করে তুলবেন। স্পর্শ এবং ক্লিনিক্যাল আই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অথচ তা না হয়ে এখন চিকিৎসা ব্যবস্থাটাই পরীক্ষানির্ভর হয়ে উঠছে। একজন সুস্থ-সবল মানুষকে হাজারগণ্ডা পরীক্ষা করিয়ে রোগের ভয় দেখিয়ে টাকা কামানো চলছে। পেশায় কার্ডিওলজিস্ট ডা. চণ্ডী বলেন, এই তো কয়েক বছর আগে হঠাৎ ধুম পড়ল, হার্ট স্ক্যানের নতুন যন্ত্র আসছে। তার মধ্যে দিয়ে হাঁটলে নাকি মানুষের খুঁটিনাটি রোগ সব বলে দেবে। শুনলে অবাক হবেন, এখনো ভেলোরে আমরা সেই যন্ত্রই আনিনি। কোনো সমস্যা হচ্ছে? কই না তো! আমাদের ২৭০০ বেডের হাসপাতাল। প্রতিদিন আট হাজার রোগী দেখাতে আসছেন। তার কটাক্ষ, সমস্যা বের করতে চাইলে একের পর এক পরীক্ষা করে হাজারটা সমস্যা বের করা যায়। তিনি জানান, হার্টের অসুখ, আর্থ্রাইটিস, কিডনির সমস্যা ইত্যাদি রোগ নিয়ে বাঙালি রোগীরা বেশি ভেলোরে আসছেন। অথচ এই চিকিৎসা বাংলাদেশেই সম্ভব। টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালের ডিরেক্টর ডা. আর এ বাদওয়ে, ভেলোরের ডা. চণ্ডী বা পুদুচেরির অরবিন্দ আই কেয়ারের চেয়ারম্যান পি নামপেরুলস্বামী সেদিনের আলোচনায় এক বাক্যে বললেন কম খরচে, এমনকি ন্যূনতম খরচে কারও কাছে মাথা বিক্রি না করেও সফলভাবে বছরের পর বছর ধরে স্বাস্থ্য পরিষেবা চালানো সম্ভব। মুম্বাই পুরসভা পরিচালিত দেশের অগ্রগণ্য কেইএম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডিন অভিনাশ সুপে বলেন, চারটি মেডিকেল কলেজ, ৪৩টি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালসহ মুম্বাই পুরসভার ৩৯৯টি হাসপাতাল আছে। গরিব রোগীরা অধিকাংশই পয়সা দিতে পারেন না। সফলভাবেই চলছে হাসপাতালগুলো।

অরবিন্দ আই কেয়ারের চেয়ারম্যান নামপেরুলস্বামী বলেন, অর্ধেক মানুষকে বিনা পয়সায় চিকিৎসা দিয়েও আমাদের লাভ থাকছে। ক্ষতি তো হচ্ছে না। বর্তমানে দেশের শিশুমৃত্যুর হার নিয়েও সরকারকে তুলাধোনা করতে ছাড়েননি তারা। ডা. চণ্ডী বলেন, ‘আমাদের দেশের বর্তমানে সদ্যোজাত শিশুমৃত্যুর যা হার, সাব সাহারান আফ্রিকারও তাই। শিশুমৃত্যুর হারে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশও আমাদের থেকে ওপরের দিকে। নিচে রয়েছে শুধু পাকিস্তান।’

এই যখন বাস্তব অবস্থা, তখন একবার আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থার দিকে নজর দেওয়া যাক। বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবা খাত আধুনিক হয়েছে। চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে আমরা যত হতাশা প্রকাশ করি, প্রকৃতপক্ষে পরিস্থিতি সে রকম নয়। বাংলাদেশ বিশেষায়িত চিকিৎসাব্যবস্থায় যথেষ্ট এগিয়েছে। বর্তমানে হার্ট, লিভার, ব্রেনসহ সার্জারি চিকিৎসায়  বাংলাদেশ আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।  বিদেশ থেকে প্রতি বছর অনেক রোগী আসছেন এ দেশে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য। আমাদের দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা যথেষ্ট আধুনিক হয়েছে। যেকোনো জটিল রোগের চিকিৎসা এখন দেশেই সম্ভব। এমনকি দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসাও আমাদের দেশেই হচ্ছে। অনেক দূর এগিয়েছে,  রোগ নির্ণয় অর্থাৎ প্যাথলজি পরীক্ষা। তবে যে বিষয়টি বিশেষ ও ব্যাপকভাবে আলোড়িত বা প্রত্যাশা তা হলো আমাদের দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের শহরমুখী প্রবণতা হ্রাস করতে হবে। অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করার কারণে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের গ্রামমুখিতা করার উদ্যোগ নিলে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা অনিবার্যভাবেই কমে আসবে। সবচেয়ে বড় কথা, দেশের অর্থ দেশেই থাকবে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত