চাপে আদানি, বিদ্যুৎ চুক্তি পর্যালোচনার দাবি অন্তর্বর্তী সরকারের 

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০২৪, ১২:১০ এএম

বিদ্যুৎ সরবরাহকারী ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আদানি পাওয়ারের বিরুদ্ধে কয়েক বিলিয়ন ডলারের চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে অন্তর্বর্তী সরকার। মূলত, চুক্তির আওতায় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ভারত সরকার থেকে কর সুবিধা পেলেও বাংলাদেশকে সেই সুবিধা দেয়নি আদানি। এমনি গোপন করেছে সেই সুবিধার তথ্যও। বিভিন্ন নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে এক প্রতিবেদনে এমনটি জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালে ভারতীয় ধনকুবের গৌতম আদানির মালিকানাধীন আদানি পাওয়ার বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। ভারতের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি কয়লা-চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে এই বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। তবে, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও আদানির মধ্যকার চিঠিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট নথি বিশ্লেষণে জানা গেছে, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে কোনও দরপত্র ছাড়াই অনুমোদিত এই চুক্তিটি বাংলাদেশের অন্যান্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ চুক্তির তুলনায় অনেক ব্যয়বহুল। তাই এ বিদ্যুৎ চুক্তি নিয়ে ফের দরকষাকষি করতে চায় বলে জানিয়েছে ঢাকা।

২০২৩ সালের জুলাই মাসে সরবরাহ শুরু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ আদানি পাওয়ারকে পাওনা অর্থ পরিশোধে পিছিয়ে রয়েছে। তবে পাওনার সঠিক অঙ্ক নিয়ে দুপক্ষের মতবিরোধ রয়েছে। আদানি পাওয়ারের দাবি, তাদের ৯০০ মিলিয়ন ডলার পাওনা। অপরদিকে বিপিডিবি বলছে, বকেয়া অর্থ ৬৫০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান রয়টার্সকে বলেছেন, আদানির সরবরাহ ছাড়াই স্থানীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোই দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে সক্ষম। সব বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু না থাকলেও স্থানীয় উৎপাদনই পর্যাপ্ত বলে মনে করেন তিনি।

ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনে শেখ হাসিনার পতন হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। কয়েক মেয়াদে দুই দশকের বেশি সময় বাংলাদেশ শাসন করা হাসিনা ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ মিত্র। রয়টার্স জানাচ্ছে, আদানির সঙ্গে হওয়া মূল বিদ্যুৎ চুক্তির সঙ্গে ছিল আরেকটি বাড়তি বাস্তবায়ন চুক্তি। সেই চুক্তিতে কর সুবিধা হস্তান্তর বা ভাগাভাগির শর্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল। বাংলাদেশ এখন ২৫ বছর মেয়াদি এই বিদ্যুৎ চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের কথা ভাবছে। নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রসিকিউটররা আদানির বিরুদ্ধে ২৬৫ মিলিয়ন ঘুষ কেলেঙ্কারির অভিযোগে যে মামলা করেছেন, তা কাজে লাগিয়ে কোম্পানিটিকে চুক্তি পুনর্মূল্যায়নে চাপ দিতে পারবে বলে আশা করছে ঢাকা।

বাংলাদেশে আদানি পাওয়ারের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়নি। তবে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে আদানির একজন মুখপাত্র বলেছেন, কোম্পানিটি সব চুক্তিগত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছে এবং ঢাকা চুক্তি পর্যালোচনা করছে এমন কোনো ইঙ্গিত তারা পাননি। কর সুবিধা ও অন্যান্য বিষয়ে প্রশ্ন করা হলেও কোম্পানিটি সেসবের উত্তর দেয়নি।

আদানি গ্রুপ যুক্তরাষ্ট্রে তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকেও ‘ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেছে।

রয়টার্স বলছে, আদানি পাওয়ারের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালিত হয় আমদানি করা কয়লা দিয়ে। কেন্দ্রটি বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্যই নির্মাণ করা হয়েছিল। কোম্পানিটি বলেছে, এ প্রকল্প ভারতের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হয়েছে। ২০১৯ সালে দিল্লি এ বিদ্যুৎকেন্দ্রকে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত বলে ঘোষণা দেয়। এর ফলে কেন্দ্রটি আয়কর অব্যাহতিসহ অন্যান্য কর সুবিধা পায়।

২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর আদানি পাওয়ার ও রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি এবং বাস্তবায়ন চুক্তি অনুযায়ী, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কর-সংক্রান্ত সুবিধার পরিবর্তন দ্রুত বাংলাদেশকে জানানোর এবং সেই সুবিধা বাংলাদেশকেও দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল আদানি পাওয়ারের। কিন্তু এ সুবিধার কথা জানানো কিংবা সুবিধা ভাগাভাগি- কোনোটাই করেনি আদানি পাওয়ার। ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর এবং ২২ অক্টোবর বিপিডিবির পাঠানো চিঠি থেকে এ তথ্য জানা গেছে। চিঠিগুলোর কপি রয়টার্সের হাতে এসেছে। ওই চিঠিগুলোতে বাংলাদেশকে এসব সুবিধা দিতে অনুরোধ করা হয়েছে কোম্পানিটিকে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিপিডিবির দুই কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, তারা আদানি পাওয়ারের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাননি। ওই কর্মকর্তারা জানান, বিপিডিবির হিসাব অনুসারে, কর সুবিধা হস্তান্তর করা হলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে বাংলাদেশের প্রায় ০.৩৫ সেন্ট ব্যয় সাশ্রয় হতো।

রয়টার্সের দেখা বাংলাদেশ সরকারের একটি নথির তথ্যানুসারে, ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৮.১৬ বিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে। এই হিসাবে বাংলাদেশের মোট সাশ্রয় হতে পারত প্রায় ২৮.৬ মিলিয়ন ডলার। বিদ্যুৎ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান জানান, ভবিষ্যতে আদানি পাওয়ারের সঙ্গে আলোচনার সময় এই ব্যয় সাশ্রয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হবে।

এ বছরের নভেম্বরে ২০১০ সালের একটি আইন বাতিল করে বাংলাদেশ। এ আইন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই জ্বালানি চুক্তি অনুমোদনের ক্ষমতা দিয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ার থিংক ট্যাংক ক্লাইমেট এনার্জি ফাইন্যান্সের পরিচালক টিম বাকলে রয়টার্সকে বলেন, টেন্ডার ছাড়া চুক্তি অস্বাভাবিক। টেন্ডারের মাধ্যমে ‘সম্ভাব্য সেরা মূল্য’ নিশ্চিত করা যায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনার আমলে স্বাক্ষর করা প্রধান জ্বালানি চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন করে। পাশাপাশি আদানি পাওয়ারের সঙ্গে করা চুক্তি নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। অন্যদিকে, বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর শ্বেতপত্র তৈরির জন্য গঠিত কমিটি ড. ইউনূসের কাছে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে বলেছে, আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে আনা অভিযোগের কারণে বাংলাদেশেরও এই বিদ্যুৎ চুক্তি ‘যাচাই’ করা উচিত। চুক্তিটি ‘তড়িঘড়ি’ করে করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি।

এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য ভারতে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি রয়টার্স। তবে হাসিনার ছেলে ও উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় রয়টার্সকে বলেন, আদানি পাওয়ারের সঙ্গে চুক্তি সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না, তবে তিনি নিশ্চিত যে ‘এতে কোনো দুর্নীতি হয়নি’।

আদানির চুক্তিতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগের জবাবে জয় বলেন, ‘আমি কেবল ধারণা করতে পারি, এই চুক্তির জন্য ভারত সরকার লবিং করেছে।’ তবে মোদি প্রশাসন ও ভারত সরকারের অন্য কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যুৎ ক্রয় সারাংশের তথ্যানুসারে, গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরবরাহকৃত বিদ্যুতের দাম বাংলাদেশে সরবরাহ করা অন্যান্য ভারতীয় উৎপাদনকারীদের বিদ্যুতের গড় মূল্যের চেয়ে ৫৫ শতাংশ বেশি। বিপিডিবির তিনটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, চুক্তিতে উল্লিখিত একটি সূচক গত বছর সংশোধিত হওয়ার পর বাংলাদেশ আদানি পাওয়ারকে অন্যান্য বেঞ্চমার্ক (মানদণ্ড) ব্যবহার করতে চাপ দিচ্ছে, যা বিদ্যুতের দাম আরও কমাবে। তবে আদানি পাওয়ার তাতে রাজি হয়নি জানিয়ে একটি সূত্র বলেছে, দুপক্ষ শিগগিরই আলোচনায় বসতে যাচ্ছে।

চুক্তি অনুযায়ী, যেকোনো সালিশি কার্যক্রম সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত হবে। তবে বিদ্যুৎ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশ দেওয়া তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতেই বাংলাদেশ পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করবে। তিনি বলেন, ‘যদি প্রমাণিত হয় যে ঘুষ আদানপ্রদান বা অনিয়ম হয়েছে, সে ক্ষেত্রে চুক্তি বাতিলের ঘটনা ঘটলে আদালতের আদেশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত