বিশৃঙ্খলায় জড়ানো মুমিনের কাজ নয়

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০২৪, ১২:০৯ এএম

হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের পূর্ব যুগকে বলা হয় জাহেলি বা অন্ধকার যুগ। সেই যুগে মানবসভ্যতায় চরম বিপর্যয় নেমে এসেছিল। চারদিক ছিল অন্যায়, অত্যাচার, বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। সবল কর্র্তৃক দুর্বলের অধিকার হরণ করার বিষয়টি ছিল খুবই স্বাভাবিক। মানুষ হত্যা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। রাসুল (সা.) পৃথিবীতে আগমন করে মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। সমাজ থেকে যাবতীয় বিশৃঙ্খলা, কুসংস্কার ও অরাজকতা দূর করেন। সকলকে বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে শান্তিময় জীবনযাপনের প্রতি আদেশ করেন। এ আদেশ মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে। তাই সর্বদা শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং ঝগড়া-কলহ থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। সুতরাং বিশৃঙ্খলায় জড়ানো মুমিন ব্যক্তির কাজ নয়। মুমিন ব্যক্তির গুণ হলো, সে সর্বদা আল্লাহকে ভয় করবে, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখবে, কোনো ধরনের অরাজকতায় লিপ্ত হবে না, দেশের আইন মেনে চলবে, আইন নিজের হাতে তোলে নেবে না, অন্যের কল্যাণ সাধন করবে এবং দেশের উন্নয়নে কাজ করবে।

ইসলাম মানুষের শান্তি ও মুক্তির কথা বলে। ইসলাম কখনো দ্বন্দ্ব, সংঘাত, নৈরাজ্য, নাশকতা, অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকে প্রশ্রয় দেয় না। সমাজ জীবনে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ওপর ইসলাম বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। অশান্তি-বিশৃঙ্খলা এবং ফেতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টিকে কোরআনে হত্যার চেয়েও গুরুতর পাপ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তবুও এ পাপ আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ছে। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে এ পাপাচারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রয়োজন ও গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। কেননা একটি ফেতনা-অশান্তি সমাজে অসংখ্য ফেতনা-অশান্তি ও অরাজকতার জন্ম দিতে পারে। তাই ফেতনা-অশান্তি সৃষ্টির বিরুদ্ধে ইসলামের কঠোর অবস্থান। আমাদেরও সব ধরনের ঝগড়া-কলহ ও ফেতনা-ফ্যাসাদ থেকে দূরে থাকতে হবে। অন্যথায় সামান্য ঝগড়া-কলহ এক সময় বড় আকার ধারণ করবে। এতে সমাজে অনেক বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা সৃষ্টি হবে এবং মানুষ হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধ সংঘটিত হবে।

বিনা অপরাধে মানুষ হত্যা করা জঘন্যতম অপরাধ। বর্তমানে এ জাতীয় নৃশংসতা খুবই বেমানান। মূর্খতার যুগের মতো এ যুগে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার অর্থ হলো, আমরা এখনো সভ্য মানুষ হতে পারিনি। আর এমন নৃশংসতা যেন আদিকালের বর্বরতাকেও হার মানায়। সভ্যতার এ যুগেও আমরা যদি ভদ্রতা ও মনুষ্যত্ববোধ অর্জন করতে না পারি, তবে সত্যিকার অর্থে আমরা এখনো মানুষ হতে পারিনি। চারদিকে লড়াই, ঝগড়া, মারামারি ও হানাহানির ছড়াছড়ি। কেন আমাদের মধ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা ও জানমালের নিরাপত্তা নেই? আফসোস, আমরা এত নিষ্ঠুর কীভাবে হয়ে উঠছি দিন দিন? এখন মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই। দাম নেই কোনো তাজা প্রাণের। এ কথা স্বীকার করতেই হবে, আমরা সত্যিকারের মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের নৈতিক মূল্যবোধের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। আমরা নীতি-নৈতিকতা ও আদর্শ বঞ্চিত এক ভয়াবহ সমাজে বসবাস করছি। যদিও আমাদের মাঝে শিক্ষা-দীক্ষার যাবতীয় আয়োজন রয়েছে। কিন্তু মানুষ হওয়ার প্রকৃত শিক্ষা যেন নেই।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, কেয়ামত হবে না, যে পর্যন্ত না ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে, অধিক পরিমাণে ভূমিকম্প হবে, সময় সংকুচিত হয়ে আসবে, ফেতনা প্রকাশ পাবে এবং খুন-খারাবি বৃদ্ধি পাবে। তখন তোমাদের ধন-সম্পদ এত বৃদ্ধি পাবে যে, তা উপচে পড়বে। (সহিহ বুখারি) এই হাদিসে বর্ণিত প্রায় সব আলামতই এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি। তার মধ্যে খুন-খারাবি অন্যতম একটি বিষয়। তবে কি পৃথিবীর আয়ুও ফুরিয়ে আসছে? আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, কোনো মুসলমানকে গালি দেওয়া ফাসেকি (জঘন্য পাপ) এবং হত্যা করা বা তার সঙ্গে লড়াই করা হচ্ছে কুফরি। (সহিহ বুখারি)

আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হচ্ছে মানবজাতি। সুতরাং আল্লাহর সৃষ্টিকে বিনা কারণে হত্যা করা কিংবা ঠুনকো কারণে হত্যা করার অপরাধ তো সামান্য কোনো অপরাধ নয়। এমন অন্যায় হত্যা কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। আর একটি কবিরা গুনাহ জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হবে। ইসলামের শিক্ষা হলো, মানুষের রক্ত ও ধন-সম্পদও সুরক্ষিত। রাসুল (সা.) তার বিদায় হজের ভাষণে এ কথাই বলেছেন, ‘আজকের এই মাস এবং এই শহরের মতো তোমাদের পরস্পরের রক্ত ও ধন-সম্পদও পবিত্র ও সুরক্ষিত।’ (ইবনে মাজাহ) পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করে অন্য কোনো প্রাণের বিনিময় ব্যতীত কিংবা তার দ্বারা ভূ-পৃষ্ঠে কোনো ফেতনা-ফ্যাসাদ বিস্তার ব্যতীত, তাহলে সে যেন পুরো মানবজাতিকে হত্যা করে ফেলল। আর যে ব্যক্তি কোনো ব্যক্তিকে রক্ষা করল, তাহলে সে যেন পুরো মানবজাতিকে রক্ষা করল।’ (সুরা মায়েদা ৩২)

যারা দেশে বিভিন্ন নৈরাজ্যকর অবস্থা তৈরি করছেন এবং সাধারণ মানুষকে কষ্টে নিপতিত করছেন, তাদের বিষয়ে কথা হলো, আপনারা মহান আল্লাহকে ভয় করুন। আপনাদের এই নৈরাজ্যের জবাবদিহি মহান আল্লাহর কাছে করতে হবে। কী করবেন তখন? নিজের পরকালের ব্যাপারে একটু সচেতন হোন। অন্যথায় কেয়ামতের সেই মহাদিবসে আফসোস ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। যারা সচেতন মানুষ আছেন, এখন তাদের করণীয় হলো, নিজের পরিবার, সমাজ ও দেশের সব মানুষের মধ্যে পরকালীন জবাবদিহিতার ভয় সৃষ্টি করা। দুনিয়াতে অপরাধের শাস্তি হোক বা না হোক আখেরাতে সব অপরাধের বিচার হবে, এই মানসিকতা জনসাধারণের মধ্যে জাগ্রত করতে হবে। আল্লাহর ভয় ও আখেরাতের শাস্তি সম্পর্কে সচেতন দ্বারা অপরাধ দমন করা যায়। সবাইকে অবহিত করতে হবে যে, দুনিয়াতে মানুষের চোখকে ফাঁকি দেওয়া গেলেও আখেরাতে আল্লাহর দরবারে সব কর্মকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হবে। সেখানে কোনো বিষয়ে অরাজকতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির বিষয় প্রমাণিত হলে তার জবাবদিহি করতে হবে এবং পরিণামে জাহান্নামের মারাত্মক আজাবের সম্মুখীন হতে হবে। যা থেকে বাঁচার কোনো উপায় থাকবে না। সেদিন হাত-পা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অপরাধীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘আজ আমি তাদের মুখে মোহর এঁটে দেব, তাদের হাত আমার সঙ্গে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে।’ (সুরা ইয়াসিন ৬৫) আল্লাহর সামনে হিসাব দিতেই হবে, এই মানসিকতা জনসাধারণের মধ্যে সৃষ্টি হলে অপরাধ, অরাজকতা ও অশান্তি বন্ধ হবে।

যাদের মধ্যে খোদাভীতি এবং আখেরাতে জবাবদিহিতার ব্যাপারে কোনো পরোয়া নেই তাদের মধ্যে অরাজকতার স্বভাব সহজেই প্রবেশ করে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে অপরাধ ও অনৈতিকতা। আর দেশের মানুষের ভেতর খোদাভীতি থাকলে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং মহান আল্লাহর রহমত ও বরকতের দুয়ার খুলে যাবে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘লোকালয়ের মানুষগুলো যদি ইমান আনত এবং তাকওয়ার জীবন অবলম্বন করত তাহলে আমি তাদের ওপর আসমান-জমিনের যাবতীয় বরকতের দুয়ার খুলে দিতাম।’ (সুরা আরাফ ৯৬)

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত