জান্তার বিদায়ঘণ্টার প্রতিধ্বনি প্রতিবেশীদের কানে

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৮:৩৪ এএম

গৃহযুদ্ধের আগুনে পুড়ছে মিয়ানমার। কামান-বন্দুকের গোলাগুলির শব্দে নিত্যদিন ঘুম ভাঙছে দেশটির বেশিরভাগ এলাকার বাসিন্দাদের। সেনাবাহিনী কিংবা বিদ্রোহী যোদ্ধাদের ভারী বুটের পদধ্বনি আতঙ্কের প্রতিধ্বনি হচ্ছে মানুষের কানে-মনে। বিশেষ করে দেশটির জান্তা সরকার ও বিদ্রোহীদের মধ্যে চলা সংঘাত গত এক বছরে যে স্তরে পৌঁছেছে তাতে যেকোনো সময়, যেকোনো ধরনের ঘটনাই ঘটতে পারে সেখানে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি যে দিকে গড়াচ্ছে, তাতে সিরিয়ার মতো মিয়ানমারের শাসনভারও বিদ্রোহীদের হাতে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তারা বলছেন, তাদের এই শঙ্কা বাস্তব সম্মত এবং দু-এক মাসের মধ্যেই তেমন ঘটনা ঘটতে পারে। এর প্রধান কারণ, দেশটির সেনাবাহিনীর মধ্যে থাকা বিদ্রোহীদের চর; বার্মিজ ভাষায় বিদ্রোহীরা যাদের ‘তরমুজ’ নামে ডাকেন। তরমুজ যেমন বাইরে সবুজ কিন্তু ভেতরে টকটকে লাল, তেমনি এই চরেরা বাইরে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সদস্য কিন্তু ভেতরে-ভেতরে বিদ্রোহী গ্রুপের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করেন। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, বিভিন্ন গোষ্ঠীর সম্মিলিত প্রতিরোধ যেমন বিদ্রোহীদের সফলতায় ভূমিকা রেখেছে তেমনি বড় ভূমিকা রেখেছেন এসব গুপ্তচরেরা। আর এ সাফল্যের কারণেই যেকোনো দিন জান্তা সরকারের শেষ ঘণ্টা বেজে যেতে পারে। আর তার প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশ, ভারত ও চীনের ওপর।

রয়টার্স, বিবিসি, ডয়েচে ভেলেসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুসারে, ২০২১ সালে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পর মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার এখন সবচেয়ে বড় প্রতিরোধের মুখোমুখি। বিরোধী পক্ষগুলো এখন একজোট হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে লড়ছে। আর তাদের নানা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছেন সরকার, সেনাবাহিনীর ভেতরেও অনেকে। তারা সামরিক বাহিনীর যাতায়াতসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য ফাঁস করে দিচ্ছেন যার ওপর ভিত্তি করে বিরোধীরা আক্রমণের পরিকল্পনা সাজাতে পারছেন। গতকাল বিবিসির এক প্রতিবেদনে বিদ্রোহীদের বড় সাফল্যের নেপথ্য নায়ক হিসেবে এসব গুপ্তচরদের কথা বলা হয়েছে।

চলতি বছরের ১৮ ডিসেম্বর থাইল্যান্ড সীমান্তের কাছে মানেরপ্লা গ্রাম দখল করে ‘কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন’ বা কেএনইউ নামের সশস্ত্র গোষ্ঠী। প্রায় তিন দশক পর সাবেক সদর দপ্তর এলাকা পুনর্দখল করে কেএনইউ এক বিবৃতিতে এই ঘটনাকে বড় দিনের উপহার বলে বর্ণনা করেছে। গোষ্ঠীটির মুখপাত্র পাদোহ সাও তাও নি বলেন, গত কয়েক দিন ধরে সংঘর্ষে অবশেষে সাফল্য মিলেছে। মানেরপ্লা পুনর্দখল করা গেছে। বর্তমানে এই এলাকা জান্তা নিয়ন্ত্রণমুক্ত। বড়দিনের আগে আমাদের কাছে এর চেয়ে ভালো খবর আর কিছুই নেই।

অন্য দিকে উত্তর মিয়ানমারের নাগাল্যান্ড-মণিপুর সীমান্ত লাগোয়া ভামো এবং মানসি শহরে জোরালো আঘাত হানে কাচিন ইন্ডিপেনডেন্ট আর্মি (কেআইএ)। তারা ৪৭ নম্বর ব্যাটালিয়নের সৈনিকদের থেকে ভামোর একটি ঘাঁটি ছিনিয়ে নেয়। উত্তর মিয়ানমারের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে স্বাধীন কাচিন রাজ্য তৈরির স্বপ্ন দেখছে এ বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি। সূত্রের খবর, কাচিন ছাড়াও উত্তর সাগাইং এবং শান রাজ্যের অন্তত ১২টি শহর তারা দখল করেছে। তাদের হাতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জান্তা বাহিনীর অন্তত ৩০০টি ঘাঁটি।

এ ছাড়া চলতি মাসেই দেশটি দক্ষিণ-পূর্বের বঙ্গোপসাগর লাগোয়া রাখাইন রাজ্যের দখল নিয়েছে আরাকান আর্মি (এএ) নামের আর একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। বিবিসি বলছে, এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো মিয়ানমার সেনাবাহিনী পুরো একটি সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের ২৭০ কিলোমিটার সীমান্ত এখন পুরোপুরি আরাকান আর্মির দখলে। এখন শুধুমাত্র রাজ্যটির রাজধানী সিতওয়ে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আছে, তবে এটি দেশের বাকি অংশ থেকে আলাদা। আরাকান আর্মি সম্ভবত প্রথম কোনো বিদ্রোহী গোষ্ঠী, যারা পুরো একটি রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিতে চলেছে। বিবিসি বলছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী চলতি বছরের শুরু থেকেই আরাকান আর্মির কাছে পরাজিত হয়ে একের পর এক শহরের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে। তবে এক বছরের সামরিক বিপর্যয়ের পর রাখাইন রাজ্য হারানো ছিল অভ্যুত্থানকারীদের নেতা জেনারেল মিন অং হ্লাইং এর জন্য আরেকটি শোচনীয় পরাজয়।

কেএনইউ, কেআইএ কিংবা এএ গোষ্ঠীর সাফল্যে মিয়ানমারের সেনা সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ আর হতাশা প্রকাশ করছেন। শত শত সেনা সদস্যের প্রাণহানির জন্য তারা জেনারেল মিন অং হ্লাইং কে দায়ী করেছেন। সেনা সরকারের কোনো সমর্থকের আশঙ্কা, এমনটা চলতে থাকলে, সেনাবাহিনীতে শুধু মিন অং হ্লাইং আর একটি পতাকার খুঁটিই অবশিষ্ট থাকবে।

কিন্তু বিবিসির সাংবাদিকদের একটি দল, দীর্ঘদিন ধরেই মিয়ানমারের পরিস্থিতি কভার করছেন তারা বিদ্রোহীদের অভাবনীয় সফলতার পর একটি প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের প্রশ্ন বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বিদ্রোহী দলগুলো সামরিক জান্তাকে উৎখাতের লক্ষ্য অর্জনকে কতটা অগ্রাধিকার দেবে?

অবশ্য কোনো কোনো বিশ্লেষক বলছেন, বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর আলাদা-আলাদা লক্ষ্য থাকলেও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থের জায়গা থেকে তারা অং সান সু চির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) মতো তারাও জেনারেল মিন অং হ্লাইং সরকারের পতন চেয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারে। তবে তাদের দেশের সঙ্গে সীমান্ত আছে এমন প্রভাবশালী দুটি রাষ্ট্রের চাওয়া-পাওয়াকে গুরুত্ব দিয়ে হতে পারে সমঝোতাও।

বিবিসি বলছে, চীনের চাওয়া মেনে ইতিমধ্যে বিদ্রোহীদের দুটি গ্রুপ যুদ্ধবিরতি মেনে নিয়েছে। অবশ্য তারা সেনাবাহিনীকে সংস্কার ও রাজনীতি থেকে বাইরে রাখার শর্ত দিয়েছে। কিন্তু চীন গৃহযুদ্ধ বন্ধ চাইলেও তারা নিজেদের স্বার্থে দেশটির ক্ষমতা সেনাবাহিনীর হাতেই থাকুক সেটা চায়। যে কারণে দেশটির তিন-চতুর্থাংশের দখলে নেওয়ার পরও জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো হয়তো সামরিক শাসকদের হটানোর পরিবর্তে একটি সমঝোতা করতে চাইবে।

মিয়ানমারের এই সংকট কোন দিকে যাবে তাতে বড় ভূমিকা আছে ভারতেরও। রাখাইন এলাকায় চলছে ভারতের ‘কালাদান মাল্টি মডেল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট’ প্রকল্পের কাজ। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে মাধ্যমে কলকাতা বন্দর থেকে পণ্যসামগ্রী রাখাইন রাজ্যের কালাদান নদী পেরিয়ে সরাসরি পৌঁছে যাবে মিজোরামে। জান্তা সরকারের পতন হলে এই ধরনের প্রকল্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। তাই ভারতও চাইবে বিদ্রোহীদের আলোচনার টেবিলে আনতে। অর্থাৎ ভারতেরও চাওয়া দেশটিতে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন গোষ্ঠীর হাতে শাসনভার না গিয়ে সেনা সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি আপসরফা হোক।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের একাংশর দাবি, বিদ্রোহীদের হাতে জান্তা সরকারের পতন হলে মিয়ানমারের দশাও সিরিয়ার মতো হতে পারে। যার অভিঘাত পড়তে পারে চীন, ভারত ও বাংলাদেশে। তাই দেশ তিনটিও হয়তো জান্তা সরকার টিকে যাক সেটা চাইবে বা সে জন্য প্রয়োজনীয় কিছু উদ্যোগ নেবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত