জাতীয় দলের সাবেক কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগের একটি ছিল, তিনি ঘরোয়া ক্রিকেট দেখতেন না। কানাঘুষা শোনা যেত, বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের যে মান, তাতে সেখান থেকে আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটার তৈরি সম্ভব নয় বলেই মনে করতেন এই শ্রীলঙ্কান কোচ। বিপিএলকে তো একবার তিনি ‘সার্কাস’ বলে উপহাসও করেছিলেন। সেই বিপিএল থেকেই জাতীয় দলে উঠে এলেন জাকের আলী অনিক, যার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুর দিনগুলো কেটেছে দুঃস্বপ্নের মতো। প্রশ্ন উঠেছিল- গত বিপিএলে ব্যাট হাতে ঝড় বইয়ে দেওয়া জাকের কি আসলেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য প্রস্তুত?
হাংজু এশিয়ান গেমসে অভিষেকের পর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গত মার্চে মূল দলের হয়ে প্রথমবার খেলেছিলেন জাকের। সিলেটে প্রথম টি-টোয়েন্টিতে খেলেন ৩৪ বলে ৬৮ রানের বিস্ফোরক ইনিংস। কিন্তু এরপর থেকেই যেন জাকের হারিয়ে ফেলেন নিজেকে। পরবর্তী ১৫টি ইনিংসে ফিফটি তো দূরের কথা, ৮ ইনিংসে দুই অঙ্কেই যেতে পারেননি। একটি ৪৪ রানের ইনিংস বাদ দিলে কুড়ির ঘরে যেতে পেরেছেন মাত্র একবার। গত জুনের কথাই ধরুন না। এই ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসেছিল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আসর। ৪ ম্যাচ খেলে ১১.৬৬ গড়ে জাকের রান করেছিলেন মাত্র ৩৫! সেই বিশ্বকাপে ভরাডুবি হয়েছিল বাংলাদেশের। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ২৬ বছর বয়সী নবীন এই ক্রিকেটার ছিলেন পুরোপুরি ব্যাকফুটে। বিপিএলের পারফামেন্স দেখে এত তাড়াতাড়ি জাতীয় দলে বিবেচনা করা উচিত হয়নি বলেও মন্তব্য করেছিলেন অনেকে।
টানা ব্যর্থতার পরও টিম ম্যানেজমেন্ট আস্থা রাখে জাকেরের ওপর। ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটেই তার অভিষেক হয়ে যায়। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মিরপুর টেস্টে একটা ফিফটিও করেন; কিন্তু নিজেকে প্রমাণের জন্য উপযুক্ত পারফরমেন্স করতে পারছিলেন না। এমন অবস্থায় একজন তরুণ ক্রিকেটারের মানসিকভাবে ভেঙে পড়াটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু জাকের যেন অন্য ধাতুতে গড়া। অল্প বয়সেই বাবাকে হারিয়েছেন, দীর্ঘ সংগ্রাম করে এতদূর আসতে হয়েছে। তাই হারিয়ে যাওয়ার আগে আরেকবার ঘুরে দাঁড়ালেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে। এই সফরটাকেই অনেকে জাকেরের শেষ সুযোগ হিসেবে দেখছিল। হার না মানা মানসিকতায় নিজের শেষ সুযোগকেই ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট বানিয়ে ফেললেন এই তরুণ।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিন ফরম্যাটেই ব্যাট হাতে জ্বলে উঠেছেন জাকের। দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ৪ ইনিংসে ৪৪ গড়ে ১৭৬ রান করে হয়েছেন সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। এর মাঝে শেষ টেস্টে ৯১ রানের ইনিংসটি বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ে বড় অবদান রেখেছিল। ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশ হোয়াইটওয়াশ হলেও ৫৬.৫০ গড়ে ১১৩ রান করে দলের তৃতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হয়েছেন জাকের। তবে গতকাল শেষ হওয়া টি-টোয়েন্টি সিরিজের শেষ ম্যাচে যেন জাকেরের পুনর্জন্ম হলো। প্রথম দুই ম্যাচে ২৭ বলে ২৭, ২০ বলে ২১ করার পর শেষ ম্যাচে খেললেন ৪১ বলে ৩ চার এবং ৬ ছক্কায় অপরাজিত ৭২ রানের ইনিংস। ম্যাচসেরা জাকেরের বিস্ফোরক ব্যাটিংয়েই ৮০ রানের বিশাল জয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হোয়াইটওয়াশ করল বাংলাদেশ।
অথচ, ব্যক্তিগত ১৮ রানেই তিনি থেমে যেতে পারতেন। শামীম পাটোয়ারীর সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝিতে রানআউট হয়েছেন ভেবে ড্রেসিংরুমে ফিরেই গিয়েছিলেন। আশপাশে যা কিছু পাচ্ছিলেন, সবকিছুতেই লাথি মেরে রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছিলেন জাকের। পরে আম্পায়ার যখন তাকে আবার ফেরত নিয়ে যান, তখন আর ফিরে তাকাতে হয়নি। ব্যাট হাতে ক্যারিবিয়ান বোলারদের নাভিশ্বাস তুলে দেন ১৭৫.৬০ স্ট্রাইকরেটে, যেখানে তার ক্যারিয়ার স্ট্রাইকরেট মাত্র ১২২। তার ব্যাটিং দেখে মুগ্ধ ক্যারিবীয় ধারাভাষ্যকার নিখিল উত্তামচান্দানি বলছিলেন, ‘ইটস জাকের আলী শো... সুপারস্টার ইন দ্য মেকিং’।
সিরিজ জুড়ে জাকেরের কীর্তিতে বিসিবি তাকে ‘সফরের সেরা ক্রিকেটার’ হিসেবে পুরস্কৃত করতেই পারে। আর জাকেরের দায়িত্ব হবে, প্রশংসায় ভেসে না গিয়ে নিজেকে এগিয়ে নেওয়া। সামনে অনেক পথ বাকি আছে, দেশকে অনেক কিছু দেওয়ার আছে জাকেরের।
