ছাত্রদল ডাকসু চায় তবে...

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৮:০২ এএম

টানা পাঁচ বছরের অচলাবস্থার পর অবশেষে আবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই শিক্ষার্থীরা এ দাবি জানিয়ে আসছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে প্রশাসন। ছাত্রদল ছাড়া অন্য ছাত্র সংগঠনগুলোও ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচনের বিষয়ে ঐক্যে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে। তবে ছাত্রদল কেন ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন চায় না, এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জল্পনা-কল্পনা রয়েছে। ছাত্রদল নেতারা বলছেন, তারাও নির্বাচন চান, তবে তাড়াহুড়ো করে নয়। এ ছাড়া নির্বাচনের আগে কিছু সংস্কারের কথাও জানান তারা।

দীর্ঘ ২৮ বছর অচল থাকার পর ২০১৯ সালের মার্চে নির্বাচনের মাধ্যমে সচল হয় ডাকসু। ওই কমিটির মেয়াদ শেষ হয় ২০২০ সালের মার্চে। এরপর করোনা মহামারী এবং প্রশাসনের অনীহার কারণে চার বছর ধরে বন্ধ ছিল ডাকসুর দুয়ার। বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীরা দাবি জানালেও কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। গত চার মাসে শিক্ষার্থী এবং ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলো একাধিকবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে এ দাবি জানিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ক্যাম্পাসে কর্মসূচিও পালন করা হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ডাকসুর দুয়ার খোলার ইঙ্গিত দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে এই নির্বাচন ঘিরে আমেজ লক্ষ করা গেছে। ইতিমধ্যে ডাকসু নিয়ে তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজও করতে দেখা গেছে। ক্যাম্পাসে বেশ কিছু সাংগঠনিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক কার্যক্রম চালাতেও দেখা যায়। তবে ছাত্রদল এক ধরনের নীরব ভূমিকা পালন করছে। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের আলোচনা আসার পর থেকেই প্রকাশ্যে এ সময়ের মধ্যে নির্বাচনের বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশ করতে দেখা যায় ছাত্রদল শীর্ষ নেতাদের। শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ মনে করছেন, তাহলে কী ছাত্রদল ডাকসু নির্বাচনের বিপক্ষে?

তবে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার শীর্ষ নেতারা বলছেন ভিন্নকথা। তারা বলছেন, ছাত্রদল কোনোভাবেই ডাকসুর বিপক্ষে নয়। বরং তারা চান সংস্কারের মধ্য দিয়েই এই নির্বাচন হোক। তাড়াহুড়ো করে নির্বাচন দিলে হিতে বিপরীত হবে বলে মনে করেন তারা। ডাকসুর গঠনতন্ত্র সংশোধন, সিনেট পুনর্গঠন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ গত ১৫ বছরে যারা হামলায় জড়িত ছিলেন, তাদের বিচার নিশ্চিত এবং যৌক্তিক সময় পর্যন্ত ক্যাম্পাসে স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগের দাবি জানান ছাত্রনেতারা। ডাকসু গঠনতন্ত্রের প্রয়োজনীয় সংস্কারের জন্য প্রশাসনকে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে শিগগিরই প্রস্তাবনা দেওয়া হবে বলে জানান নেতারা।

কেন্দ্রীয় ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ডাকসুর পক্ষে। কোনো দলীয় সংগঠন ডাকসুর বিকল্প হতে পারে না। আমরা ২০১০ সাল থেকে আজকে পর্যন্ত ক্যাম্পাসে কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারিনি। সুতরাং ডাকসুর আগে আমাদের একটা যৌক্তিক সময় পর্যন্ত ক্যাম্পাসে স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে। ন্যাচারাল জাস্টিস অনুসারেও এই সুযোগ পাওয়া আমাদের ন্যায্য দাবি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আওয়ামী আমলে আমাদের হলে ঢুকতেই দেওয়া হয়নি, এখনো ছাত্রদলের কর্মীদের হলে সিট দেওয়া হচ্ছে না। বিভিন্ন প্রসিডিওরাল এক্সকিউজ দেখিয়ে ছাত্রদলের কর্মীদের সিট থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা গোপনে ও প্রকাশ্যে হলে আধিপত্য বিস্তার করছেন। অনেকে তথাকথিত ছাত্র প্রতিনিধি হয়ে হলে প্রভাব বিস্তার করছেন। পদধারী এবং তথাকথিত পদত্যাগী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আসতে হবে। তাদের কোনো ফোরামে পুনর্বাসন করা যাবে না।’

হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্রলীগের হয়ে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করতে হবে। তাদের কারণে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এর আগেও যারা বিভিন্ন সময় গেস্টরুমে মারধর করেছে, নির্যাতন করেছে, বিরোধী মতের শিক্ষার্থীদের ওপর বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে হামলা করেছে তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে। তারা অবাধে বিচরণ করলে নির্বাচনী সহিংসতা ঘটানোর চেষ্টা করবে।’

ডাকসুর গঠনতন্ত্রের সংস্কারের কথা জানিয়ে নাছির বলেন, গঠনতন্ত্রে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা রয়েছে, যার সমাধান প্রয়োজন। যেমন : ভোটার এবং প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা। ২০১৯ সালে ছাত্রলীগের প্রেসক্রিপশনে সব সংশোধনী আনা হয়েছিল। এগুলো আবার সংশোধন করতে হবে। ডাকসুর গঠনতন্ত্র সংশোধন করার এখতিয়ার সিনেটের। সিনেটে সব ফ্যাসিস্টপন্থি শিক্ষক। আগে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সিনেট পুনর্গঠন করতে হবে, এরপর ডাকসুর গঠনতন্ত্র সংশোধন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে, হল প্রশাসনের কোনো পর্যায়ে ফ্যাসিস্ট অর্থাৎ নীল দলের সমর্থক কোনো শিক্ষককে দায়িত্বে রাখা হবে না, এটা নিশ্চিত করতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, ‘ছাত্রদল ডাকসু নির্বাচনের ব্যাপারে সব সময় সোচ্চার ছিল এবং বর্তমানেও আছে। ডাকসুর প্রতি সব সময় শ্রদ্ধাশীল হওয়ার কারণে ২০১৯ সালে সর্বশেষ ডাকসুতে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও ছাত্রদল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল। আবার একমাত্র ছাত্র সংগঠন হিসেবে পূর্ণ প্যানেলে ডাকসুতে বিজয়ী হওয়ার ইতিহাসও ছাত্রদলের রয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান গঠনতন্ত্র এবং দেড় দশক ধরে যারা হলগুলোয় গেস্ট ও গণরুমের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণতি করেছিল, তাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাড়াহুড়ো করে ডাকসু নির্বাচনের পক্ষে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে এখনো বিগত সময়ে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনকারী অসংখ্য ছাত্রলীগ নেতাকর্মী অবস্থান করছেন এবং বিগত দিনে ছাত্ররাজনীতিকে যারা কলুষিত করেছেন, সেই সন্ত্রাসীদের এখনো আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না। এসব ফ্যাসিবাদের দোসররা বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করার জন্য নানা রকম ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে অনিয়ন্ত্রিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রেখে এবং ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় না এনে ডাকসু নির্বাচন দেওয়া মানে বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করার সব অস্ত্র এই ফ্যাসিবাদের দোসরদের হাতে তুলে দেওয়া। ছাত্রলীগের সুবিধা হয় ডাকসুর এমন গঠনতন্ত্র সংস্কার ছাড়া এত তাড়াহুড়ো করে ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে আমরা না। ডাকসু গঠনতন্ত্রের প্রয়োজনীয় সংস্কারের জন্য আমাদের প্রস্তাবনা আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে শিগগিরই জানাব।’

সার্বিক বিষয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, ‘আমরা ডাকসুর বিপক্ষে নয়, আমরা পক্ষে। তবে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সবার আগে বিগত ১৫ বছরে যারা হামলায় জড়িত ছিলেন, তাদের বিচার করা। সে কাজটা এখনো পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। তাদের রেখে তাড়াহুড়ো করা উচিত হবে না। এ ছাড়া ডাকসুর গঠনতন্ত্রের সংশোধনও জরুরি। সব মিলিয়ে আমরা চাই, একটা যৌক্তিক সময় পরেই এই নির্বাচন আয়োজন করা হোক।’

এদিকে এর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, জানুয়ারি অথবা ফেব্রুয়ারির মধ্যে ডাকসু নির্বাচন আয়োজন করার কথা ভাবছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তিনি বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন আমাদের জন্য খুবই জরুরি। কারণ শিক্ষার্থীদের মতামত আমাদের জানতে বেশ বেগ পেতে হয়। ডাকসু নির্বাচন হলে এই প্রক্রিয়াটি আমাদের জন্য আরও সহজ হবে। তবে এখানে বেশ কিছু সমস্যা আছে। ডাকসুর রিফরমেশনের প্রয়োজন আছে। গঠনতন্ত্র নিয়ে বেশ কিছু আপত্তি জানিয়েছে ছাত্র সংগঠনগুলো।’

ডাকসু নির্বাচনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতি ও শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিষয়ে একটা বিশেষজ্ঞ কমিটি করে দিয়েছি। সে কমিটিকে ছাত্র সংসদকে প্রাধান্য দিতে বলা হয়েছে। তারা ইতিমধ্যে বসেছে এবং বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলাপ শুরু করবে। কমিটির পরামর্শ এবং অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে আমরা ডাকসুর তারিখ এবং আনুষঙ্গিক সবকিছু নির্ধারণ করব।’     

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত